Main Menu

তিতুমীর এবং তাঁর প্রজা আন্দোলন

সৈয়দ মবনু: সূচনাকথা; তিতুমীর, যার পূর্ণাঙ্গ নাম মীর সৈয়দ নিসার আলী। জন্ম ২৭শে জানুয়ারি, ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই মাঘ, ১১৮২ বঙ্গাব্দ। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ১৯ শে নভেম্বর নারিকেলবেড়িয়ার ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিতুমীর শহীদ হন। তিতুমীরের সাথে আমাদের প্রজন্মের ব্যবধান প্রায় দুই শতাব্দীর। বিগত দিনে প্রাজ্ঞজনেরা এ বিষেয়ে প্রচুর আলোচনা পর্যালোচনা করেছেন। আমি মনে করি এর অতিরিক্ত নতুন কিছু বলার নেই। আমি শুধু অনুভ‚তি প্রকাশ করতে পারি। যদি আমার এই অনুভূতি সম্মানিত পাঠকদের কারো ভেতরে নাড়া দিতে সক্ষম হয়, তবে এই ক্ষুদ্র লেখা স্বার্থক।

পলাশী থেকে নারিকেলবেড়িয়া
বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ

তিতুমীর প্রসঙ্গ আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে তাঁর সাথে আমাদের সম্পর্কের যোগসূত্রটা বুঝা প্রয়োজন। নিশ্চয় আমারা আজকের তাকে গুরুত্ব দিচ্ছিনা দৈহিক কিংবা রক্তের কোন সম্পর্কের কারণে। মূলত তাঁর সাথে আমাদের আত্মিক এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র বিজ্ঞানের দু’টি অভিন্ন বিষয়। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আন্দোলন একটি রাষ্ট্রে অনেকগুলো পর্যায়ে হয়ে থাকে। আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রধানত তিনটি পর্যায়কে এখানে গুরুত্ব দিচ্ছি।
এক. পরাধীনতাপূর্ব স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার আন্দোলন।
দুই. পরাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার আন্দোলন।
তিন. স্বাধীনতা ফিরে আসার পর তা সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন।

