Main Menu

ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ৫ বছর

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী এবং তার গাড়ী চালক আনসার আলী নিখোঁজের ৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ সোমবার। এই ৫ বছরে সন্ধান মেলেনি তাদের। এখনো ইলিয়াস আলী নিখোঁজের কারণ রহস্যাবৃত রয়ে গেছে। ইলিয়াস আলী নিখোঁজের আন্দোলনও ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করেছে।
ইলিয়াস আলী ও আনছার আলীকে ফিরে পেতে এখনও অপেক্ষার প্রহর গুণছেন তাদের স্বজন-শুভার্থীরা। নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর পরিবার তাকে ফিরে পাবার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ এ নিয়ে হতাশ। তাঁর এক সময়ের সহকর্মী-সহযোদ্ধারাও ভুলতে বসেছেন ত্যাগী এই নেতাকে।
প্রিয় স্বামীকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ইলিয়াসের স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা। পিতাকে ফিরে পাবার আশায় বুকে পাথর বেঁধে দিন যাপন করছে ইলিয়াসের পুত্র আবরার ইলিয়াস, লাবিব সারার ও মেয়ে সাইয়ারা নাওয়াল। পরিবারের একটাই দাবি তারা যে কোন মূল্যে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ী চালক আনছার আলীকে অক্ষত এবং সুস্থ অবস্থায় তাদের মাঝে ফিরে পেতে চান। এজন্য তারা দেশবাসীর কাছে দোয়া কামান করেন।
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ইলিয়াস পতœী তাহসিনা রুশদি লুনা বলেন, সরকার আন্তরিক হলে ইলিয়াসকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কেননা গুম-নিখোঁজ হওয়ায় অনেক ব্যক্তি এরই মধ্যে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। আমরাও বিশ্বাস করি, ইলিয়াস আলী ফিরে আসবেন। আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ইলিয়াসের অপেক্ষায় থাকব। এখন তিনি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে ইলিয়াস আলী ফিরে আসার পথে চেয়ে রয়েছেন। লুনা বলেন, হত্যা-হামলা-মামলা অনেক নির্যাতন করেও ইলিয়াস নিখোঁজ আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়নি। সিলেটে এখনও ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বিগত উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিশ্বনাথ-বালাগঞ্জ ও উসমানীনগরবাসী ইলিয়াস আলী নিখোঁজের জবাব দিয়েছেন। ইলিয়াস আলী ও তার গাড়ি চালক আনসার আলীকে ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
নিখোঁজ হবার পর ইলিয়াস আলীর পরিবারের ভর করে দীর্ঘশ্বাসের কালোমেঘ। এখনো থামেনি মায়ের আহাজারী। শুকিয়ে গেছে তাঁর চোখের জল। সন্তান হারা বৃদ্ধা মাকে সান্তনা দিতে প্রায় প্রতিদিন গ্রামের বাড়িতে দলের নেতাকর্মীরা ছুটে আসলেও এখন আর আগের মত ইলিয়াস আলীর গ্রামের বাড়িতে নেতা-কর্মীদের নেই তেমন কোন আনাগোনা। সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক ইলিয়াস আলীর গর্ভধারিনী বৃদ্ধা মা সূর্যবান বিবি। তিনি পুত্র শোকে কাতর। অনেকটা শয্যাশায়ী অবস্থায় তিনি অপেক্ষার প্রহর গুণছেন পুত্রের জন্য।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে নিজ বাসায় ফেরার পথে রাজধানী ঢাকার মহাখালী থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার বিশ্বস্থ গাড়ী চালক আনছার আলী। মধ্যরাতে মহাখালী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলীর গাড়ীটি উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময় থেকেই তারা নিখোঁজ রয়েছেন। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ ইস্যুতে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল বিশ্বনাথে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
ভয়াবহ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হয় মনোয়ার, সেলিম ও জাকির। আহত হন অনেকই। ঐ সংঘর্ষে বিক্ষুব্দ জনতা উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায়-জিপগাড়িতে, বিভিন্ন ব্যাংক, মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার, বিপনিবিতানে হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করেছিল। এতে উপজেলা পরিষদের ১৯টি দপ্তরের ১ কোটি ৬২ লাখসহ প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
২২ ও ২৩ এপ্রিলের সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্বনাথে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের আসামী করে দায়ের করা হয় ৬টি মামলা। এসমব মামলায় বিশ্বনাথের ৮টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী ও অনেক সাধারণ মানুষসহ প্রায় ১৮ হাজার লোককে আসামী করা হয়। ৬ ইউপি চেয়ারম্যানসহ শতাধিক নেতাকর্মী কারাবরণ করেন। ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’ ইস্যুতে আন্দোলন করতে গিয়ে ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল পুলিশের সাথে জনতার সংঘর্ষ ও উপজেলা পরিষদের ভাংচুর-অগ্নি সংযোগের ঘটনায় আসামী হওয়ার কারণে ঐ বছরের ১ জুলাই উপজেলার ৭ ইউপি চেয়ারম্যানগণকে বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতের উচ্চ আদালতের রিটের মাধ্যমে তারা চেয়ারম্যান পদ বহাল থাকে।
ইলিয়াসকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গুম করে রেখেছে এমন অভিযোগে পাঁচ বছর ধরে বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নানা কর্মসূচি পালন করছে। দীর্ঘ এই সময়ে ইলিয়াস আলীর সন্ধান পাওয়া না গেলেও সিলেটের বিএনপি নেতা-কর্মীরা মনে করেন, এখনো তিনি বেঁচে আছেন। সরকার আন্তরিক হলেই ফেরত পাওয়া যাবে তাকে।
ইলিয়াসের সন্ধান দাবি আন্দোলন আরও জোরদার করতে বিএনপি নতুন কর্মসূচি নিয়েছে। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের পর ডাকা হরতালে তার গ্রামের বাড়ি বিশ্বনাথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন তিনজন। তার সন্ধান দাবিতে বিএনপির ডাকা কর্মসূচিতে আন্দোলনমুখর হয়ে ওঠে পুরো সিলেট। গঠিত হয় ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ ও ছাত্র-যুব সংগ্রাম পরিষদ। গত পাঁচ বছর ধরে বিএনপির পাশাপাশি সংগ্রাম পরিষদও নানা কর্মসূচি পালন করছে। বিএনপি নেতারা মনে করেন, ইলিয়াস আলী সরকারি হেফাজতে আছেন। কঠোর কর্মসূচি ছাড়া তাকে ফিরে পাওয়া যাবে না।
নতুন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ সোমবার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান। মঙ্গলবার হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদে দোয়া মাহফিল। এ ছাড়া আগামী সপ্তাহে সিলেটে প্রতিবাদ সমাবেশও করার কথা রয়েছে বিএনপির।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পাঁচ বছর পেরোলেও সরকার তার সন্ধান দিতে পারেনি। আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে আমরা সিলেটে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করব। ওই সমাবেশ থেকে জেলাজুড়ে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
এদিকে ইলিয়াসের সন্ধান দাবিতে রোববার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ইলিয়াস মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি শেখ মো. মকন মিয়ার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট আশিক উদ্দিন, শাহজামাল নুরুল হুদা, নাজিম উদ্দিন লস্কর, জসিম উদ্দিন, অধ্যাপক সামিয়া চৌধুরী, মতিউল বারী চৌধুরী, সিটি কাউন্সিলর দিনার খান হাসু, আবদুর রকিব তুহিন, সালেহা কবির শেপী প্রমুখ।

 

 

Share





Related News

Comments are Closed