নিরাপত্তাহীন সড়ক: মৃত্যুর মিছিল থামার ডাক
মোহাম্মদ মহসীন: নিশাত আর রবিন দম্পতির নতুন সংসার, বয়স মাত্র দুই বছর। শহরের উপকণ্ঠে এক ভাড়াবাড়িতে বসবাস। নিশাত সদ্য বেসরকারি একটি ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে, আর রবিন ফ্রিল্যান্সিং করে সংসার চালায়। প্রতিদিন সকালে নিশাতকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দেয় রবিন, তারপর নিজে হেঁটে ফেরে বাসায়। সেদিনও ঠিক তেমনই সকাল। বাসে তুলে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল রবিন। অথচ বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির কাভার্ডভ্যান চোখের পলকে তাকে ছিটকে ফেলে দেয় কয়েক গজ দূরে। নিশাত তখনো জানে না, তার প্রতিদিনকার সে হাসিমুখ আজকের মতোই শেষ দেখা। এভাবে প্রতিদিন অসতর্কতা, অদক্ষতা আর অবহেলায় ঝরে যাচ্ছে শত শত প্রাণ। আর আমরা কেবল খবরের শিরোনামে গুনছি সংখ্যাগুলো।
বাংলাদেশের সড়ক যেন এক অঘোষিত কসাইখানা। প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম ভাঙে নতুন কোনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর দিয়ে। বাসচাপায় প্রাণ হারানো শিক্ষার্থী, ট্রাকের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া প্রাইভেটকার, কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো মোটরসাইকেলের আরোহী। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর দেশে গড়ে ৫-৬ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। তবু আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। দুর্ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ইন্নালিল্লাহি’ পোস্ট, দুইদিনের আলোচনা। তারপর আবার স্বাভাবিক জীবন। অথচ প্রতিটি মৃত্যু একেকটি পরিবারকে আজীবনের কান্না উপহার দিয়ে যায়।
সড়ক যেন আজ এক ভয়াল খেলার মাঠ, যেখানে প্রতিদিন জীবন বাজি রাখা হয়। তবে অন্ধকারে আলো দেখাচ্ছে কিছু উদ্যোগ। নতুন ট্রাফিক আইন, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, মিডিয়ার সরব ভূমিকা। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, যদি না প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। চালক, যাত্রী, প্রশাসন, নীতিনির্ধারক-সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও পরিবহন খাত সুশৃঙ্খল রাখতে সরকারও বদ্ধপরিকর। সড়কে নিরাপত্তা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনয়নে সরকার তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সেবাগুলোকে আরও সহজ, দ্রুত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছে। পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআরটিএ দেশের প্রতিটি জেলায় চালু করেছে বিশেষ প্রচারাভিযান। এর অংশ হিসেবে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক বার্তা ছড়িয়ে দিতে লিফলেট, পোস্টার এবং স্টিকার বিতরণ করা হচ্ছে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী চালকদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে বাস্তবায়নাধীন। বিআরটিএ-কে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং জনসেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সড়ক পরিবহন বাংলাদেশের প্রধান ও সর্বাধিক ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যম। আধুনিক, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের সড়ক নেটওয়ার্ক ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে। এই নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সঙ্গে বাড়ছে মোটরযানের সংখ্যা এবং তার ব্যবহারও। জনবল বৃদ্ধি, বিআরটিএ’র প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট অনলাইন সেবার পরিধি সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেবা সহজীকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা সংক্রান্ত বিধানঃ
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২’ প্রণয়ন করেছে। মোট ১৬৭টি বিধি সমন্বিত এ বিধিমালা ২৭ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।
বিধিমালার আওতায় ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে এককালীন অন্যূন ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা, অঙ্গহানির ক্ষেত্রে এককালীন অন্যূন ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা, চিকিৎসা সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকলে এককালীন ৩,০০,০০০ (তিন লাখ) টাকা, চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকলে এককালীন অন্যূন ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিধান রাখা হয়েছে।
ট্রাস্টি বোর্ড সরকারের অনুমোদনক্রমে আর্থিক সহায়তার এই পরিমাণ কমাতে বা বাড়াতে পারবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে অথবা মৃত ব্যক্তির আইনানুগ উত্তরাধিকারী দুর্ঘটনার তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে। আবেদন ফরম ও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ওয়েবসাইটে।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ প্রদানের লক্ষ্যে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর ৫৩ ধারায় আর্থিক সহায়তা তহবিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এ তহবিলের জন্য প্রতিটি মোটরযান মালিককে বাধ্যতামূলকভাবে বার্ষিক বা এককালীন চাঁদা প্রদান করতে হবে। ১২-সদস্যবিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড (বিআরটিএ চেয়ারম্যান, পরিবহন মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকসহ) এ তহবিল পরিচালনা করবে। দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করলে, তদন্ত সাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে। এছাড়া, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা নির্ধারিত রয়েছে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পাসকৃত ‘সড়ক পরিবহন আইন’-এ।
সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এ বলা হয়েছে, চালক নিয়োগে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, গণপরিবহনে পিটিএ অনুমতিপত্র, এবং কন্ডাক্টর/সুপারভাইজারের ক্ষেত্রে লাইসেন্স ও ডোপটেস্ট সনদ বাধ্যতামূলক। এদের শ্রম আইন অনুযায়ী বেতন ও সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা দরকার, সড়ক নিরাপত্তায় প্রয়োজন গাড়ির গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার, দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।
তবে আমি বা আপনি যতই সচেতন যাত্রী বা চালক হই না কেন, অন্যের ভুলে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তাই সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকলকে একযোগে আইন মেনে চলা, ভালো চালক, যাত্রী ও পথচারী হওয়া জরুরি।
মূলকথা: সড়ক দুর্ঘটনা কমলে শুধু প্রাণই বাঁচবে না, দেশের অর্থনীতিও হবে আরও শক্তিশালী। তাই এবার সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামুক। ভ্রমণ হোক নিরাপদ ও আনন্দময়। -পিআইডি ফিচার
লেখক: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।
Related News
এতেকাফের ফজিলত
Manual1 Ad Code হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দার প্রতি অমূল্য তোহফাRead More
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধের স্মারক বদর দিবস
Manual4 Ad Code হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: ঐতিহাসিক বদর দিবস ১৭ রামাদ্বান। হিজরি দ্বিতীয় সনেরRead More



Comments are Closed