Main Menu

বাউলসম্রাট দুর্বিন শাহ: মরমি গানের জগতে এক অনন্য সাধক

আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: বাংলা লোকসংগীত ও মরমি সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম বাউল কবি দুর্বিন শাহ। সুফিবাদ, মরমি দর্শন, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক সাধনার অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন বাংলার লোকসংগীতের ভান্ডার।

তাঁর রচিত অসংখ্য গান আজও মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে দোলা দেয়। সুর, শব্দ ও দর্শনের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের আত্মিক জগৎ, প্রেম, বিরহ, জীবনবোধ এবং স্রষ্টার সন্ধানকে তুলে ধরেছেন অনন্য শিল্পশৈলীতে। আজ ২ নভেম্বর এই মরমি সাধকের জন্মদিন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো পর্যন্ত ফকির দুর্ব্বিন শাহ রাষ্ট্রীয় কোনো বড় স্বীকৃতি পাননি। অথচ তাঁর গান আজও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বেঁচে আছে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম শুধু বাংলার নয়, বিশ্বমানবতার ঐতিহ্যের অংশ।

১৯২১ সালের ২ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন ফকির দুর্ব্বিন শাহ। তাঁর প্রকৃত নাম দুর্ব্বিন শাহ, তবে পরবর্তীতে “দুর্ব্বিন শাহ” নামেই তিনি পরিচিত হন। পিতা সফাত আলী শাহ ছিলেন এক সুফি সাধক এবং মাতা হাসিনা বানু ছিলেন ধার্মিক পীরানী। আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটে।

পড়াশোনার দিক থেকে তিনি অগ্রসর হতে পারেননি—শুধু পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন সুরমা নদী পার হয়ে বাগবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তবে স্বল্পশিক্ষিত হলেও সঙ্গীতের জগতে তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডার ছিল বিশাল। শৈশবেই গান লেখা ও সুর করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। কৈশোরে গ্রামের আখড়া ও আসরে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি জনমনে পরিচিতি লাভ করেন।

আধ্যাত্মিক সাধনা ও সংগীতচর্চার পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সেই তারামনি টিলা পরিচিতি লাভ করে ‘দুর্বিন টিলা’ নামে। শৈশবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। মাত্র সাত বছর বয়সে পিতাকে হারান দুর্বিন শাহ। তবে পারিবারিক আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, সাধুসঙ্গ এবং নিজস্ব চিন্তা-চেতনা তাঁকে সংগীতের পথে এগিয়ে নেয়। ১৯৪৬ সালে সুরফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। দুর্বিন শাহের অধিকাংশ গানে সুফিবাদ ও মরমিবাদের গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে তাঁর সৃষ্টির পরিধি কেবল আধ্যাত্মিক সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বাস্তবতা, গ্রামীণ জীবন, মানবিক সম্পর্ক এবং দেশপ্রেমও তাঁর গানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

তাঁর গানকে বিষয়বৈচিত্র্যের দিক থেকে বাউল, বিচ্ছেদ, আঞ্চলিক, গণসংগীত, মালজোড়া, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, গোষ্ঠ, মিলন, রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি, হামদ-নাত, মারফতি, পির-মুর্শিদ স্মরণ, ওলি স্মরণ, ভক্তিগীতি, মনঃশিক্ষা, সুফিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, কামতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, পারঘাটাতত্ত্ব ও দেশের গানসহ বিভিন্ন ধারায় বিন্যস্ত করা যায়। এ ছাড়া বিবিধ বিষয়েও তিনি অসংখ্য পদ রচনা করেছেন।

১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড সফর করেন দুর্বিন শাহ। তাঁর অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন আরেক কিংবদন্তি বাউলসাধক শাহ আবদুল করিম। ইংল্যান্ডে তাঁর গানের কথা, সুর ও গভীর ভাবদর্শনে মুগ্ধ হন প্রবাসী বাঙালি ও সংগীতপ্রেমীরা। তাঁর অসাধারণ জ্ঞান, সাধনা ও সংগীতপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

দুর্বিন শাহের গানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সহজ-সরল শব্দের ভেতরে গভীর জীবনদর্শন ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের প্রকাশ। তাঁর গানে মানুষের অন্তর্জগৎ, আত্মার অনুসন্ধান, মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা এবং পরম সত্তার সন্ধান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে অবলম্বন করে তিনি যে মরমি সাহিত্য রচনা করেছেন, তা বাংলা লোকসংগীতকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মর্যাদা।

১৯৭৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৫৭ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি বাউল কবি। তাঁর শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও সংগীত ও সাধনার জগতে তিনি আজও অমর।

ছাতকের নোয়ারাইয়ের তারামনি টিলা থেকে উঠে আসা এই সাধক শুধু একটি অঞ্চলের গর্ব নন, তিনি বাংলা লোকসংগীত ও মরমি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর জন্মদিনে নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গান, দর্শন ও জীবনসাধনা তুলে ধরা এবং তাঁর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।

স্মৃতিচারণায় উঠে আসা দুর্বিন শাহের জীবন ও সাধনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না; তাঁর সৃষ্টি ও দর্শনের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

Share





Related News

Comments are Closed