কমলগঞ্জে সেচ্ছাশ্রমে ধলাই নদীর ঝুঁকিপূর্ন বাঁধ রক্ষার চেষ্টা
প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: অব্যাহত ভাঙ্গনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের মণিপুরী অধ্যুষিত হীরামতি গ্রামের ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধটি প্রায় ১৫০ ফুট লম্বা ফাটলসহ বাঁধটির অধিকাংশ চলে গেছে নদী গর্ভে। দ্রæত ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা বাঁধ উন্নয়ন না করলে আবার টানা বৃষ্টি শুরু হলে যেকোন মুহুর্তে প্রতিরক্ষা বাঁধের অবশিষ্ট অংশ নদী গর্ভে বিলিন হয়ে তলিয়ে যেতে পারে হীরামতি গ্রামটি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ঝুঁর্কিপূর্ণ বাঁধ মেরামতের দাবি জানিয়েও পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন ধরনের উদ্যোগ গ্রহন না করায় অবশেষে বাঁধটি রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন মাধবপুর ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের লোকজন। গত শনিবার সকাল থেকে হীরামতি গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ১৫০ মিটার বাঁধ মেরামতে কাজ শুরু করেন শতাধিক গ্রামবাসী। নিজেদের প্রচেষ্টায়
বাঁধ রক্ষার খবর শুনে ছুটে আসেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলামসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, হীরামতি গ্রাম এলাকায় শতাধিক গ্রামবাসী এক সাথে বাঁধ রক্ষায় কাজ করছেন। প্রতিরক্ষা বাঁধের উপরের ধানি জমি থেকে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে ও বালু বস্তার মধ্যে ভর্তি করছেন লোকজন। অনেকেই আবার বাঁশ কেটে বাঁধের ভাঙ্গনে পাইলিং করছেন বালু ভর্তি বস্তা স্থাপনের জন্য। এভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের এ কাজে এগিয়ে এসেছেন মাধবপুর ইউনিয়নের আশপাশের ৬টি গ্রামের গ্রামবাসী। ধলাই নদীর হীরামতি গ্রাম এলাকার এই ঝুঁকিপূর্র্ণ স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙ্গন সৃষ্টি হলে মাধবপুর বাজার, হীরামতি, গকুল সিংহের গ্রাম, মাঝেরপাড়. ছয়ছিড়ি, ঝাপেরগাঁও এবং মাধবপুর চা বাগান এলাকা তলিয়ে যাবে।
হীরামতি গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার হরি মোহন সিংহ ও মাধবপুর বাজারের সমাজকর্মী আসহাবুর ইসলাম শাওন জানান, গ্রামটি বেশ বড় আয়তনের ছিল। এ গ্রামে পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস ছিল। বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে এখন গ্রামের প্রায় মাঝ নে এসে লেগেছে। এ ১৫ বছরে অসংখ্য বসত ঘর ও কৃষি জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে। অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ স্থানে নতুন করে বসতি স্থাপন করেছেন। বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন হয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে গেলে কয়েক বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড হিরামতি গ্রামে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধ উন্নয়নে কাজ করেছিল। এ কাজটি ঠিকমত হয়নি বলে গত দুই বছর ধরে হীরামতি গ্রাম এলাকায় ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধে অনেক বড় ফাটল দেখা দেয়। তাছাড়া বাঁধের ভাঙ্গনে অনেক স্থানে বাঁধটি একেবারে ক্ষিণ হয়ে গেছে।
বার বার পানি উন্নয়নবোর্ডসহ স্থানীয় প্রশাসনকে গ্রামবাসীরা বাঁধ মেরামেতর জন্য আবেদন নিবেদন করলেও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। স¤প্রতি যেভাবে টানা বৃষ্টি হচ্ছে তাতে উজান থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে শুরু করলে বাঁধটি যে কোন সময় ভেঙ্গে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে গ্রামবাসীদের আশঙ্কা। তাই গ্রামবাসীরা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিকে না তাকিয়ে বাঁধটি মেরামতের জন্য ৬টি গ্রামের লোকজন সভা করে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বাঁধ মেরামতের সিদ্ধান্ত নেন।
মাধবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানুও স্বেচ্ছাশ্রমে ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষার কাজে এগিয়ে আসেন। নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ও ইউপি চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে গত শনিবার (১৭ জুন) সকাল থেকে গ্রামবাসীরা বাঁধের মেরামত শুরু করেন। বস্তার ভিতরে মাটি ও বালু ভরে ভাঙ্গনকৃত এলাকায় ফেলার কাজ শুরু করেন গ্রামবাসীরা।
এদিকে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের খবর শুনে শনিবার দুপুরে ছুটে আসেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইন্দু বিজয় শঙ্কর চক্রবর্তী, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হকসহ উর্দ্ধতন কর্ম্কর্তারা।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক ৬ গ্রামের মানুষের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ মেরামত কাজের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনও গ্রামবাসীর সাথে থাকবে। তিনি বলেন, ধলাই নদী কমলগঞ্জের দু:খ। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, উজানের পানি মাঝে মাঝে ধলাইয়ের বাঁধ ভেঙ্গে ব্যাপক ফসলহানির পাশাপাশি মানুষের সীমাহীন দূর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধলাই নদীর কমলগঞ্জ অংশে প্রায় পাঁচটি জায়গায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাধবপুরের হিরামতির বাঁধ চরম ঝুঁকির মুখে, আর সেটি সরেজমিনে পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক এসেছিলেন। তিনি বাঁধটি মেরামতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশনা দেন।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম ঝুকিপূর্ণ এলাকায় গ্রামাবাসী যেভাবে সেচ্ছাশ্রমে কাজ করে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন তাতে সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং পানি উন্নয়ন র্বোড এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে জরুরী ভিত্তিতে হীরামতিসহ কমলগঞ্জের ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের বাকী ঝূঁকিপূর্ণ স্থান রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড, মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী ইন্দু বিজয় শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, শুধু হীরামতি গ্রাম এলাকা নয় ইসলামপুর ইউনিয়ন থেকে মৌলভীবাজারের মনু নদে মিলিত হওয়ার স্থান পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৭ কি:মি: এলাকার ধলাই প্রতিরক্ষা বাঁধের বেশ কিছু স্থান ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো এলাকার প্রতিরক্ষা বাঁধের উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকার বেশি একটি প্রকল্প প্রস্তাবনায় আছে। প্রস্তাবনাটি অনুমোদন হলে টেন্ডারের পর শুষ্ক মৌসুমে সে কাজটি করতে হবে। আপাতত হীরামতিসহ ঝুঁকিপূর্ণ কিছু স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধ উন্নয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে কাজ করার চেষ্টা করছে।
Related News
মৌলভীবাজারে ১ কোটি ১৬ লাখ ভারতীয় পণ্যসহ ট্রাক জব্দ, আটক ১
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় অভিযান চালিয়ে ১৯২ বস্তা ভারতীয় জিরাRead More
শ্রীমঙ্গলে মসজিদে ঢুকে মুসল্লিকে হত্যা, ঘাতক আটক
Manual8 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ফজরের নামাজের সময় মসজিদে ঢুকে এক মুসল্লিকেRead More



Comments are Closed