রোয়ানুর আঘাতে ছয় জেলায় ২২ জনের মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক : ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে উপকূলীয় ছয় জেলায় প্রবল ঝড়ো হাওয়ায় গাছ ভেঙে, ঘর ধসে এবং সৃষ্ট জোয়ারের পানিতে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের।
এদের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ১ জন, বাশঁখালীতে জলোচ্ছ্বাসে শিশুসহ ৭ জন ও সীতাকুণ্ডে মা-ছেলেসহ ৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ৩ জন, ভোলায় গাছ ও ঘর চাপা পড়ে ৩ জন, লক্ষ্মীপুরে গাছ চাপায় ১ জন, নোয়াখালীর হাতিয়ায় জোয়ারে ভেসে মা-মেয়েসহ ৩ জন এবং পটুয়াখালীতে ঘর ভেঙে আরো ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক লোক।
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু উপকূল অতিক্রম করার আগেই উপকূলীয় বিভিন্ন জেলায় শতশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের জেলাসমূহ থেকে পাঠানো আমাদের প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যে রোয়ানুর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র:
ভোলায় ৩ জন
বাংলদেশ রেড ক্রিসেন্টের সাইক্লোন প্রিপার্ডনেস প্রোগ্রামের উপ পরিচালক মো. শাহাবুদ্দবীন জানান, শুক্রবার শেষরাতের দিকে ভোলায় প্রবল ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে তজুমদ্দিনে ঘর ও গাছ চাপা পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়।
এরা হলেন- তজুমদ্দিন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের শশিগঞ্জ গ্রামের নয়নের স্ত্রী রেখা বেগম (৩৫) ও একই এলাকার মো. মফিজের ছেলে আকরাম (১৪)।
শাহাবুদ্দবীন বলেন, ভোর ৪টার দিকে ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে গেলে ঘর চাপা পড়ে আকরাম আহত হন। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৬টায় তার মৃত্যু হয়। এছাড়া ঝড়ে গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়লে মারা যান রেখা বেগম।
স্থানীয়রা বলছেন, ঝড়ে তজুমদ্দিনের শশীগঞ্জ বাজারের তিন শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
অপরদিকে দৌলতখান উপজেলার দক্ষিণ জয়নগর গ্রামের জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রেনু বিবি ঘরচাপায় মারা যান।
পটুয়াখালীতে ১
এদিকে সকালে প্রবল ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে ঘর ভেঙে পড়লে পটুয়াখালী দশমিনা উপজেলার সদর ইউনিয়ন লক্ষ্মীপুর গ্রামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
দশমিনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলাম জানান, নিহত ওই নারীর নাম নয়া বিবি, বয়স ৫২।
ঝড়ে ওই এলাকার আরো ১০-১২টি ঘর ধসে পড়েছে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান।
চট্টগ্রামে ১১
ঘূর্ণিঝড়ের সময় চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহরে এক পথশিশু ও সীতাকুণ্ডে মা-ছেলের মৃত্যু হয়; আর রোয়ানুর ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালী উপজেলার দুটি ইউনিয়নে অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
শনিবার সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচলাইশে চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্সের কাছে একটি বাসার ছাদ থেকে আসা ইঁটের আঘাতে রাকিব (১১) নামে ওই শিশু গুরুতর আহত হয়।
তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর কতর্ব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান সংশ্লিষ্ট পুলিশ ফাঁড়ির নায়েক জাহাঙ্গীর আলম।
এর আগে ভোরে উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুরের পাহাড়ি এলাকা কালাপানিয়া লোকমানের ঘোনা এলাকায় ঘরের উপর গাছ ভেঙে পড়লে এতে চাপা পড়ে মা-ছেলের মৃত্যু হয়।
এরা হলেন- স্থানীয় মোহাম্মদ রফিকের স্ত্রী কাজল বেগম (৪৮) ও তার ছেলে বেলাল হোসেন বাবু (১০)।
স্থানীয়রা জানান, পাকা খুঁটি ও বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরে থাকতো থাকতেন কাজল বেগম। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঝড়ো হাওয়ায় একটি গাছ ভেঙে ওই ঘরের ওপর পড়ে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ‘গাছ ভেঙে পড়লে ঘরের খুঁটি ভেঙে যায়। এতে ঘরের মধ্যেই চাপা পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়।’
আর বাঁশখালীতে নিহত ছয়জনের মধ্যে খানখানাবাদ ইউনিয়নে পাঁচজন এবং ছনুয়া ইউনিয়নে এক নারীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন।
এদের মধ্যে ছনুয়ায় নিহত নারীর নাম তাহেরা বেগম, তার স্বামী মো. হারুন। বাকিদের নাম জানা যায়নি।