প্রথম পর্যায়ে দুরকম পরিস্থতি হতে পারে। ক. শত্রæর হুমকী মুক্ত স্থিতিশীল রাষ্ট্রে জনসাধারণের সুখ-শান্তি-নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করার পাশাপাশি বহিঃবিশ্বের দিকে দৃষ্টি রাখা, যাতে বাঁধ ভেঙে কুমিড় ডুকতে না পারে। খ. হুমকীর মুখোমুখি মোকাবেলার জন্য নিয়মতান্ত্রিক বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও প্রস্তুত করা। এই দুরকম পরিস্থিতির যে কোন একটিতে রাষ্ট্র অসচেতন থাকলে ধ্বংস অনিবার্য। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির আমবাগানে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ধ্বংসের মূল কারণ এখানেই। শাসকদের বিলাসিত, অপচয়, দায়িত্ব-কর্তব্যহীনতা এবং সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্কহীনতার সুযোগে বিদেশী শক্তি দেশের ভেতর নিজেদের শেকড় করে নিয়েছিলো। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা যখন মোকাবেলা করতে গেছেন তখন ঘরের বিড়াল অনেক দূরে চলে গেছে। তিনি দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি, শেষ পর্র্যন্ত পরাজিত হয়েছেন বিদেশীদের হাতে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার শাহদাতের পর থেকে ইংরেজরা বাংলায় মোট একশ নব্বই বছর শাসন করেছে। এরমধ্যে প্রথম একশ বছর ছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে এবং নব্বই বছর সরাসরি বৃটিশ সরকার কর্তৃক। গোটা ভারতবর্ষের মধ্যে ইংরেজরা সর্বপ্রথম দখল করেছিলো বাংলা। পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকদের ভেতর থেকেই সর্বপ্রথম বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। তবে এই আন্দোলন অঘোষিত-অপরিকল্পিত ছিলো। এটা হলো স্বাধীনতা আন্দোলনের পর্যায়। এই পর্যায়ে অনেকগুলো স্তর রয়েছে। যেমন-লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে জনগণকে সুসংঠিত করা, বিভিন্ন স্তরে বাহিনী গঠন, দৈহিক প্রশিক্ষণ না থাকলে প্রশিক্ষণ দিয়ে মোকাবেলার জন্য ময়দানে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাসে আমারা এই স্তরগুলো দেখতে পাই। বিদেশী শক্তিগুলো যখন কোনো রাষ্ট্র দখল করে তখন প্রথমে দেশীয় কোনো বিশ্বাস ঘাতক দিয়ে নতুন সরকার গঠন করে জনগণের চোখে ধাঁধাঁ সৃষ্টির লক্ষ্যে। বৃটিশরা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে শহীদ করে প্রথমে মীরজাফর আলী খানকে দিয়ে পুতুল সরকার গঠন করেছিলো। ইংরেজ জলদস্যু ক্লাইভ ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড চলে গেলে ক্লাইভের গর্দভ বলে খ্যাত মীরজাফর আলী খান অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। তখন তিনি নতুন অভিভাবকের সন্ধানে ওলন্দাজদের সাথে গোপন যোগাযেগ শুরু করলে ইংরেজরা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে তারই জামাতা মীর কাসেম আলীকে ক্ষমতায় বসায়। মীর কাসেম আলী তার শশুড়ের মতো আত্মমর্যাদাহীন ছিলেন না। ক্লাইভের সহযোগী রাজবল্লভ, জগৎশেট প্রমুখদেরকে গ্রেফতার করে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রের অপরাধে প্রাণদন্ড দিয়েছিলেন। (জে সি বাগাল, পিজেন্ট রিভোলশান ইন বেঙ্গল, পৃ. ৩)।
মীর কাসেম ইংরেজদের প্রভাবমুক্ত সরকার গঠনের লক্ষ্যে তাঁর রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। মুঙ্গের হলো বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের একটি জেলা শহর।
