Main Menu

মাতৃভাষা হোক সর্বজনীন, বাংলা হোক বিশুদ্ধ

Manual8 Ad Code

মো. আকিকুর রেজা: ফেব্রুয়ারি মাস। হাটে-ঘাটে-মাঠে, পত্র-পত্রিকায়, সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে, সভা¬-সমাবেশ-আলোচনায় সর্বত্র কান পাতলে এ মাসে শোনা যায় ‘ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি’। রক্তে পাওয়া বাংলার ইতিহাস যেন উদাসী ফাগুন হাওয়ায় ভেসে আসে বর্তমান মানসপটে। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, যুদ্ধ, রক্তক্ষয়ের ইতিহাস আছে বহু দেশের, বহু জাতির। কিন্তু মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য প্রাণ বিসর্জন, অকল্পনীয়ই বটে। ৭৩ বছর আগে এই ফেব্রুয়ারিতেই ফাল্গুনের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নামা মিছিলে ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে। ফাল্গুনের ফুলের সৌরভ চাপা পড়েছিল বারুদের গন্ধে, আম্রকানন রঞ্জিত হয়েছিল বরকত, সালাম, জব্বার, রফিক, শফিউরদের টগবগে রক্তে।

বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস সুপ্রাচীন, হাজার বছরেরও অধিক । দুইশত বছরের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শোষণের বাহুমুক্ত হয়ে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই সুপ্রাচীন ইতিহাসকে পদদলিত করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেয়। ইতিহাস বাদ দেওয়া যাক, নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাও ছিল বাংলা। উর্দু ছিল মুষ্টিমেয় মানুষের ভাষা। এই হঠকারিতার প্রতিবাদে সরব হয় ছাত্র-জনতা। কলম তুলে নেন বুদ্ধিজীবীরা। আন্দোলনকে বেগবান করতে গড়ে উঠে তমদ্দুন মজলিস, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ইত্যাদি। নেতৃত্বে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন ভাষাসৈনিক আব্দুল মতিন। ঘাত-প্রতিঘাতের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শাসকগোষ্ঠীর জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষাসৈনিক গাজিউল হকের নেতৃত্বে রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। মিছিলে পুলিশ নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করে। দিনটি ছিল বাংলা ৮ ফাল্গুন, ১৩৫৮ সন। এর ৪৭ বছর পর ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

