মা দিবস উদযাপন
স্বপন তালুকদার: আজ মা দিবস। ফেসবুক সহ বিভিন্ন মিডিয়ায় অনেক লেখা পড়ছি মায়েদের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের। তাই আজকের দিনে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরা প্রয়োজন মনে হলো। যে মায়ের জন্য আমরা এই সুন্দর ধরণীর আলো বাতাসে বেঁচে আছি। এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ উপভোগ করছি যাঁদের কল্যাণে তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার ভালোবাসার স্বরূপ কিছুটা জানা দরকার, তাই নয় কি?
করোনা ভাইরাসের কারনে এবছর আমরা ঘরে বসে মা দিবস উদ্যাপন করছি। আমরা এবার ঘরে বসে বসে মায়েদের সেবা নিচ্ছি। একবার কি ভাবছি আমরা মায়েদের কি দিচ্ছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মায়েরা এই করোনাকলে কেমন আছেন?
আমরা ভীষণভাবে মর্মাহত যখন দেখি বিভিন্ন প্রতিবেদনে খবর আসে, এই লকডাউনের সময়ে নারীর প্রতি বিশ্বজুড়েই সহিসংতা বেড়েছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্প্রতি একটি টেলিসার্ভে পরিচালনা করেছে। যাতে দেখা গেছে, এ বছরের এপ্রিলে শাটডাউন চলাকালীন তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৭ হাজার ২০৩ জন নারীর মধ্যে চার হাজার ২৪৯ জন নারীই বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের সন্তানরা কীভাবে খারাপ আচরণ করে এবং তাদের বাড়ির বাইরে বনে জঙ্গলে ফেলে আসে সে সম্পর্কে আমরা প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখতে পাই। নারীদের বেতনহীন ঘরের কাজগুলোর এখনও আমাদের রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। আজ আমরা সবাই মা দিবস উদযাপন করছি, অথচ এখনও যথাযথ স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কারণে প্রতিদিন অনেক মা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মারা যাচ্ছেন।
এ তো গেলো করোনাকালের কথা। করোনাকালের পূর্বেও কি আমাদের মায়েরা ভালো ছিলেন? আমরা যদি অতীতের দিকে তাকায় কি দেখতে পাই? গত ৩রা অক্টোবর-১৬ প্রথম আলো প্রতিবেদন দেখলাম আমার দেশের ৮০ শতাংশ নারী বিবাহের পর কোন না কোন ভাবে স্বামী বা অন্য কারো হাতে নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৫ সালের এক হিসেবে দেখলাম নারী স্বামীর মাধ্যমে কোন কোন সময় মানসিক, শারীরিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। মানসিক ৮১.৬ শতাংশ, যৌন ৫৩.২ শতাংশ, শারীরিক ৬৪.৬ শতাংশ নির্যাতনের ধরণ হিসেবে। বয়স হিসেবে ৫-৯ বয়সের মেয়ে শিশু ১.৭ শতাংশ, ১০ থেকে ১৪ বছরের কিশোরীরা ৪১.৮ শতাংশ, ১৫ থেকে ১৯ থেকে ৩৪ শতাংশ, ২০ থেকে ২৪ বয়সী ৯.৯ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৪৯ বয়সী নারীদের ৪.৯ শতাংশ ধর্ষণের শিকার হন।
অতি সম্প্রতি এক আট বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হন এক মসজিদে। শিশুটির বাবাকে বিচার না পেয়ে রেললাইনে মেয়েসহ আত্মাহুতি দেন। প্রেমিক বদরুল কর্তৃক খাদিজাকে বর্বরের মতো রাস্তায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা, ভাগ্য জোরে অনেক উন্নত চিকিৎসার ফলে বেঁচে যায় খাদিজা। একি প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসা বা কোন নারীর প্রতি মানুষের ব্যবহার? তনুকে কারা হত্যা করেছে তার কোন সঠিক তথ্য এক বছরের বেশি সময়েও আমরা জানতে পারিনি। যা আলোচিত ঘটনা, সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। এই তনু বা খাদিজা বা অন্য যাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা হচ্ছে তারা তো আমার মায়ের জাত।কারো বোন, স্ত্রী বা মা।
কিছুদিন আগে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখলাম এক বাবাকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে, মেয়েকে উত্তুক্ত করার প্রতিবাদ করায়। কত শিশু ও নারীর নির্যাতন ধর্ষনের তথ্য দিবো। প্রতি মাসের পনেরো দিনই পত্র পত্রিকায় নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণ, খুন বা নির্যাতনের শিরোনাম দেখা যায়। এই যে শিশু ও নারী ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এসব কারা ঘটাচ্ছেন। এরা সবাই আমার আপনার মতো পুরুষ। আর এই নির্যাতনকারী পুরুষরা তো এই কোন না কোন নারীর সন্তান। এতে কি আমরা লজ্জাবোধ বা অপরাধবোধের অনুশোচনায় ভোগী? আমাদের কত মা তিন চারজন সন্তান সমাজে প্রতিষ্টিত বড় বড় চাকুরি থাকার পর বৃদ্ধাশ্রমে, সে খবর কি আমরা রাখি! নাকি এর কোন প্রতিকার করছি? এমন পরিসংখ্যান সন্তান হিসেবে কতটা অসম্মানের তা কি ভেবে দেখার কথা নয়? উত্তর কি আমাদের কাছে আছে? এমন সন্তানের মা দিবস পালনের সংবাদে মা কতটা গর্ববোধ করতে পারেন? এমন সন্তানের মায়ের প্রতি একটি দিবসকে মা দিবস হিসেবে পালন কতটা হাস্যকর, তা কি আমরা বিবেচনায় নিয়েছি কখনও!
আমি মনে করি, এই দিবস মা দিবস হিসেবে নয়, বিশ্ব মায়েদের প্রতি ক্ষমা ও দয়া ভিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করা যথাযোগ্য হলেও হতে পারে বা অন্য কোন ভাবে মাপ চাওয়া ছাড়া কিছু ভাবার যোগ্যতা বা অধিকার আমরা রাখি না বা কোন যোগ্যতা আমাদের নেই। এমন সন্তানের কি মা দিবস পালনের কোন যোগ্যতা থাকতে পারে?
এমন পরিসংখ্যাণের পর কি মাকে মা দিবসের কথা, মাকে ভালোবাসার কথা, মায়ের আদর পাওয়ার জন্য মায়ের কাছে যেতে পারি বা কাছে যাওয়ার বসার যোগ্যতা বা অধিকার রাখতে পারি? তাই আসুন মা দিবস পালন নয়, মায়েদের পায়ের কাছে মাথা নত করে করোজোরে ক্ষমা প্রার্থনা করি। যদি মায়েদের করুণা হয়। মা তোমরা আমাদের ক্ষমা করো।
আসুন, এই মা দিবসে আমরা আমাদের মায়েদের পাশাপাশি ঘরে ঘরে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য বন্ধের অঙ্গীকারবদ্ধ হই এবং পরিবার ও সমাজে তাদের কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি নিশ্চিত করি। তবেই মা দিবস মহিমান্বিত হবে।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।
Related News
ইউরোপের পথে প্রবাসীদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের ব্যবচ্ছেদ
Manual1 Ad Code শামসুল ইসলাম: ইউরোপ, এক মায়াবী হাতছানির নাম। উন্নত জীবন-যাপন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরRead More
ইসলাম ও বিশ্বায়নে শ্রমজীবী মানুষ
Manual1 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ১২৫ বছর আগে ১৮৮৬ সালে ও বিশ্বের দেশেRead More



Comments are Closed