Main Menu

হারিয়ে যাচ্ছে গরুর গাড়ি, লাঙল দিয়ে জমি চাষ

Manual5 Ad Code

মো. সফিকুল আলম দোলন, পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি: পঞ্চগড়ে কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার লাঙল দিয়ে জমি চাষ আর গরুর গাড়ি এই ঐতিহ্যটি। জমি চাষের ঐতিহ্যবাহী একটি চিরায়ত পদ্ধতি ছিলো গরু-মহিষ, জোয়াল ও লাঙল দিয়ে জমি চাষ। এটি ছিলো অনেক উপকারী এক পদ্ধতি। কারণ লাঙলের ফলা জমির অনেক গভীর অংশ পর্যন্ত আলগা করতো। গরুর পায়ের কারণে জমিতে কাঁদা হতো অনেক এবং গরুর গোবর জমিতে পড়ে জমির উর্বরতা শক্তি অনেক বৃদ্ধি করতো।

Manual7 Ad Code

ধানকাটার পর যেন ধানগুলো ঝরে না যায় সেজন্য মাঠ থেকে ধানের আঁটিগুলো গরুর গাড়িতে ভরে বোঝাই করে ধানক্ষেত থেকে মাড়াই করার জন্য কৃষকের বাড়িতে নিয়ে আসতো। ধান মাড়াইয়ের পর খড়গুলো হতো গরুর খাবার। কেউ কেউ ধানের খড় দিয়ে ঘর ছাউনি দিতো, হতো শীতল ঘর।

Manual4 Ad Code

জেলায় লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ এখন আর চোখে পড়ে না। পড়ে না ধানের আঁটি বোঝাই গরুর গাড়ি। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির আগমনে হারিয়ে গেছে এই চিরচেনা দৃশ্যটি। এ দৃশ্য চলনবিলের সবখানেই।

একসময় দেখা যেত সেই কাক ডাকা ভোরে কৃষকরা গরু ও কাঁধে লাঙল-জোয়াল নিয়ে বেরিয়ে পড়তো মাঠের জমিতে হালচাষ করার জন্য। ধানকাটার পর ধানের আঁটিগুলো গরুর গাড়িতে ভরে বোঝাই করে ধানক্ষেত থেকে মাড়াই করার জন্য কৃষকের বাড়িতে নিয়ে আসতো। বর্তমানে আধুনিকতার স্পর্শে ও বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের ফলে কৃষকদের জীবনে এসেছে নানা পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের ছোঁয়াও লেগেছে কৃষিতে। তাই সকালে কাঁধে লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যেতে আর দেখা যায় না কৃষকদের।

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গরু, লাঙল ও জোয়াল। এই লাঙল-জোয়াল নিয়ে রয়েছে অসংখ্য সাহিত্য-সংস্কৃতি। বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি পত্রিকার নামই ছিল ‘লাঙ্গল’। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হালচাষের পরিবর্তে এখন ট্রাক্টর অথবা পাওয়ার টিলার দিয়ে অল্প সময়ে জমি চাষ করা হয়। এসেছে ধান মাড়াইয়ের অত্যাধুনিক হারভেস্টার।

Manual4 Ad Code

এক সময় দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কৃষক গরু, মহিষ পালন করত হালচাষ করার জন্য। আবার অনেকে গবাদিপশু দিয়ে হালচাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ছিলেন। আবার অনেকে ধান, গম, ভুট্টা, তিল, সরিষা, কলাই, আলু প্রভৃতি চাষের জন্য ব্যবহার করতেন। নিজের সামান্য জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতে হালচাষ করে তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করত। হালের গরু দিয়ে দরিদ্র মানুষ জমি চাষ করে ফিরে পেত তাদের পরিবারের সচ্ছলতা। আগে দেখা যেত কাক ডাকা ভোরে কৃষক গরু, মহিষ, লাঙল, জোয়াল নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়তো। এখন আর চোখে পড়ে না সে দৃশ্য। জমি চাষের প্রয়োজন হলেই অল্প সময়ের মধ্যেই পাওয়ার টিলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে চালাচ্ছে জমি চাষাবাদ। তাই কৃষকরা এখন পেশা বদল করে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরু, মহিষ, লাঙল, জোয়াল দিয়ে জমিতে হাল চাষ।

বোদা উপজেলার বালাভীড় গ্রামের প্রবীণ কৃষক মোজাহারুল বলেন, ‘ছোটবেলায় হালচাষের কাজ করতাম। বাড়িতে হালচাষের বলদ গরু ছিল ২-৩ জোড়া। চাষের জন্য দরকার হতো এক জোড়া বলদ, কাঠের তৈরি লাঙল, বাঁশের তৈরি জোয়াল, মই, লরি (বাঁশের তৈরি গরু তাড়ানোর লাঠি), গরুর মুখে টোনা ইত্যাদি। আগে গরু দিয়ে হালচাষ করলে জমিতে ঘাস কম হতো। অনেক সময় গরুর গোবর জমিতে পড়তো, এতে করে জমিতে অনেক জৈবসার হতো। ক্ষেতে ফলন ভালো হতো।’ শুধু তাই নয় আগেকার দিনে বিশাল গোচারণ ভূমিতে অগনিত গরুর পাল দেখা যেত।

Manual4 Ad Code

এখন নতুন নতুন আধুনিক বিভিন্ন মেশিন এসেছে, সেই মেশিন দিয়ে এখানকার লোকজন জমি চাষাবাদ করে। তাই গরু, মহিষ, লাঙল, জোয়াল নিয়ে জমিতে হাল চাষ করা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

গরুর লাঙল দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ শতাংশ জমি চাষ করা সম্ভব। আধুনিক যন্ত্রপাতির থেকে গরুর লাঙলের চাষ গভীর হয় এবং তা পরিবেশ বান্ধব। জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ফসলের চাষাবাদ করতে সার, কীটনাশক কম লাগতো। দিনে দিনে এভাবেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামবাংলার কৃষ্টি ঐতিহ্য। আর গরুর গাড়ি শুধু দেখা যায় পহেলা বৈশাখ পালন করতে। গরু-মহিষ, লাঙ্গল ও জোয়াল ছিলো আমাদের ঐতিহ্য ও পরিবেশসম্মত কৃষি পদ্ধতি। সেই সময় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ার স্পর্শ ছিলো না। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি পুরাতন চাষ পদ্ধতিকে আমূল পরিবর্তন করেছে। কৃষকরা আগে যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি বর্তমানে কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়াই তার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছেন। অধিক ফলনশীল জাতের ফসল চাষ করে কম সময়ে-অল্প খরচে অধিক লাভবান হচ্ছেন শুধুমাত্র আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে। এভাবে গোটা কৃষি সেক্টর অত্যাধুনিক কৃষি প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে যাবে যা অভিনব কৃষি বিপ্লব ঘটাবে তাতে সন্দেহ নেই। আগামীতে কৃষিতে আরও পরিবর্তন আসবে যা কৃষকদের ডিজিটাল বানিয়ে দেবে। কাঠের লাঙ্গল দেখা যাবে শুধুই যাদুঘরে আর সেদিন হয়তো বেশী দূরে নেই।

 

 

 

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code