সিলেটে শিশু সাবিহা হত্যা, ৩ দিনের রিমান্ডে মা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটে নিজের শিশুসন্তানকে হত্যার দায়ে গ্রেফতারকৃত নাজমিন জাহানকে (২৮) তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকালে তাঁকে আদালতে প্রেরণ করে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে ৩ দিন মঞ্জুর করেন সিলেট চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সুমন ভূঁইয়া।
বিষয়টি বৃহস্পতিবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান।
এর আগে বুধবার দিবাগত রাতে নাজমিন জাহানকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন তার স্বামী সাব্বির আহমদ।
স্বামীর প্রতি ক্ষোভ ও অভিযোগ ছিলো সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বাদেপাশা ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর গ্রামের মো. জিয়া উদ্দিনের মেয়ে নাজমিনের। স্বামীর কাছ থেকে ‘অযত্ন, অবহেলা আর অপবাদ’ পাওয়ার অভিযোগ তার। সে ক্ষোভ উগড়ে দেন নিজের ১৭ মাস বয়েসি শিশুসন্তান নুসরাত জাহান সাবিহার উপর। বুধবার বেলা ২টার দিকে সাবিহাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তিনি। পুলিশকে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন নাজমিন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত শিশুর নাম নুসরাত জাহান সাবিহা। তার বাবা সাব্বির আহমদ সিলেট দক্ষিণ সুরমার বলদি এলাকার বাসিন্দা ও কাতার প্রবাসী। সম্প্রতি সাব্বির দেশে ছুটিতে এসেছেন। কিন্তু সাব্বিরের সঙ্গে নাজমিনের বনিবনা না থাকায় তিনি (নাজমিন) শাহপরাণ এলাকার নিপোবন-৪৯ এ আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। সঙ্গে তার ছোট বোন ও আগের স্বামীর ঘরের ১১ বছরের এক সন্তান থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে বুধবার বেলা ২টার দিকে ১৭ মাস বয়েসি শিশু সাবিহার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নাজমিন। এসময় বিষয়টি দেখতে পেয়ে নাজমিনের কবল থেকে তার বোন ও প্রতিবেশী এক মহিলা শিশুটিকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাবিহাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এসময় হাসপাতাল থেকে নাজমিন পালাতে চেষ্টা করলে উপস্থিত লোকজন তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। পরে কোতোয়ালি থানার একদল পুলিশ গিয়ে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে।
কোতোয়ালী থানায় আসার পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাংবাদিকদের সামনে নিজের শিশুমেয়েকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন নাজমিন। এসময় তিনি বলেন, ২০১৫ সালের মে মাসে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বিয়ের ৬ মাস পর সাব্বির বিদেশে চলে যান। পরে তিনি শাহপরান এলাকার নিপোবন-৪৯ নং বাসায় থেকে সিলেটের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতে থাকেন।
নাজমিনের অভিযোগ, বিদেশের যাওয়ার পর থেকে স্বামী সাব্বির আর তার খোঁজ নেননি। ভরণ-পোষণও করেননি। বিদেশে থাকা অবস্থায় সাব্বির পরিচিতজনদের মাধ্যমে নাজমিনকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা বলতেন। এমন অবস্থায় চার বছর পর ২০২০ সালে দেশে আসেন সাব্বির। দেশে এসে নাজমিনকে বুঝিয়ে আবার সংসার শুরু করেন তিনি। তখন নাজমিন গর্ভবতী হন। তাকে গর্ভবতী রেখে সাব্বির আবারও কাতার চলে যান। তবে প্রবাসে যাওয়ার পরপরই গর্ভের সন্তান নিজের নয় বলে দাবি করেন সাব্বির।
নাজমিন বলেন, আমি তখন ডিএনএ টেস্ট করার কথা বলি। কিন্তু এরপরও সাব্বির আমার বিরুদ্ধে পরিচিত সকলের কাছে কুৎসা রটাতে থাকে এবং আমাকে অপবাদ দিতে থাকে। তবে জন্মের পর মেয়ের চেহেরা অবিকল তার বাবার মতো হওয়ায় মানুষের প্রশ্ন থেকে আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
নাজমিন আরও বলেন, সাব্বির ১৫ দিন আগে দেশে এসেছেন। কিন্তু আমার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। চার-পাঁচ দিন পর পর শুধু কয়েক মিনিটের জন্য মেয়েকে দেখতে যান। কিন্তু আমি স্ত্রী হিসেবে তাকে কাছে পাইনি।
স্বামীর বিরুদ্ধে চরিত্রহীনতার অভিযোগ এনে নাজমিন বলেন, ও পরকীয়া করে না। বহু নারীর কাছে যায়। একজনের সঙ্গে পরকীয়া করলে হয়তো তাকে ফেরাতে পারতাম।
কিন্তু সবকিছুর পরে নিজের সন্তানকে হত্যা করলেন কেন? সে তো নির্দোষ ছিলো? পুলিশের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার তো সব শেষ। আমার জীবনকে একেবারে নষ্ট করে দিয়েছে সাব্বির। নিজের সন্তানকে- আমাকে সময় দেয় না। আমাকে জিন্দা লাশ করে ফেলছে সে। তাই আমার মাথা কাজ করেনি। তার প্রতি ক্ষোভে-কষ্টে মেয়েকে বালিশচাপা দেই। আমি ইমোশন থেকে আমার বাচ্চাটাকে মারছি। কিন্তু বালিশাচাপা দেওয়ার পর আমার আবেগ জেগে ওঠে। আমি আমার মেয়েকে মারার পর তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরি এবং অনেক্ষণ কান্না করি। এসময় আমার বাচ্চার হৃদস্পন্দন আমি বুঝতে পারি। ওইসময় বাড়িওয়ালি এসে আমার কাছ থেকে আমার মেয়েকে নিয়ে নেন। এর পরপরই আমার মেয়ে হড়হড়িয়ে বমি করে। পরে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিজের মেয়েকে হত্যার দায় স্বীকার করে নাজমিন বলেন, আমি কাউকে ফাঁসাবো না। সাব্বিরকেও ফাঁসাবো না। সব দোষ আমার। আমি আমার মেয়েকে খুন করছি। আমার ফাঁসি হোক। আপনারা আমাকে ফাঁসি দিন। অথবা কেউ আমার দুটো হাত কেটে ফেলুন। আপনারা যদি আমাকে শাস্তি না দেন তবে আমি যে কোনো সময় সুইসাইড করতে পারি।
এদিকে, নাজমিনের স্বামী সাব্বির আহমদকেও বুধবার বিকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বুধবার রাতে সাব্বির বাদি হয়ে নাজমিনকে আসামি করে শাহপরাণ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-১১।
শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আনিসুর রহমান বলেন, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেননি নাজমিন। যে কারণে তাঁকে আদালতে প্রেরণ করে পুলিশের পক্ষ থেকে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। পরে বিজ্ঞ আদালত ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়ে আসার অনুমতি দেন। বর্তমানে তিনি আমাদের হেফাজতে আছেন। আগামী ৩ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
Related News
সিলেটে শ্রীমৎ রাধারমণ গোস্বামীর ৫৬তম তিরোধান উৎসব উদযাপিত
Manual7 Ad Code ডেস্ক রিপোর্ট: ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে সিলেটে সিদ্ধ মহাত্মাRead More
শহীদ ওয়াসিম ও মোস্তাকের কবর জিয়ারতে সিলেট মহানগর জামায়াত নেতৃবৃন্দ
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্র ঘোষিত মাসব্যাপীRead More



Comments are Closed