ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখতে বিক্ষোভ সমাবেশ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: প্রত্যাহারকৃত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখার দাবিতে আজও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে চলছে ‘আন্দোলন’। আজ সোমবার (২২ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘সর্বদলীয় নাগরিকদের’ ডাকে এক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।
এতে বক্তব্য রাখেন এবং উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন মাদরাসার শিক্ষক-ছাত্রনেতা ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া আজ একই দাবিতে আরও একাধিক কর্মসূচি রয়েছে সিলেটে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে রোববার (২১ জুন) প্রত্যাহার করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন সূত্রে তাঁকে প্রত্যাহারের বিষয়টি জানা যায়।
সারোয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ডিসি প্রত্যাহারের বিষয়টি জানাজানি হলে সিলেটজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শুরু হয় তার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা। গতকাল রোববার দুপুর থেকে সিলেটের টক অব দ্যা সিটি ছিলো সারোয়ার আলমের প্রত্যাহার প্রসঙ্গ।
গত বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পান সারওয়ার আলম। এর আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের একান্ত সচিবের দায়িত্বে ছিলেন।
তার আগে ২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার মর্যাদার এই কর্মকর্তা র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওই সময় ভেজাল ও দুর্নীতিবিরোধী সাড়ে তিন শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা ও পরিচিতি লাভ করেন। সুপরিচিত ছিলেন সিলেটবাসীর কাছেও। সেই সুবাদে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে সারোয়ার আলম নিয়োগ পাওয়ার স্থানীয়দের মাঝে সঞ্চার হয় ব্যাপক আশা-প্রত্যাশার।
সিলেটে এসে সারোয়ার আলমও বিভিন্ন বিষয়ে তৎপরতা দেখান। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সিলেট মহানগরকে হকারমুক্তকরণ অভিযান, ব্যাটারির রিকশাবিরোধী অভিযান, সিলেট-ঢাকা যাতায়াত ব্যবস্থা নিয়ে তৎপরতা, সিলেট-ঢাকা বিমানভাড়া কমানোর আশ্বাস, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধ, ওসমানী হাসপাতাল দালালমুক্তকরণ, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের চেষ্টা এবং সর্বশেষ শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা নিয়ে আসার উদ্যোগ।
তবে সব ক্ষেত্রেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বলে সিলেটবাসী একাংশের বক্তব্য। কোনো একটি বিষয়ই সফলভাবে সম্পন্ন না করায় সুফল পাননি সিলেটবাসী।
শুরুতেই আলোচনায় :
ডিসি হিসেবে সিলেটে এসেই তুমুল আলোচনায় আসেন সারোয়ার আলম। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস। সিলেটের পর্যটন কেন্দ্র সাদাপাথরের পাথর লুট-কাণ্ডে দেশজুড়েই চলছে ব্যাপক সমালোচনা। লুট ঠেকাতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন অবস্থায় ওই সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে সরিয়ে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের দায়িত্বে আনা হয়।
সিলেটে এসেই কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পরিদর্শনে যান সারোয়ার। এসময় কিছুদিনের মধ্যেই আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি ওই সময় বলেন- সাদাপাথরে পাথর পুনঃস্থাপন, লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ- এই তিন বিষয় সামনে রেখে আমি কাজ করবো।
এছাড়াও তিনি বলেন- ‘আর যাতে সিলেটের পাথর লুট হতে না পারে বা বাইরে যেতে না পারে, সে জন্য আমরা আরও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করব। লুণ্ঠিত পাথরগুলো কোথায় কোথায় আছে, সেটি খুঁজে বের করে আমরা রি–ইনস্টল করছি। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে সাদাপাথর আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।’
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সেই সময়ের নতুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। শাস্তির চেয়ে অপরাধ প্রতিরোধই উত্তম।’
পরবর্তী কয়েক মাস তিনি ধারাবাহিকভাবে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর অভিযান চালিয়ে বেশসংখ্যক পাথর উদ্ধার করেন। এবং বিভিন্ন ক্রাশার মিলে অভিযান চালান। এসময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আর একটি পাথরও যদি সরানো হয়, জীবন ঝালাপালা করে দেব। বাংলাদেশ সীমানার যেখানেই পাথর সরানোর চেষ্টা হবে, সেখান থেকেই অপরাধীদের ধরে আনা হবে।’
সাদাপাথর লুটকাণ্ডে একাধিক মামলা হয় তার নির্দেশে।
এরপর সিলেট মহানগরকে হকারমুক্তকরণ অভিযান, ব্যাটারির রিকশাবিরোধী অভিযান (পুলিশের সঙ্গে মিলে), সিলেট-ঢাকা যাতায়াতব্যবস্থা নিয়ে তৎপরতা, সিলেট-ঢাকা বিমানভাড়া কমানোর আশ্বাস, ট্রেনের টিকটি কালোবাজারি বন্ধ, ওসমানী হাসপাতাল দালালমুক্তকরণ, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করেন সারোয়ার আলম। কিন্তু কোনোক্ষেত্রেই তিনি সফল হননি।