Manual3 Ad Code

তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আড়ালে থেকে যায়। এই আন্দোলন শুধু বাংলা ভাষার জন্য হয় নি, হয়েছিল প্রকৃতপক্ষে মাতৃভাষার জন্য। সেসময় বাঙালির মুখের ভাষা যদি হিব্রু হতো, তবে মানুষ রাজপথ কাঁপাত ‘রাষ্ট্রভাষা হিব্রু চাই’ স্লোগানে। সাময়িক আবেগের বশে মানুষ হরহামেশাই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। কিন্তু মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে রাজপথে নেমে আসার জন্য প্রয়োজন হয় প্রাণাধিকপ্রিয় কোন আদর্শ কিংবা বিশেষ কোন অনুপ্রেরণার। মাতৃভাষা হচ্ছে এমন এক সত্তা যা আদর্শ কিংবা অনুপ্রেরণার সীমাকেও ছাড়িয়ে যায়। আমরা বর্তমান প্রজন্ম কি সেই গুরুত্ব যথাযথ উপলব্ধি করতে পারছি? পারছি না বলেই হয়ত যত্রতত্র মাতৃভাষার অপমান, মাতৃভাষার অবমূল্যায়্ন।
মাতৃভাষার প্রসঙ্গ আসলে আমরা শুধু বাংলার কথাই বুঝি। অথচ বাংলাদেশ বহু জাতি, বহু ভাষা এবং বহু সংস্কৃতি মিলিয়ে বৈচিত্রে ভরপুর একটি রাষ্ট্র। বাংলা ছাড়াও এদেশে আরো ৪০ টি ভাষার প্রচলন রয়েছে। এদেশে অন্তত ৫০ টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী্র বসবাস। প্রচলিত বাকি ৪০ টি ভাষার মাঝে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষাও রয়েছে। মণিপুরি ভাষা, চাকমা ভাষা ছাড়াও গারোদের নিজস্ব ভাষা মান্দি, ত্রিপুরাদের ককবোরক ভাষা রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা, উপভাষা। কিছু ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে, কিছু ভাষা লিখা হয় বাংলা বর্ণমালায় আবার কিছু ভাষায় রোমান বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। এ সবকিছুর সমন্বয়েই বাংলাদেশের ভাষা বৈচিত্র। ভাষা একটি দেশের সংস্কৃতির অনস্বীকার্য অনুষঙ্গও বটে। দুর্ভাগ্যবশত, এদেশের বেশ কয়েকটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘মীতৈ ময়েক তম্বিবগী স্কুল’ শিরোনামটিতে চোখ আটকে যায়। মণিপুরি ভাষা চর্চা এবং সুরক্ষার উদ্দেশ্যে মৌলভীভাজারের কমলগঞ্জে নিজ বাড়ির একটি ঘরের বারান্দায় শিক্ষক ও কবি বৃন্দা রানী সিনহা গড়ে তুলেছেন মণিপুরি ভাষা প্রশিক্ষণকেন্দ্র বা মীতৈ ময়েক তম্বিবগী স্কুল। মণিপুরি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তাদের ভাষাই এখন বিলুপ্তির পথে। অন্য ভাষাগুলোর অবস্থা বর্ণনা বাহুল্য। বৃন্দা রানী সিনহার এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ হয়ত কমলগঞ্জের ছো্ট একটি অংশে মণিপুরি ভাষা্র উৎকর্ষ সাধন করবে। কিন্তু অন্য ভাষাগুলো রক্ষার উদ্যোগে বৃন্দা রানী সিনহার মত ব্যক্তিগতভাবে কেউ এগিয়ে আসবে এমনটি ভাবা অবান্তর। তাছাড়া শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগ ভাষা সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা নিয়েও প্রশ্ন থাকে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী, এদেশের অন্তত ১৪ টি ভাষা বিলুপ্তির পথে। ভাষা একটি সমাজ কিংবা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কোন ভাষা হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সংস্কৃতির একটি সত্তা হারিয়ে যাওয়া। ভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারে অন্যতম কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে প্রতিটি ভাষায় অন্তত প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখা। প্রতিটি ভাষার অভিধান রচনা করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে ভাষা টিকিয়ে রাখতে এটুকু যথেষ্ট নয়। এতে কাগজে কলমে হয়ত ভাষা টিকে থাকে। প্রকৃতভাবে ভাষা টিকিয়ে রাখতে ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগের ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে হবে। আর এসকল উদ্যোগ গ্রহণে নিজ নিজ ভাষাভাষীদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এটি অনুধাবন করতে হবে যে শুধু বাংলাই মাতৃভাষা নয়, বরং প্রতিটি ভাষাই মাতৃভাষা।

অন্য ভাষাগুলোর দুর্দশা যেমন সত্য, তেমনি এটিও সত্য যে বাংলা ভাষাও আজ ভালো নেই। যে বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে পাওয়ার জন্য এত ত্যাগ, সে বাংলাকে এখনো আমরা সঠিকভাবে ধারণ করতে শিখি নি। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের নিবেদন প্রকাশ ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু সভা-সমাবেশ আর দিবস উদযাপনেই সীমাবদ্ধ। শুদ্ধ বাংলা চর্চা এবং বাংলা ভাষার পরিসর বৃদ্ধির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। জন্মের পর প্রকৃতিগতভাবেই বাংলায় কথা বলতে শিখি বিধায় আমাদের বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে বাংলা শেখার মত কোন বিষয় নয়। একাডেমিক কারিকুলামেও তাই বাংলা ভাষাশিক্ষা অবহেলিত। স্বল্প পরিসরে ব্যাকরণ শেখানোতেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজী শিক্ষার প্রতি যতটুকু গুরুত্ব দেয়া হয় তার সিকিভাগও বাংলার জন্য বরাদ্দ থাকে না। উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক ইংরেজী মাধ্যমে পড়াশুনা করানো হয়। ইংরেজী দোষের কিছু নয়, তবে বাংলায় শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ রাখা উচিত। উচ্চশিক্ষার্থে ব্যবহৃত প্রায় সব গ্রন্থই ভিনদেশী ভাষায় রচিত। অথচ জাপান, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উচ্চশিক্ষার জন্য নিজস্ব ভাষায় পুস্তক রচনা করে নিয়েছে। পৃথিবী জুড়ে প্রায় ২৮ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে, যা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বিবেচনায় পঞ্চম সর্বোচ্চ। ভারত কিংবা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাভাষীদের বাদ দিলেও বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। এর চেয়েও ঢের কম মানুষের জন্য বিভিন্ন দেশ যদি একাডেমিক গ্রন্থগুলো নিজ ভাষায় রচনা করতে পারে তবে বাংলা ভাষায় কেন সম্ভব হচ্ছে না?

