Main Menu

বিশ্বনাথে গ্রাম পুলিশের মানবেতর জীবন

মো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ প্রতিনিধি : সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় অভাব-অনটনে পড়ে গ্রাম পুলিশেরা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। দারিদ্রের রষানলে পড়ে তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। হায়-হুতাশ এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। যে বেতন পায় তা দিয়ে তাদের সংসার এক সপ্তাহও চলে না। রাতদিন ২৪ ঘন্টা গ্রামীণ পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা ও সরকারের উন্নয়নে অবদান রাখলেও ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি গ্রাম পুলিশদের। যখনই ইউনিয়নের কোথাও সমস্যা দেখা দেয় তখনি ছুটে যেতে হয় তাদের। কাজ হিসেবে পর্যাপ্ত বেতন ভাতাদিসহ অন্যান্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না তারা। ফলে স্বল্প বেতনে গ্রাম পুলিশরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম পুলিশ থাকেন ১০ জন করে। এদের মধ্যে দফাদার পদে থাকেন একজন ও নয়জন থাকেন মহল্লাদার। বর্তমানে দফাদাররা মাসিক তিন হাজার ৪০০ টাকা ও মহল্লাদাররা তিন হাজার টাকা করে বেতন পাচ্ছেন। এই বেতনের অর্ধেক দিচ্ছে সরকার ও অর্ধেক দিচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। ঈদ ও পূজায় বোনাস ছাড়া চাকরিকালীন সময়ে এর বাহিরে আর কোনো অর্থ বা কোন সহযোগিতা পান না গ্রাম পুলিশরা। ফলে এই সামান্য বেতনে কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে গ্রাম পুলিশকে। ইউপি ভবন ও বিভিন্ন সড়কে রাত্রিকালীন ডিউটি, গ্রাম আদালত, গ্রামে কোনো সংস্থার কর্মসূচি চলাকালীন ও সড়ক দুর্ঘটনার স্থানে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব পালন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বাল্যবিয়ে আয়োজনের তথ্য প্রদান, কোনো অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর সংবাদ থানায় জানানো, মাদকদ্রব্য ও জুয়া প্রতিরোধে অভিযান চালনা, ট্রেন ও যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন সময়ে রেললাইন ও সড়ক পাহারা দেওয়া, নির্বাচনকালীন, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ছিনতাইপ্রবন এলাকায় দায়িত্ব পালন এবং মানুষদের মধ্যে সংঘর্ষ রোধে ভূমিকা রাখাসহ আরও অনেক কাজে গ্রাম পুলিশদের দায়িত্ব পালন করতে হয়।

উপজেলার কয়েকজন গ্রাম পুলিশ জানালেন, রাতের আঁধারে গ্রামে নিরাপত্তা দেয়া, চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কাজের কথা শোনা, অপরাধ সম্পর্কে তথ্য প্রদান, অপরাধ দমন, চিহ্নিতকরণ, জন্ম-মৃত্যুর রেজিস্ট্রিকরণ, রাজস্ব আদায়, যৌতুক, বাল্যবিয়ে সম্পর্কে তথ্য দেয়াসহ বহুবিধ কাজ করতে হয় আমাদের। যে বেতন তা দিয়ে আমাদের সংসার মোটেও চলে না। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া খরচ চালাতে পারি না, বিয়ে দিতে, অসুখ হলে ওষুধ কিনতে পারি না। একজন দিন-মজুরের বেতন প্রতিদিন ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা অথচ আমাদের ১০০ থেকে ১১০ টাকা। তারপরও দায়িত্ব পালন করতে হয়। আবার হুকুমদাতাদের ধমক খেতে হয়। একদিকে তো বেতন কম তা আবার অনিয়মিত। আর ওই বয়সে কাজ করার ক্ষমতা না থাকায় পরনির্ভরশীল হয়ে জীবন বাঁচাতে হয়। সন্তানরাও বৃদ্ধ বয়সে দেখ-ভাল করতে অনীহা প্রকাশ করে। তখন কিছুই করার থাকে না। এভাবেই দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে চলছে তাদের জীবন। সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের তথ্য সংগ্রহ করে প্রদান করাসহ গ্রামে গ্রামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অবদান রাখলেও আমাদেরকে দেখার কেউ নেই। আমরা যে টাকা বেতন পাই তা দিয়ে সংসারই চলে না। আজকের দিনে এই তিন হাজার টাকা দিয়ে কিছুই হয়না। কোথাও কোন সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গেই ছুটতে হয়। বলা চলে ২৪ ঘন্টাই আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতো সেবা দেওয়ার পরও আমাদের বেতন অতি সামান্য। তাই আমাদের পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারির ন্যায় সমস্কেল প্রদান, রেশন ব্যবস্থা চালু ও চাকরিকালীন সময়ে কেউ মারা গেলে তার পরিবারকেও এককালীন টাকা দেওয়ার দাবি জানান এই গ্রাম পুলিশ নেতারা।

এব্যাপারে উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ নলি শুক্ল বৈদ্য বলেন, দুই ছেলে-এক মেয়ের পড়ালেখার খরচ যোগাতে গিয়ে আমাদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। শুধু ঈদ ও পূজা ছাড়া আমাদের আর নেই কোনো বোনাস। ফলে স্ত্রী-সন্তানদের অনেক আশাই অপূর্ণ থাকছে।

উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ তৈমুছ আলী বলেন, স্বাধীনতার পর অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা রাত জেগে গ্রাম পাহারা দেই। দারোগা পুলিশের হুকুম শুনি। চেয়ারম্যানের নির্দেশ মান্য করি, দীর্ঘদিন পর এই সময়ে বেতন বেড়েছে সামান্য। কিন্তু কাজের পরিধি বেড়েছে অনেক। এখন পর্যন্ত আমাদের চাকরি জাতীয়করণ করা হয়নি, দেয়া হয়নি চাকরি শেষে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা। ফলে অভাব আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার ইর্শ্বাদ আলী বলেন, যে বেতন পাই তা দিয়ে আমাদের সংসার মোটেও চলে না। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া খরচ চালাতে পারি না, বিয়ে দিতে, অসুখ হলে ওষুধ কিনতে পারি না। একজন দিন-মজুরের বেতন প্রতিদিন ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা অথচ আমাদের ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

0Shares





Related News

Comments are Closed