সর্বশেষ সারোয়ার আলম আলোচনায় আসেন সিলেটের হযরত শাহজালাল ও শাহপরাণ মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা নিয়ে আসার উদ্যোগ এবং কার্যক্রম শুরু করে। গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। এরপর ১৮ জুন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন শাহজালাল মাজারে দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দানের ব্যবহৃত পুরনো তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় আনসার সদস্যও। ২০ জুন শনিবার দানবাক্সের পাহারায় সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়।
এছাড়া ১৯ জুন শুক্রবার শাহপরাণ মাজারে গিয়েও সারোয়ার আলম অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা এবং আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতা রাখার আহ্বান জানান।
এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাজার সংশ্লিষ্টরা।
যদিও জেলা প্রশাসকের দাবি, মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম এ বিষয়ে বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারে দানের টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেওয়ার একটা অনিয়মতান্ত্রিক পরম্পরা চালু হয়েছে। এখানে দানের যে টাকা আসে, সেটা পাবলিক সম্পত্তি। স্থানীয় প্রশাসন দানের টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আনতেই উদ্যোগী হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, দানের কোনো টাকা সরকার নেবে না। যাবতীয় অনিয়ম দূর করে সব টাকাই মাজার এবং মাজারের মসজিদ, মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয় হবে। এ ছাড়া মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে একটা মহাপরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিনিধিসহ ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
সারোয়ার আলমের এ উদ্যোগকে বেশিরভাগ সিলেটি স্বাগত জানিয়ে এ ক্ষেত্রে সফল হওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা শুরুর কয়েকদিনের মধ্যেই সিলেট থেকে প্রত্যহার হতে হলো তাঁকে।
প্রত্যাহারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি :
সারোয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহারে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও যুবসমাজ। তারা বিভিন্ন ব্যানারে গতকাল রোববার বিকালে সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ও বন্দরবাজারে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
একই দাবি সিলেট জেলা ও মহানগর খেলাফত মজলিস নেতৃবৃন্দের।
তারা রোববার গণমাধ্যমকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন- যখন হযরত শাহজালাল মুজাররদে ইয়ামনি রহ. ও শাহপরান রহ. এর মাজারের দান-অনুদানকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে উদ্যোগী হয়েছেন সারওয়ার আলম, ঠিক তেমনি একটি সময়ে তাঁর বদলীর আদেশে আমরা হতবাক। এরকম আদেশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা ও দূর্নীতিহীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন- যখন গোটা সিলেটের ধর্মপ্রাণ মানুষ ডিসি সরওয়ার আলমের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন,তখন এরক গণ বিরোধী আদেশ কার সার্থে এবং কেন দেয়া হয়েছে? সিলেটবাসীর তা জানার অধিকার আছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে এ আদেশ প্রত্যাহারের দাবী জানিয়ে বলেন- অনতিবিলম্বে গণধিকৃত ও মাজারের দান-অনুদান আত্মসাৎকারীদের সার্থে জারিকৃত আদেশ প্রত্যাহার করে জনাব সরওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে বহাল রাখতে হবে।অন্যথায় সিলেটের জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বার গণ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বিবৃতিদাতারা হলেন- খেলাফত মজলিস সিলেট জেলা সভাপতি মাওলানা নেহাল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা দিলওয়ার হোসাইন, মহানগর সভাপতি হাফিজ মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান ও সাধারণ সম্পাদক হাফিজ মাওলানা জাবেদুল ইসলাম চৌধুরী।
অপরদিকে, সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে হঠাৎ প্রত্যাহার করার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ‘সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন হয়েছে। কর্মসূচিতে বক্তারা ডিসির প্রত্যাহারের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে তাঁকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সিলেট নগরের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। এ সময় নগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচিতে বক্তারা সিলেটের উন্নয়ন ও সুশাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডিসির বদলি বাতিলের দাবি জানান।
Related News
ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখতে বিক্ষোভ সমাবেশ
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: প্রত্যাহারকৃত জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটে বহাল রাখারRead More
সিলেটে মাজারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, ৬৬ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত পুণ্যভূমি সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারRead More



Comments are Closed