Manual6 Ad Code

বাংলা ভাষা নিয়ে হচ্ছে না উল্লেখযোগ্য কোন গবেষণা। তাছাড়া গবেষণায় নেই পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা মূল্যায়ন। বাংলা ভাষা এখনো ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় কিংবা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তে আবদ্ধ। অথচ ভাষাকে যুগোপযোগী করে তোলার জন্য প্রয়োজন নিরন্তর গবেষণার। বাংলা ভাষা প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমিও বিগত বছরগুলোতে কিছু বানান সংস্কার আর একুশে বইমেলা আয়োজন করেই ক্ষান্ত। এমনকি একুশে বইমেলাতেও জায়গা করে নিচ্ছে মানহীন, বস্তাপচা বই- যেগুলোকে সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াটা সাহিত্যের ঘোরতর অপমান। অথচ ভাষার বিকাশে সাহিত্যের প্রভাব অনেক গুরুত্ববহ।

Manual8 Ad Code

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল এদেশে উর্দু হরফে বাংলা লিখার প্রচলন ঘটাতে। প্রবল প্রতিরোধের কারণে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, এদেশের মানুষ এখন ইংরেজী হরফে বাংলা লিখতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করে। আর যারা বাংলায় লিখে তারাও ভুলভাল বাংলা আমদানি করছে। বাংলা ভাষার অপব্যবহার এবং অপপ্রয়োগের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্ম। কেউ কেউ আবার কথার মাঝে দৃষ্টিকটুভাবে ভিন্ন ভাষার শব্দ কিংবা ইংরেজীতে কথা বলাকেই স্মার্টনেস হিসেবে বিবেচনা করেন। বিকৃত হতে হতে বাংলা ভাষার জগাখিচুড়ি অবস্থা। ছাত্রজীবনে একবার কলকাতা ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় দেখেছিলাম সেখানকার এলিট শ্রেণি তো বটেই, মধ্যবিত্তরাও নিত্যদিনের কথা বলার মাধ্যম হিসেবে বাংলার চেয়ে ইংরেজীকে প্রাধান্য দিচ্ছে। সেটা তারা দিতেই পারে, তারা ভাষার জন্য প্রাণ দেয় নি। কিন্তু আমরা বাংলাদেশিরা কেন বাংলাকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখছি? ভিনদেশি ভাষা শেখা এবং প্রয়োগ খারাপ কিছু নয়, তবে মাতৃভাষাকে ডিঙিয়ে ভিনদেশি ভাষাকে আপন করে নেওয়া জাতীয়তাবোধকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।

‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই’- আবহমান বাংলার বৈচিত্র এবং বাংলা ভাষার প্রতি নিবেদন কী গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে এ গানের ভাষায়। কাকতালীয়ভাবে গানটির স্রষ্টা প্রতুল মুখোপাধ্যায় রক্তে রাঙানো এ ফেব্রুয়ারির গত ১৫ তারিখ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। সময়ের সাথে ভাষা পরিবর্তন, পরিবর্ধন হবে এটিই স্বাভাবিক। তবে তা যেন কোনভাবেই বিকৃতির পর্যায়ে না যায়। এ লক্ষ্যে আমাদের যেমন বাংলা ভাষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে তেমনি ভাষাবিদদেরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। ভাষার স্বরূপ অক্ষুণ্ণ রেখে ভাষাকে যুগোপযোগী করতে গবেষণা এবং উৎকৃষ্ট সাহিত্য চর্চার কোন বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশে অতীত ঝেড়ে ফেলে বাংলা একাডেমিকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। যে বাংলা ভাষা জন্ম দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ¬-নজরুল-জীবনানন্দ সে বাংলা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন হোক। একই সাথে ভাষাগত বৈচিত্র সংরক্ষণে জোর দিতে হবে। দেশের প্রতিটি ভাষা যেন মাতৃভাষা হয়ে টিকে থাকতে পারে। প্রতিটি মানুষ যেন মাতৃভাষার উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত হতে পারে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষায় এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া বজায় রাখার মাধ্যম হিসেবে ভাষা হোক অনবদ্য অনুষঙ্গ। -পিআইডি ফিচার

লেখক: তথ্য অফিসার (বিসিএস তথ্য), আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।

 

Manual5 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code