মীর কাসেম ইংরেজদের টেক্সহীন ব্যবসার সুযোগ বন্ধ করতে চাইলে ইংরেজেরা তা অমান্য করে। তিনি তখন দেশীয় ব্যবসায়ীদের উপর থেকেও টেক্স উঠিয়ে সবাইকে সমপর্যায়ে নিয়ে আসেন। ফলে ইংরেজেদের ব্যবসায় একক আধিপত্য হ্রাস পায়। এইভাবে একের পর এক বিষয়ে ইংরেজদের সাথে মীর কাসেমের মতানৈক্য এক সময় সংঘর্ষে রূপ ধারণ করে। কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, সুতি, উদয়নালা এবং মুঙ্গেরায় ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে মীর কাসেমের সাথে ইংরেজদের প্রকাশ্য যুদ্ধ হয়। মীরকাসেম যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অযোধ্যায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সহযোগিতায় মীর কাসেম ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা করেন। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর ‘বক্স্যার’ নামক স্থানে ইংরেজদের সাথে মীর কাসেম-এর প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে ইংরেজ পক্ষের সেনাপতি ছিলেন হেক্টর মনরো। মীর কাসেম বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হলেও এই যুদ্ধ ঐতিহাসিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটাই ছিলো বাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম নিয়মতান্ত্রিক ঘোষণা। বক্সারের যুদ্ধের পর থেকে ধারবাহিকভাবে উল্লেখিত অনুল্লেখিত অনেকগুলো যুদ্ধ হয়েছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জনের লক্ষ্য। যেমন, ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে ফকির-সন্যাসীদের বিদ্রোহ, ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ফকির মজনু শাহের নেতৃত্ব যুদ্ধ, ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে মজিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রজাবিদ্রোহ, ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে হাজী শরিয়তুল্লাহের নেতৃত্বে ফরায়েজী-কৃষক আন্দোলন। এরই ধারবাহিকতা মীর কাসেম আলীর বক্সারের যুদ্ধের প্রায় সাতষট্টি বছর পর ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে মীর নেসার আলী তিতুমীরের নেতৃত্বে নারিকেল বাড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা তৈরি করে এদেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে একদল মুক্তিযোদ্ধা মুজাহিদ যুদ্ধ করেছিলেন। বিশাল এক শক্তির বিরুদ্ধে বাঁশের কল্লায় বসে যুদ্ধ করা অযৌক্তিক মনে হাত পারে, তবে অনাঙিক্ষত নয়। আমি আমার যা আছে তা নিয়ে চেষ্টা করলাম দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনতে, চেষ্টা করলাম জালেমদেরকে প্রতিরোধ করতে, না পারলেও তা আমার পরাজয় নয়। বরং তা আমার অপারগতা। তিতুমীর মোটেও পরাজিত হননি। তাঁর নারিকেল বাড়িয়ার বাঁশের কেল্লার পথেইতো, পরবর্তীতে এদেশের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। তাঁর শাহাদাতের ভেতর থেকে হাজার হাজার তিতুমীরের জন্ম হয়েছে। শুধু যুদ্ধে বিজয় কিংবা ক্ষমতার মসনদে বসার নামই সফলতা নয়। মূল সফতাতো আদর্শের উপর দৃঢ় থাকা, জালেম শক্তির কাছে মাথা নত না করা। আদর্শের উপর দৃঢ় থেকে প্রাণ বিসর্জন হলেও তাকে সফলতা বলতে হবে, কারবালায় ইমাম হোসেনের শাহাদত বরণ প্রকৃত পক্ষে হোসেনের পরাজয় নয়। মূলত ইতিহাসের মধ্যে হোসেনই বিজয়ী হয়েছেন। যারা আদর্শের সাথে আপোষ করে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণকে ইসলামের বিজয় ভাবেন তাদের স্মরণ রাধা উচিত হযরত আমিরে মোয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনকে খিলাফত আলা মিল হা’জিহিননাবুয়াহ নয়, বরং হযরত হামজা (রা.) এর শাহাদতের নামই খিলাফত আলা মিন হাজিহিন নাবুয়াহ কিংবা আতি-উল্লাহা ওয়া আতিউর রাসুল।

