Main Menu

কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি

Manual1 Ad Code

মো. মমিনুল হক: কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে সজিব হোসেন বাবু নামে (১৮) এক কলেজছাত্র নিহত হয়েছেন। গত ৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে নগরীর অশোকতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ১৩ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় সোহান (১৭) নামে এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি মানুষের মধ্যে আতংক ও উদ্বেগ বেড়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। এ অবস্থায় সেখানে কয়েকটি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প বসাতে হয়েছে। প্রকাশ্য চুরি-ছিনতাই, তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি প্রায়ই দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম হয়। বিভিন্ন জায়গায় খুনোখুনিও ঘটছে একাধিক। আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং ফুটপাত-বাজার দখলে উন্মত্ত হয়ে ওঠছে অপরাধীরা।

Manual7 Ad Code

ওপরের ঘটনাসমূহ সারা দেশের খন্ডিত চিত্র। বিগত দিনে সাধারণত শহুরে এলাকাগুলোয় বেশি দেখা গেলেও এ সমস্যা এখন গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, নারীদের উত্ত্যক্ত করা- দেশের যেকোনো এলাকায় এখন এ ধরনের অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের নাম আসছে। গতবছরের ১৮ মে একটি জাতীয় দৈনিকে কিশোর গ্যাং নিয়ে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা গত এপ্রিল মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কথিত কিশোর গ্যাংদের তৎপরতা নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এখন সারা দেশে ২৩৭টির মতো ‘কিশোর গ্যাং’ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা শহরে, ১২৭টি। এসব গ্যাংয়ের (অপরাধী দল) সদস্য ১ হাজার ৩৮২ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রামে রয়েছে ৫৭টি। এসব দলের সঙ্গে জড়িত ৩১৬ জন।’ আরো বলা হয়, ‘প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রাম নয়, গাজীপুর ও খুলনা মহানগর এলাকায়ও বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং চক্র গড়ে উঠছে; যারা খুন ও ধর্ষণের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা।’

রিপোর্ট আরো উল্লেখ করা হয়, ‘কিশোর গ্যাং সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা (পৃষ্ঠপোষকেরা)। কিশোর গ্যাংয়ের মদদদাতা ও আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের তথা নেপথ্যের শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।’

কিশোর গ্যাং বলতে কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েদের এমন এক দলকে বোঝানো হয়, যারা মিলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শন ও ক্ষমতার দাপট দেখায়। কিশোরদের গ্যাং সংস্কৃতি একটি সামাজিক সংকট হিসেবে পরিগণিত হয়েছে, যা শুধু কিশোরদের নয় বরং সমগ্র সমাজের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান নব্বই দশকের শেষ দিকে। অন্যদিকে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করে খুন ও মাদক চোরাকারবারীসহ বিভিন্ন অপরাধমূক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে স্বার্থান্বেষীমহল।

Manual3 Ad Code

ইউনিসেফ-এর এক হিসাবে বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা অস্বাভাবিক না হলেও, অনাকাক্সিক্ষত। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গে কিশোর অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে শিল্পায়ন ও নগরায়নের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে তাদের ৪০ শতাংশই কিশোর। আর কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির মধ্যেই বাংলাদেশে দেখা দিয়েছে কিশোর গ্যাং কালচার। সমাজ গবেষকরা বলছেন, বিগত সময়ে দেখা গেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনীতিবিদদের প্রশ্রয় ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এসব গ্যাং দিনকে দিন ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। ফলে বিশেষ করে শহর এলাকায় মানুষের নিরাপদ বসবাসের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠেছে এসব বাহিনী।

সমাজ মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল টার্ডের ধারণা, অনেক সহজ-সরল, নিরপরাধ কোমলমতি কিশোর অপরাধীকে অনুকরণ করে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। তার মতে, অনুকরণের প্রথম শিকার হয় নবীনরা এবং তারা সহজেই অপরাধের ফাঁদে পড়ে। টেলিভিশন, ভিডিও, সিনেমা, নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে কিশোরদের মনস্তাত্তিক, চিন্তা-ভাবনা, দর্শন আকর্ষণ সহজেই পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এভাবে অনেক কিশোর অপরাধ জগতে প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বেশিরভাগ পরিবারের সন্তানের প্রতি অভিভাবকদের তেমন মনোযোগ নেই। তারা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। আর এটি সন্তানদের বিপথগামী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে কিশোররা শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলেও বয়সের কারণে তাদের শাস্তির আওতায় আনা যায় না। তাদের পাঠানো হয় কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে। সেখানে গিয়ে অনেকেই সংশোধিত হওয়া তো দূরের কথা, তারা আরো ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে বেরিয়ে আসে।

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি প্রতিরোধের জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারে। পরিবারের উচিত তাদের সন্তানদের প্রতি সঠিক যত্ন নেওয়া; ধর্মীয় মূল্যবোধসহ বিভিন্ন বিষয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা। পিতামাতাকে সন্তানদের মানসিক ও আবেগজনিত সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা মাধ্যমে আস্থা তৈরি করতে হবে। এবিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। স্কুল ও কলেজগুলোতে কিশোরদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা প্রদান, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং দলগত চেতনা জাগ্রত করার জন্য নিয়মিত কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের পাশাপাশি সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিদেরও এসব অনুষ্ঠানে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে, যা কিশোরদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে সহায়ক হবে। যা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রশাসনের কিশোর গ্যাং কালচার সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মশালা, আলোচনা সভা এবং প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দরকার। তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য সামাজিক সংগঠনগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কিশোরদের মধ্যে ইতিবাচক মূল্যবোধ প্রচার করতে পারে।

Manual8 Ad Code

দেশের বাস্তবতায় কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সংশোধনের সুযোগ রেখে আইন প্রয়োগ, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধকরণ, সামাজিক অনুশাসনের পরিধি বৃদ্ধি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। পরিবার, সমাজ, ধর্ম ও বন্ধু-বান্ধব কিশোরদের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে পারে। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তারুণ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ করা জরুরি। নীতি বাস্তবায়নে তাদের সার্বিক সম্পৃক্ততা ও সুফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিশোরদের মধ্যে ‘গ্যাং অপসংস্কৃতি’ দূর করতে হবে। এজন্য শিশু-কিশোরদের মেধা ও সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক মনন বিকাশে পরিবার, সমাজ ও সরকারি সকল পর্যায়ে পদক্ষপ গ্রহণ করতে হবে। নতুবা এর পরিণাম থেকে আমরা কেউ মুক্ত থাকতে পারব না। -পিআইডি ফিচার

Manual4 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code