জেলা প্রশাসক মেজবাহ বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় দুপুরে জলোচ্ছ্বাসের পানি বেড়িবাঁধ ভেঙে ঢুকে পড়ে। এতে পানিতে ডুবে ছয় জনের নিহত হওয়ার খবর জেনেছি।
‘বিভিন্ন ইউনিয়নে আরো পাঁচ জন নিখোঁজ আছে বলে স্থানীয়দের মাধ্যমে শুনেছি। এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।’
বাঁশখালী থানার ওসি আলমগীর হোসেন জানান, বাঁশখালী উপজেলার খানখানাবাদ, গণ্ডামারা, শেখের খিল ও ছনুয়ায় জলোচ্ছ্বাসের কারণে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানিতে লোকালয় প্লাবিত হয়েছে।
নোয়াখালীতে ৩
এদিকে, রোয়ানুর প্রভাবে সৃষ্ট জোয়ারের পানিতে নোয়াখালীর হাতিয়া থানার নলের চর এলাকায় এক মা ও শিশু কন্যার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছন ওসি এটিএম আরিসুল হক।
এছাড়াও জাহাজমারা ইউনিয়নের মাহফুজা বেগমের মৃত্যু হয়েছে (৪৫)।
হাতিয়া থানার ওসি আরিসুল হক জানান, নিহত মায়ের নাম মিনারা বেগম এবং শিশু কন্যার নাম মরিয়ম নেছা (৬)। নিহত মিনারা বেগমের স্বামীর নাম আবুল কাসেম। তিনি হাতিয়া থানাধীন হরনি ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা।
কক্সবাজারে ২ জন
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু সার্বিকভাবে কক্সবাজারের তেমন বেশি ক্ষতি করতে পারেনি। তবে এর কারণে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ১০ জন। হতাহত সকলেই কুতুবদিয়া উপজেলার বাসিন্দা।
শনিবার বিকেল ৩ টার দিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিং এ এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন।
নিহতরা হলেন, কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং এলাকার আবদুর রহিমের ছেলে মো. ইকবাল (২৫), উত্তর কৈয়ার বিল এলাকার ফয়েজুর রহমানের ছেলে ফজলুল হক (৫৫)।
এর মধ্যে মো. ইকবাল বাড়ির দেয়াল চাপায় এবং ফজলুল হক নৌকায় বসা থাকা অবস্থায় অপর একটি নৌকার ধাক্কায় আহত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন বলে নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন এই সময় জানান, আহতদের মধ্যে ৩ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। আহত ৫ জন বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। অপর ২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে ।
এসময় জেলা প্রশাসক জানান, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া ও টেকনাফ উপজেলার সাড়ে ২৮ কিলোমিটার বেড়িবাধ আংশিক এবং সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে গেছে। শতাধিক বসত ঘর নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড়ে পূর্বাসাভ প্রচারের পর জেলার ১৫৮ টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৭ হাজার ৪৩৪ পরিবারের ৮৭ হাজার ১৭০ জন মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করে। একই সঙ্গে জেলার বেশ কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
লক্ষ্মীপুরে ১
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর আঘাতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর তেওয়ারীগঞ্জ এলাকায় গাছ পড়ে আনার উল্যাহ নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। শনিবার সকাল ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানায়, তেওয়ারীগঞ্জ বাজার এলাকায় ঝড়ের সময় একটি গাছ চাপা পড়ে আহত হন আনার উল্যাহ। পরে লক্ষ্মীপুরে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, ঘূর্ণিঝড়ের সময় আনার উল্যাহ গাছ চাপা পড়ে মারা যান।
ফেনীতে ১
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু দুপুরে ফেনীর সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানলে সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়ার জেলে পাড়া এলাকায় জোয়ারের পানিতে ভেসে এক রাখালের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত নুর আলম (৩৪) এ বাড়ি চরচান্দিয়ার জেলে পাড়া এলাকায় বলে জানিয়েছেন সোনাগাজীর ইউএনও শরীফা হক।
এছাড়া রোয়ানুর প্রভাবে সোনাগাজীর তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামের ঘরবাড়ি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু উপকূলের দিকে এগিয়ে আসায় রাজধানী ঢাকা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলাতেই বৃষ্টি হচ্ছে।
Related News
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে দুই কৃষিRead More
গাজীপুরে খোলা ড্রেনে পড়ে নারীর মৃত্যু
Manual8 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: গাজীপুরে একটি খোলা ড্রেনে পড়ে নাজমা খাতুন (২৬) নামেRead More



Comments are Closed