৬ বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি সাগর-রুনি হত্যা মামলার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক : আজ ১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির মৃত্যুর ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই ছয় বছরেও শেষ হয়নি সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত। গ্রেফতার হয়নি পরিকল্পনাকারীসহ মূল হোতারা। কয়েকবার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন এবং বার বার সময় পিছিয়েও দাখিল করা যায়নি চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট। মামলায় কয়েকজন গ্রেফতার হলেও মূল হোতারা রয়েছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। মামলার ভবিষ্যৎ ও বিচার নিয়ে তাদের স্বজন ও গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও হতাশা। কারা, কি উদ্দেশ্যে তাদের হত্যা করেছে তা আজও অজানা তাদের। গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করেন, সাহসী এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচার না হলে আগামীতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। এরপর কেটে গেছে ছয়টি বছর। তারপরও শেষ হয়নি হত্যা মামলার তদন্ত। শনাক্ত করা যায়নি হত্যাকারীদের। বারবার সময় দিয়েও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ ছয় বছরে মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ তাদের স্বজনরা। সবার প্রিয় সাগর ও তার স্ত্রী হত্যায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সবার মাঝে তা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারছেন না স্বজনেরা।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর হয়ে গেলেও এখনো তার রহস্যের জট খুলতে পারেনি তদন্তের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বারবার তদন্ত নিয়ে আশার কথা বললেও যেই তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলা।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সরওয়ার ওরফে সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনী দম্পতি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন। পরের দিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই)। চারদিন পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে ডিবি রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু গত ছয় বছরেও পুলিশ মামলার তদন্তে কেনো অগ্রগতির খবর দিতে পারেনি। অপরাধীদের চিহ্নিত বা আটকও করা যায়নি এই দীর্ঘ সময়ে৷ বিচারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে হতাশার পাহাড় জমে উঠেছে সাগর-রুনীর পরিবার ও নিকটজনদের মনে। গত বছরই রুনীর ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বলেছিলেন, ‘সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছি। যদি কখনো বিচার সম্ভব হয় সেটি হবে অলৌকিকভাবে। কারণ হ্ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রভাবশালী কেউ জড়িত রয়েছে, আর না হয় তদন্তকারী সংস্থার ব্যর্থতা রয়েছে।’
সাগর-রুনী হত্যার বিচারের দাবিতে সাংবাদিকদের আন্দোলনও সময়ের সাথে বিচারহীনতায় স্তিমিত হয়ে আসছে। বিচারের দাবিতে সোচ্চার সাংবাদিকদের কণ্ঠগুলোও এখন বজ্রকণ্ঠ হয় কেবল ১১ ফেব্রুয়ারি এলেই। এতোদিনেও চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ধীরগতি, অভিযোগপত্র দিতে টালবাহানায় সরকার-প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়েই বারবার প্রশ্ন তুলছেন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতারা। তাদের অনেকে মনে করেন খুনিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। কারণ বাংলাদেশের আইন-শৃংঙ্খলা বাহিনী চাইলে দোষীরা আইনের আওতায় আসে এই দৃষ্টান্ত নতুন নয়। অথচ অদৃশ্য কোনো কারণে সাগর-রুনী হত্যা রহস্য চাপা দেয়া হচ্ছে।
গত ডিসেম্বরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখন পর্যন্ত উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। আর এ কারণেই মামলা নিস্পত্তি করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘সাগর-রুনির মামলাটি বর্তমানে র্যাব দেখছে, আশা করি খুব দ্রুতই রহস্য উদঘাটন হবে।’
এদিকে, দীর্ঘ ছয় বছরেও মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ সাগরের জন্মস্থান পাবনার বেড়া উপজেলার মাসুমদিয়া ইউনিয়নের ছোট নওগাঁ গ্রামবাসী ও তার স্বজনরা। সবার প্রিয় সাগর ও তার স্ত্রী হত্যায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সবার মাঝে তা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারছেন না স্বজনেরা।
সাগরের মামাতো ভাই আতাউর রহমান বলেন, এখনও মনে পড়ে ভাইকে। তাকে হারানোর কষ্ট ভুলতে পারছি না আমরা। তাকে এখন দেখতে না পেয়ে সবসময়ের জন্য মনটা আমার খারাপ থাকে। এত বিচার হয়, আমার ভাই ও তার স্ত্রী হত্যার বিচার হচ্ছে না কেন জানতে চাই।
সাগরের ফুফু সুফিয়া বেগম বলেন, বেঁচে থাকতে সাগর যখন বাড়িতে এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়েছে তখন খুশিতে বুকটা ভরে যেত। কিন্তু গত ছয় বছর ধরে তার কোনো দেখা পাই না। তাকে হারিয়ে যে কি কষ্টে আমরা আছি তা বলে বোঝাতে পারবো না। বেঁচে থাকতে এই হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।
সাগরের চাচাতো ভাই আব্দুল বাতেন বলেন, সাগর-রুনিকে হারিয়ে ছয় বছর হলো যে শূন্যতা আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছে তা পূরণ কিভাবে করবো আমরা। এটাতো পূরণ হবার নয়। আর এই ছয় বছরে দুইজন সাংবাদিক হত্যা মামলার তদন্তই এখন পর্যন্ত শেষ হলো না। তাহলে বিচার কাজ শুরু হবে কবে- এ নিয়ে আমরা হতাশ। আমরা দ্রুত তদন্ত শেষ করে মূল পরিকল্পনাকারীসহ হত্যাকারীদের আইনের আওতায় দেখতে চাই।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার ধীরগতিতে হতাশ জেলার গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পাবনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আঁখিনুর ইসলাম রেমন বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকান্ড ও তার বিচার প্রক্রিয়া সারাদেশের সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে। আমরা এই মামলাটির দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।
টেলিভিশন সাংবাদিক সমিতি পাবনার আহবায়ক রাজিউর রহমান রুমি বলেন, দেশে সাংবাদিক হত্যা অতীতেও হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে। কিন্তু হচ্ছে না শুধু বিচার। পার পাচ্ছে হত্যাকারীরা। উদ্বেগ আতংক সাংবাদিক পরিবারে বাড়ছে। আমরা শুধু দেখছি। এভাবে কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। চাইবো সরকার আন্তরিক হোক। সাগর-রুনি হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক।
Related News
মৌলভীবাজারে হত্যা মামলায় ২ ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড, ২ জনের যাবজ্জীবন
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের মুনিয়ারপাড় গ্রামের মো. আজিজুল মিয়া হত্যা মামলারRead More
সিলেটের জাফলংয়ে নিয়ে তরুণীকে খুন, স্বামী-বন্ধুর মৃত্যুদণ্ড
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের জাফলংয়ে প্রায় ১৫ বছর আগে গার্মেন্ট কর্মী রুনা আক্তার সাথী (১৯)Read More



Comments are Closed