স্বাধীনতা আন্দোলনের আদর্শিক দৃঢ়তায়
সৈয়দ আহমদ শহীদ থেকে তিতুমীর শহীদ

ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সূত্রে ঘটেছে। কোথাও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে, কোথাও আলেম-উলামা পীর-বুজর্গ-মুজাহিদদের মাধ্যমে, কোথাও শাসকদের মাধ্যমে। তবে ব্যাপকহারে ইসলামের আগমন ঘটেছে আলেম-উলামা-পীর-বুজর্গদের আদব-আখলাক-কেরামতির প্রভাবে। এই সময়ে ব্যাপকহারে একটি বিশার জনগোষ্ঠী মুসলমান হয়ে যাওয়ায় অল্প সংখ্যক আলেম-উলামা কর্তৃক গোটা জনগোষ্ঠীকে ইসলামী জ্ঞান দান সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ভাষাগত ভিন্নতাও একটি প্রধান সমস্যা ছিলো। ফলে যে হারে মানুষ মুসলমান হয়েছে সে হারে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার লাভ করেনি। জ্ঞানের অভাবে মুসলমানদের চরিত্রে, মন-মানসিকতায় পূর্বের অনেক সংস্কৃতি-অভ্যাস থেকে যায়, যার অনেকগুলির সাথে ইসলামের-মানব সভ্যতার সরাসরি সংঘর্ষ রয়েছে। ভারতবর্ষে মুসলমানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো প্রায় আটশ বছর। এই আটশ বছরের ইতিহাস থেকে আমাদের স্বীকার কতে হবে, আমাদের শাসকেরা যতটুকু বিলাসী রাজপ্রাসাদ তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন তার অর্ধেকও যদি সময় দিতেন ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে, তা হলে ভারতবর্ষের অবস্থার প্রেক্ষাপট পাল্টে যেতো। তাদের কেউ কেউ কিছুটা চেষ্টা অবশ্য করেছেন, তবে যথেষ্ট নয়। কুতুব মিনার, তাজ মহল, শীষ মহল, সালিমার বাগ ইত্যাদি বিলাসী বিষয় সমূহের চিন্তকের মনে দেশের গরিব জনসাধারণের গারিবত্ব দেখে ঘৃণা সৃষ্টি হলে তাকে নিশ্চয় ঐতিহ্যের অবমাননা বলা যাবে না। মুসলিম শাসকেরা যদি এই সব বিলাসিতায় অর্থ-সময়-শ্রম-মেধা ব্যয় না করে সুপরিকল্পিতভাবে সমাজ সংস্কারে, সমাজ উন্নয়নে, গরীবত্ব দূরিকরণে, শিক্ষার উন্নয়নে সময়-অর্থ-শ্রম দিতেন তা হলে এত দুঃখজনকভাবে মুসলমানদের পতনের ধারা সূচিত হতো না।
মুসলিম শাসনের শেষ পর্বে (১৭০২-৬০) দিল্লীর বিখ্যাত আলেম হযরত শাহ ওয়ালিউল্লা মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে বেসরকারীভাবে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, এর সুফল দীর্ঘ বৃটিশ শাসনের শোষণ নির্যাতনের পথ ডিঙিয়ে এখনো শুধু ভারতবর্ষে নয়, গোটা বিশ্বে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ানো আছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহকে ভারতবর্ষের হাদিস শিক্ষার জনক বলা হয়। দীর্ঘ বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের যে ঐতিহাসিক সাহসী ভূমিকা, এর মূল প্রেরণার উৎস শাহ ওয়ালিউল্লাহ এবং তাঁর সংস্কার আন্দোলন। তাঁর ছেলে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.) ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের আধ্যাত্মিক প্রেরণার মাইল ফলক। তিনি সর্বপ্রথম বৃটিশ শাসিত ভারতবর্ষকে ‘দারুল হরব’ ফতোয়া দিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ আহŸান করেছিলেন। শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভী (র.)-এর ছাত্র এবং খলিফা বালাকোটের শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী, ভাতিজা ইসলামইল শহীদ এবং মেয়ের জামাই মাওলানা আব্দুল হাই (র.)। শাহ আব্দুর আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভীর ছাত্র মাওলানা শাহ ইসহাক, মাওলানা ইসহাকের ছাত্র মাওলানা আব্দুল গণি মুজাদ্দিদী (র.)। মাওলানা আব্দুল গণি মুজাদ্দিসী (র.)-এর ছাত্র বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসেম নানতুবী (র.)।
