ছাতকে কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের ভূমিতে লোলুপ দৃষ্টি, দখলচেষ্টার অভিযোগে উত্তেজনা
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের দানকৃত সরকারি ভূমি দখলের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উদ্বেগ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৬৫ বছর আগে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য এলাকার দানশীল ব্যক্তিরা যে ভূমি সরকারের অনুকূলে দান করেছিলেন, সেই ভূমির একটি অংশ পুনরায় বিক্রি করে একটি চক্র মালিকানা দাবি করছে। ফলে হাসপাতালের মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি রক্ষার প্রশ্নে জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, দলিলপত্র ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬১ সালে কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য এলাকার ১৮ জন দানশীল ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ মেডিকেল অফিসারের অনুকূলে দুইটি সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে মোট ২৭ কেদার ভূমি দান করেন। এর মধ্যে দলিল নং-৭৯২-এর মাধ্যমে গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থসহ ১২ জন এবং দলিল নং-৭৯৩-এর মাধ্যমে তাহির আলীসহ আরও ৬ জন ভূমি দান করেন।
দানকৃত ওই ভূমির ওপর বর্তমানে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থাপনা, সীমানা প্রাচীর, যাতায়াতের রাস্তা ও নৌকাঘাট রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিনেও হাসপাতালের নামে জমিগুলো যথাযথভাবে নামজারি ও রেকর্ডভুক্ত না হওয়ায় সেগুলো পূর্ব মালিকদের নামেই রয়ে যায়। এই প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই দানকৃত ভূমি পুনরায় বিক্রির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অভিযোগ অনুযায়ী, ভূমিদাতা গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থের উত্তরাধিকারীরা তাদের পিতার দানকৃত জমির একটি অংশ ২০১২ সালে বিক্রি করেন। দলিল নং-৩১৭৯/১২ অনুযায়ী গোপতি প্রিয় পুরকায়স্থ ও গকোলেন্দু পুরকায়স্থ ১৩ আগস্ট ২০১২ তারিখে পাইগাঁও (বর্তমানে খিদ্রাকাপন) গ্রামের হাজী জফর আলীর পুত্র কবির আহমদের কাছে ৭ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। একইভাবে দলিল নং-৩২০৪/১২ অনুযায়ী তাপস পুরকায়স্থ ২৩ আগস্ট ২০১২ তারিখে কৈতক গ্রামের মৃত আফিজ আলীর পুত্র নজির আলীর কাছে ৪ শতাংশ জমি বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিক্রিকৃত জমির একটি অংশ হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে এবং প্রায় ২ শতাংশ জমি হাসপাতালের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে এসব জমি নিয়ে মালিকানা দাবি আইনগত ও বাস্তবিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
এলাকাবাসী জানান, ২০১২ সালে কবির আহমদ প্রথমবার হাসপাতালের জমি দখলের চেষ্টা করলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের বাধার মুখে তা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ৭ মে ২০২৫ তারিখে তার লোকজন হাসপাতালের জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভূমি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) করতে এলে আবারও স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের মুখে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালের দানকৃত জমির দলিলে উল্লিখিত ছয়টি দাগের প্রতিটির উত্তর সীমানায় সড়ক ও জনপদ বিভাগের জমির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির অস্তিত্ব নেই। ফলে দাতাদের উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে পরবর্তীতে বিক্রিকৃত জমির বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তারা আরও বলেন, যাদের কাছ থেকে কবির আহমদ ও নজির আলী জমি ক্রয় করেছেন, তাদের পূর্বসূরিরাই বহু আগে দলিলের মাধ্যমে জমি হাসপাতালের নামে দান করেছিলেন। একবার সরকারি কাজে দান করা জমির ওপর পরবর্তীতে ব্যক্তিগত মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। সে কারণে সংশ্লিষ্ট বিক্রয় দলিল ও নামজারির বৈধতা খতিয়ে দেখা জরুরি।
হাসপাতালের ভূমি দখলের অভিযোগ সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিনের নজরে আনা হলে তিনি সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের নির্মাণকাজ ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্থানীয়দের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন। সভায় বক্তারা হাসপাতালের দানকৃত ভূমি রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে স্থানীয় বাসিন্দারা সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে কথিত অবৈধ নামজারি বাতিল, দানকৃত ২৭ কেদার ভূমি হাসপাতালের নামে নামজারি এবং সরকারি রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়। একই দাবিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছেও আবেদন করেন।
সূত্র জানায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টির শুনানির জন্য ৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেন এবং মাঠ জরিপ করে যৌথ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তবে এখনো সেই প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অদৃশ্য কোনো প্রভাবের কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতির শিকার হচ্ছে।
এদিকে ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের জমি রক্ষার দাবিতে সংবাদ প্রকাশ, প্রশাসনের কাছে অভিযোগ প্রদান এবং দখলচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সমাজসেবককে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলাও দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে কবির আহমদ চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন, যাতে কৈতক গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও সমাজসেবক মো. আব্দুর রহিম, মোহাম্মদ রাজ উদ্দিন, ব্যবসায়ী মো. আশরাফ আহমদ এবং আব্দুর গফুরকে আসামি করা হয়। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালের জমি রক্ষায় ভূমিকা রাখার কারণেই তাদের হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
কৈতক গ্রামের প্রবীণ মুরব্বি হাজী আব্দুস সোবহান বলেন, “গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থ হাসপাতালের জন্য জমি দান করেছিলেন। ৬০ বছরেরও বেশি সময় পরে সেই জমি আবার বিক্রি করা অত্যন্ত বিস্ময়কর। যে জমিতে হাসপাতালের স্থাপনা ও বাউন্ডারি রয়েছে, সেই জমি কীভাবে বিক্রি হলো এবং কীভাবে নামজারি হলো, তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
ভূমিদাতাদের একজন উত্তরাধিকারী ঈমান আলী বলেন, “যদি সরকার দানকৃত জমি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য দাতাদের উত্তরাধিকারীরাও একই ধরনের দাবি করতে পারেন। এতে সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন বলেন, “বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেখছেন। তদন্ত, পরিমাপ ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয় সচেতন মহল, সুশীল সমাজ ও এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে কথিত অবৈধ নামজারি বাতিল, দানকৃত ২৭ কেদার ভূমি কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। অন্যথায় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভূমি বেহাত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
Related News
ছাতকে কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের ভূমিতে লোলুপ দৃষ্টি, দখলচেষ্টার অভিযোগে উত্তেজনা
Manual8 Ad Code ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়াবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কৈতক ২০ শয্যাRead More
ছাতকে ৪৪ বছরের ইমামতি জীবনের সমাপ্তিতে মৌলভী কবির আহমদের রাজকীয় বিদায়ী সংবর্ধনা
Manual1 Ad Code আনোয়ার হোসেন রনি, ছাতক থেকে: সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী খাইরগাঁওRead More



Comments are Closed