সাংবাদিক তুরাবের ২য় শাহাদাতবার্ষিকী আজ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সাংবাদিক এটিএম তুরাবের শাহাদাতের ২ বছর পূর্ণ হলো আজ। ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে ২ বছরে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। ক্ষমতার মসনদে বসেছে নির্বাচিত সরকার। সেই সরকারের মেয়াদও ৬ মাস হতে চলেছে। ২ বছরে অর্জন কেবল ২ জন আসামী গ্রেফতার আর তদন্ত।
এর মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে একাধিকবার। বদলেছে তদন্তকারী সংস্থাও। তবু শেষ হয়নি তদন্ত, শুরু হয়নি বিচার।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিতে শহীদ সাংবাদিক এ টি এম তুরাব হত্যার মামলায় দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশ আসামি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে তাই বিচার না পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষাও বয়ে চলেছে তুরাবের পরিবার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত একদিকে করছে পিবিআই, অন্যদিকে চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত।
পিবিআই বলছে- তাদের তদন্ত শেষ পর্যায়ে। আর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। ইন্টারনেট ছিল বন্ধ। জুমার নামাজের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে সিলেট নগরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ চলছিল। ওই সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে বন্দরবাজারে সড়কে অবস্থান করছিলেন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। তিনি দৈনিক নয়াদিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন।
উত্তাল দিনে নগরের বন্দরবাজার এলাকায় জুমআর নামাজের পরপরই বিএনপি ও খেলাফত মজলিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিল শুরু হয়। ওই সময় বিক্ষুব্ধ জনতা ও দায়িত্বরত সাংবাদিকদের দিকের লক্ষ্য করে ছোঁড়া পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি। তার শরীরে ৯৮টি ছররা গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে ময়নাতদন্তে উল্লেখ করা হয়। মাথায়ও আঘাতের চিহ্ন ছিল।
রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে পরপারে পাড়ি জমান সিলেটের তরুণ এই সাংবাদিক।
শহিদ সাংবাদিক এ টি এম তুরাবের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার পৌরশহরের ফতেহপুর গ্রামে। তিনি অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রহিম ও মমতাজ বেগমের ছেলে।
এদিকে তুরাবের মৃত্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সিলেটের সাংবাদিকরা। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন তারা।
তবে তুরাব হত্যার ঘটনায় প্রথমদিকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে স্বৈরাচার সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ জাবুর সিলেটের আদালতে মামলা করেন। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাদেক কাউসার দস্তগীরকে প্রধান আসামি করা হয়। আদালতের আদেশে কোতোয়ালি থানা মামলা রেকর্ড করলেও আসামিদের গ্রেপ্তারে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ ওঠে। পরে মামলার তদন্তভার পিবিআই সিলেটকে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাদেক কাউসার দস্তগীর ও পুলিশ কনস্টেবল উজ্জ্বল সিংহকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন আছে।
তবে মামলার এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামি এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় বিচার নিয়ে হতাশা ও সংশয় রয়েছে তুরাবের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে।
মামলার তদ্ন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর পরিদর্শক মোহাম্মদ মুরসালিন গণমাধ্যমকে বলেন- আমাদের পক্ষ থেকে তদন্তকাজ প্রায় শেষের দিকে। তদন্তের প্রয়োজনে যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার বলেছি, যেসব স্থানে যাওয়া দরকার গিয়েছি। এছাড়া যে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছিলো সেটি আমরা পরীক্ষা করিয়েছি। মামলার অন্যতম দুই আসামি সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (ক্রাইম, উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউছার ও কোতোয়ালি থানার কনস্টেবল উজ্জলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তৎকালীন কোতোয়ালির ওসি মঈন উদ্দিন পলাতক। এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদ্ন্ত শেষে অপেক্ষায় আছি।
তিনি আরও বলেন- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শুধু সাংবাদিক তুরাব-ই নন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সিলেট বিভাগের যত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তার বেশ কয়েকটির তদ্ন্ত করছে, তাই হয়তো তাদের তদন্তে একটু বিলম্ব হচ্ছে।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন- ‘মামলার তদন্তকাজ চলমান’ এই কথার বাইরে আসলে আমার বলার এখতিয়ার নাই।