তিতুমীরের প্রজা আন্দোলন মূলত শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (র.)-এর চিন্তাধারার একটি আন্দোলন। তিতুমীরের রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক গুরু সৈয়দ আহমদ শহীদের জন্ম ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে ল²ৌর নিকটবর্তী রায়বেরেলীতে। তিনি দু’বছর কোরআন-হাদিস শিক্ষাসহ আধ্যাত্মিক সাধনায় ছিলেন দিল্লীতে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভীর নিকট। তিনি যুদ্ধবিদ্যা অর্জন করেন পিÐারীদের নেতা আমীর খানের অধিনে। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি আবার ফিরে আসেন দিল্লীতে। শুরু করেন ‘তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া’ নামে সংস্কার আন্দোলন। শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভীর ভাতিজা শাহ ইসমাইল এবং জামাতা মাওলানা আব্দুল হাই এই সময় সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে ৪০০ শিষ্য নিয়ে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাত্রা শুরু করেন। পথে কোলকাতায় কিছুদিন অবস্থান নিলে বাংলার শত শত মানুষ তাঁর সংস্কার আন্দোলনের সাথে একত্মতা প্রকাশ করেন। হজ্ব শেষে দেশে ফিরে তিনি জিহাদের উদ্দেশ্যে বাহিনী গঠন করেন। পাঞ্জাবের রাজা রণজিৎ সিংহের অত্যাচারে তখন সেই অঞ্চলের মুসলমানদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিলো। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বাহিনী নিয়ে পাঞ্জাবের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বাংলা-বিহার-যুক্তপ্রদেশ-দক্ষিণ ভারতসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক তার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলো। জানুয়ারি থেকে যাত্রা শুরু করে ডিসেম্বর হয়ে যায় তার সীমান্ত অঞ্চলে পৌঁছতে। পাঞ্জাবের নওশেরাতে পৌঁছে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী শিখ রাজা রণজিৎ সিংহের কাছে বিভিন্ন দাবী জানিয়ে পত্র লিখেন। রাজা রণজিৎ সিংহ এই দাবীগুলো উপেক্ষা করলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রথম দিকে যুদ্ধে শিখরা পরাজিত হয়। মুসলমানেরা পেশোয়ার পর্যন্ত দখল করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীকে আমীরুল মুমিনিন নির্বাচিত করা হয়। সর্বযুগেই মুসলমানদের পতনের প্রধান একটি কারণ হলো মতানৈক্য। এবারও ঘটলো তাই। পাঠানরা নিজেদের মধ্যে মতানৈক্যের সূত্রপাত করলে শিখ বাহিনীর আক্রমণ করে পেশোয়ার পর্যন্ত দখল করে নেয়। সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী তাঁর বাহিনী নিয়ে বালাকোটে চলে আসেন। রণজিৎ সিংহের খালসা বাহিনী বালাকোটে মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে।
১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে দু’দলের ভেতর প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী এবং তাঁর শিষ্য শাহ ইসমাইলসহ অনেকই শাহাদত বরণ করেন। সৈয়দ আহমদ শহীদের তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া-এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর সন্তোষ্টি এবং মানুষের মুক্তি ছিলো। তিনি তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে তা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমাদের আন্দোলন জালেমদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তোষ্টির জন্য। আমরা মানুষের কল্যাণে খিলাফত আলা মিন হাজিহিন নাবুয়াহ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’ (সিরতে সৈয়দ আহমদ শহীদ-সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী)।
তিতুমীরের প্রজা আন্দোলনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বুঝতে হলে সৈয়দ আহমদ শহীদের ‘তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া এবং বালাকোটের শাহাদত বরণ প্রথমে বুঝতে হবে। ‘তরিকায়ে মোহাম্মদীয়া মূলত শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ এবং শাহ আব্দুল আজিজ দেহলভীর চিন্তাধারার একটি আন্দোলন। এই হিসেবে মীর নেসার আলী তিতুমীরের প্রজা আন্দোলনও একই চিন্তাধারার বাংলা সংস্করণ। শাহ ওয়ালী উল্লাহর দর্শন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় গেলে আমরা মূল বিষয়ে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে যাবে বলে বিষয়টির এখানেই ইতি করছি।