উল্লেখ্য, ঘটনার ৪ দিন পর (২৪ জুলাই) রাতে নিহত তুরাবের ভাই আবুল আহসান মো. আজরফ (জাবুর) বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে না নিয়ে জিডি হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ। পরে তুরাবের ভাই ১৯ আগস্ট সিলেটের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে তদন্তের জন্য কোতোয়ালি থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। মামলায় ১৮ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২০০-২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (ক্রাইম, উত্তর) মো. সাদেক দস্তগীর কাউছার, উপকমিশনার (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি আজবাহার আলী শেখ, এসএমপির কোতোয়ালি থানার সহকারী কমিশনার (এসি) মিজানুর রহমান, বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কল্লোল গোস্বামী, কোতোয়ালি থানার সাবেক ওসি মঈন উদ্দিন, পরির্দশক (তদন্ত) ফজলুর রহমান, এসআই কাজী রিপন আহমদ, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি আপ্তাব উদ্দিন, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি পীযূষ কান্তি দে, সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ও ৩২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর রুহেল আহমদ, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সজল দাস অনিক, শিবলু আহমদ, সেলিম মিয়া, সাজলু, আজহার, ফিরোজ ও উজ্জ্বল।
কনস্টেবলের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গুলি করেন এডিসি দস্তগীর :
সাংবাদিক এটিএম তুরাব হত্যা মামলায় রিমান্ডে গুলি করার কথা স্বীকার করেন সিলেট মহানগর পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সাদেক কাউসার দস্তগীর। গত বছরের ডিসেম্বরে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে নেওয়া হয় ৫ দিনের রিমান্ডে।
তদন্তকারী কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে দ্স্তগীর জানান- ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই বেলা ২টার দিকে বিএনপির মিছিলে তার গানম্যান কনস্টেবল মোজাহিদের হাত থেকে অস্ত্র নিয়ে ৪৫ ডিগ্রি কোনে (এঙ্গেলে) উপর দিয়ে গুলি ছোড়েন। তবে কাউকে হত্যার উদ্দেশে তিনি গুলি ছুঁড়েননি।
রিমান্ডের পর মলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ মোরসালিন জানান- জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঘটনার দিনের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ সাদেক কাউসার দস্তগীরকে দেখানো হলে তিনি গুলি ছোড়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে গুলি ছুড়েছেন, হত্যার জন্য নয়।
দস্তগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে মুরসালিন সেদিন আরও জানান- ঘটনার দিন কোতোয়ালি থানার সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মিজানুর রহমান ফোর্সকে গুলি করার আদেশ দিয়েছিলেন।
গেল বছরের ২০ জুলাই প্রথমবারের মতো তুরাব হত্যা মামলার দুই আসামীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। চাওয়া হয় রিমান্ড। গত বছরের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে চার্জশীট দাখিল করার কথাও জানিয়েছিলেন আইসিটি কোর্টের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তাগণ। কিন্তু এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর। সামনে চলে আসছে আরেক আগস্ট।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কোর্টের একটি তদন্ত টীম গত সপ্তাহে সিলেট সফর করে গেছেন। তারা তুরাব হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাথে কথাও বলছেন।
মামলার বাদী সাংবাদিক তুরাবের বড় ভাই আবুল আহসান মোহাম্মদ আজরফ (জাবুর) হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে আমার ভাইকে হত্যা করা হলো। শত শত ফুটেজ, নিউজ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকার পরও একের পর এক তদন্তের নামে কালক্ষেপনে আমরা বিচার নিয়ে হতাশ। প্রশাসন এখন পর্যন্ত মাত্র ২ জন আসামীকে গ্রেফতার করতে পেরেছে। অন্য আসামীদের গ্রেফতারে কোন তৎপরতা না থাকার বিষয়টি দুঃখনজক।
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে পাঁচবার তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত যেন আর শেষ হয় না। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন- ‘আমরা চাই না, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো এই মামলার তদন্তও দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে থাকুক। মৃত্যুশয্যায় থাকা মা মমতাজ বেগম যেন সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
Related News
ওসমানীনগরের মঙ্গলচণ্ডী নিশিকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট নিরসনের দাবি
Manual7 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: শিক্ষক সংকটে ভোগছে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার শতবর্ষী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানRead More
২১ জুলাই সিলেটে রোগীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে সেবা
Manual3 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ল্যাবএইড ক্যান্সার হসপিটাল, ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক এবং ল্যাব এইড ফার্মাRead More



Comments are Closed