তিতুমীর এবং তাঁর প্রজা আন্দোলন
বাংলা অঞ্চলের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে মাটি আর মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে যে ক’টি আন্দোলন হয়েছে তারমধ্যে একটি হলো হাজী শরীয়তুল্লাহের ফরায়েজী আন্দোলন। ইংরেজ শাসনামলে জমিদার ও নীলকরদের শোষণ-নির্যাতনে সাধারণ প্রজাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠলে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে হাজী শরীয়তুল্লাহ কৃষক-প্রজাদেরকে জালেম জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচার শোষণ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ফরায়েজী সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। পবিত্র কোরআন-হাদিসের শিক্ষার আলোকে মুসলমানদের সামাজিক জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সবাইকে আত্মপ্রতিষ্ঠার বাণী শিক্ষা দান এই সংস্কার আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো। হাজী শরিয়তুল্লাহের ফরায়েজী আন্দোলনের মতো ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে মীর নেসার আলী তিতুমীর ও একটি প্রজা আন্দোলন গঠন করেন। ব্যবধান শুধু এতটুকু যে হাজী শরিয়তুল্লাহ আরবের সংস্কার আন্দোলনের নেতা মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন আর তিতুমীর ছিলেন ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর আদর্শে অনুপ্রাণিত। চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে তিতুমীরের জন্ম। প্রথম জীবনে তিনি কোলকাতায় একজন মল­যোদ্ধা ছিলেন। স্থানীয় জমিদার তাকে প্রজাদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কিত এক বিবাদে জড়িত হওয়ার অপরাধে তার কিছু দিনের জেল হয়। জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি দিল্লীর রাজ পরিবারের জনৈক ব্যক্তির অধীনে কাজ গ্রহণ করেন। ঐ ব্যক্তির সাথে তিনি হজ্ব পালনার্থে মক্কা শরিফ যান। সেখানে সৈয়দ আহমদ শহীদের সাথে তাঁর সাক্ষৎ হয়। তিনি কিছুদিন সৈয়দ আহমদ শহীদের সহবতে থাকেন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেশে ফিরে হায়দারপুরে বসতি শুরু করেন। হায়দারপুর থেকেই তাঁর সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সূচনা। অল্পদিনেই তাঁর তিন-চারশ শিষ্য হয়ে যায়। তারা ইসলামের আদর্শে নিজেদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে পাওয়া যায় তাদের অনুসারীরা দাঁড়ি রাখতেন এবং ইসলামী পোশাক পরতেন। (হিস্টরী অব ফ্রীডম মুভমেন্ট, ২য় খÐ, ১ম ভাগ)। চব্বিশ পরগণা এবং নদীয়া জেলার অনেক কৃষক তিতুমীরের সংস্কার আন্দোলনে যোগ দিলে তা এক গণ-আন্দোলনে রূপ নিতে থাকে। প্রজাদের সংঘবদ্ধতা দেখে স্থানীয় হিন্দু জমিদারগণ তিতুমীরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। তারাগুনিয়া, নগরকোট ও কুমার গাছির জমিদারগণ তিতুমীরের শিষ্যদেরকে বিভিন্নভাবে অপমানসহ জরিমানা করতে শুরু করেন। পুরয়ার জমিদার কিষেন দেব রায় মুসলমানদের দাঁড়ির উপর টেক্স বসিয়ে দিয়েছিলেন।
(ডলিও ডলিও হান্টার, এ্যানালস অব রুর‌্যাল বেঙ্গল। এ.আর. মল্লিক, বৃটিশ পলিসি টুয়ার্ডস দি মুসলিম।) প্রজাদের উপর জমিদারদের নির্যাতন বন্ধের জন্য তিতুমীর জেলা ও বিভাগীয় কর্মকর্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যর্থ হন। প্রজা নির্যাতন বন্ধের শান্তিপূর্ণ যত উপায় ছিলো তিতুমীর সবই চেষ্টা করেছেন। ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি অস্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ করেন। ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে তিতুমীর তাঁর শিষ্য মুইজউদ্দীনের নারিকেলবেড়িয়া গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান গ্রহণ করেন। মিসকিন শাহ নামক একজন বিদ্রোহী ফকীর এই সময় তাদের সাথে যোগদেন। তিতুমীরের শিষ্যরা এখানে সমবেত হতে শুরু করেন। তারা বাঁশ দিয়ে কেল্লা তৈরি করে রসদ জমা করেন। তারা জমিদারদে অন্যায়ের প্রতিবাদে পুরয়া গ্রামে প্রবেশ করে নিজেদেরকে দেশের মালিক বলে ঘোষণা করেন। তিতুমীরের শিষ্য গোলাম মাসুমকে সেনাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। গোলাম মাসুমের নেতৃত্বে মুজাহিদরা লাউঘাটাসহ আরো বেশ কিছু গ্রাম দখল করেন। তারপর ক্রমাগতভাবে চব্বিশ পরগণা ও নদীয়া জেলার বেশ কিছু এলাকা তিতুমীর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বারাসাতের যুগ্ম-ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার ১২৫ জন সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে তিতুমীর বাহিনীর উপর আক্রমণ করলে প্রচÐ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে আলেকজান্ডারের ১৫ জন সৈন্য মারা যায় এবং অসংখ্য আহত হয়। শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সৈন্যরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। বশীরহাটের দারগাকে তিতুমীর বাহিনী আহত অবস্থায় বন্দী করে নিয়ে আসে। তিতুমীরের মুক্তি বাহিনী বারগুনিয়াসহ আরেকটি নীলকুঠিরে আক্রমণ করে সবকিছু ছিনিয়ে নিয়ে আসেন। ১৭ নভেম্বর কৃষ্ণনগরের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তিনশ ইংরেজ সৈন্য নাকিকেলবেড়িয়ায় আক্রমন করে। প্রচন্ড যুদ্ধের পর ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। বিষয়টি ইংরেজ সরকারের ভীতে কম্পন সৃষ্টি করে। সরকার ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার এবং মেজর স্কটের নেতৃত্বে পদাতিক, অশ্বারোহী এবং বন্দুকদারী সৈন্যদের এক বিশাল বাহিনী তিতুমীরের বিরুদ্ধে প্রেরণ করে। ১৯ নভেম্বর নারিকেলবেড়িয়ায় দুই দলে তুমুল যুদ্ধ হয়। বিশার সরকারী বাহিনীর সাথে যুদ্ধে তিতুমীর শাহাদত বরণ করেন। তাঁর মৃতদেহকে ইংরেজ সৈন্যরা অমানবিকভাবে পুড়িয়ে দিয়েছিলো। তিতুমীর ও তাঁর শিষ্যদের বাড়ি-ঘর ল্ণ্ঠুন করে সেদিন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিলো। সেনাপতি গোলাম মাসুমকে সরকার মৃত্যুদÐ দিয়েছিলো। তাছাড়া ১১ জনের যাবজ্জীবন এবং ১২৮ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদÐ দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক ডবিøও ডবিøও হান্টারের মতে, ‘তিতুমীর তার অধিকৃত এলাকায় স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার প্রজা আন্দোলন একটি গণবিপ্লব ছিলো। কৃষক ও তাঁতীরা এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে জমিদার ও নীকরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। অত্যাচার, অবিচার ও অপমানের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিতুমীরের নেতৃত্বে প্রজাগণ লড়াই করে আত্মসম্মান ও ন্যায় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলো।

নারিকেলবেড়িয়া থেকে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ

১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে নারিকেলবেড়িয়ায় তিতুমীর শহীদ হয়েছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা শহীদদেরকে মৃত বলো না।’ তিতুমীর মারা যাননি, তিতুমীরের মৃত্যু হতে পারে না। ইতিহাস স্বীকার করতে বাধ্য যে, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ তিতুমীরদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। তিতুমীরের এদেশ এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষের আত্মসম্মান-আত্মমর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে যুগে যুগে লড়াই করেছেন, রক্ত এবং প্রাণ দিয়েছেন। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে বারবার মনে প্রশ্ন জাগে; আমরা কি তিতুমীরদের প্রাণ বিসর্জনের মর্মবাণী নিজেদের অস্তিত্বে ধারণ করতে পেরেছি? আমরা কি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের আত্মসম্মান-ন্যায় মর্যাদা জমিদার ও নীলকরদের যে পোষণের বিরুদ্ধে তিতুমীর-হাজী শরিয়তুল্লাহ প্রমুখরা আন্দোলন করেছেন আমরা কি স্বাধীন বাংলাদেশে পেরেছি সেই শোষণমুক্ত-সুদমুক্ত সমাজ গড়তে? অপমানজনক হলেও স্বীকার করতে হবে যে, আমরা পারিনি। কেন পারিনি? সেই অনুভূতি যদি আজকের এই লেখা পাঠকদের হৃদয়ে জাগ্রত করে, তা হলে বলবো-আসুন; আমরা আল্লাহর সন্তোষ্টির লক্ষ্যে এবং দেশের মাটি ও মানুষের স্বার্থে নিজেদের স্বাধীন মতানৈক্যসমূহ পায়ের নিচে রেখে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শত্রæর মোকাবেলায় সংঘবদ্ধ হই।

Share





Related News

Comments are Closed