রাজনীতির দানব কেড়ে নিচ্ছে দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ
খলিলুর রহমান : আধুনিক ও উন্নত মালয়েশিয়ার রূপকার সে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহাতির মোহাম্মদ কিছুদিন আগে বলেছিলেন “বাংলাদেশে রাজনীতি বেশী”। তার কথা একেবারে সত্য, পৃথিবির কোন দেশে এ ধরনের রাজনীতি নেই। আমাদের দেশে ঘরে বাইরে, এমনকি রান্না ঘরের উনুনেও রাজনীতি। একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের মধ্যেও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা। এমনকি একই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও রাজনৈতিক প্রভাব বলয় নিয়ে কোন্দল, হানাহানি ও ভিন্নতা প্রকট। কৃষক না হয়েও কৃষক সংগঠনের সভাপতি, শ্রমিক না হয়েও শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা, ছাত্র না হয়েও ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতা। দেশের রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো যেন একেকটি স্কুল কলেজ ও ভার্সিটি। রাজনীতির এ নিকেতনে ভর্তি হয়ে গেলে প্রচলিত স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা ও ভার্সিটিতে আর পড়তে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের সিংহভাগ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী মূলত রাজনীতির সংজ্ঞাই জানেন না। তারা মনে করেন রাস্তায় মিছিল-মিটিং, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ভাংচুর, হরতাল বিক্ষোভ ও নাশকতাসহ শক্তি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি, ধোকা-প্রতারনা, বেঈমানী, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই রাহাজানী ও কোন্দল-গ্রপিং-এর নামই রাজনীতি। এটা যে যত বেশী শিখে নিতে পারে বা করতে পারে সে বড় রাজনীতিবিদ। মোট কথা ক্ষমতা দখল ও প্রভাব-বলয় বিস্তারের সব কর্মকান্ড ও কর্মসুচীর নাম রাজনীতি এবং এটাই আমাদের দেশের রাজনীতির সংজ্ঞা, পরিভাষা ও পরিধি। মূলত এসব কর্মকান্ডের নাম আদৌ রাজনীতি নয়, বা এগুলো রাজনীতির সংজ্ঞাও নয়। বেশ থেকে বেশ এগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রনোদিত কর্মকান্ড বলা যেতে পারে। যাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ-অকল্যাণ মূখ্য নয়, মূখ্য ও লক্ষ্য একমাত্র ক্ষমতার মসনদ দখল।
প্রত্যেক বিষয়ের যেমন একটা সংজ্ঞা, পরিভাষা বা পরিধি আছে, ঠিক তেমনি রাজনীতিরও একটা নির্ধারিত সংজ্ঞা, পরিভাষা ও পরিধি আছে, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়–য়ারা ভালই জানেন। বাংলা ভাষায় রাজনীতি, ইংরেজীতে বলা হয় পলিটিক্স, যা আরবী, হিন্দি উর্দু ও ফারসী ভাষায় বলা হয় সিয়াসত।
আমি রাস্ট্রবিজ্ঞান বা পলিটিক্যাল সাইন্সের কোন ছাত্র নই। এ বিষয়ে তেমন অধ্যয়নও আমার নেই। তবে আমাদের দেশের কওমী মাদ্রাসার সিলেবাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে উর্দু-আরবি মিশ্রিত একটি ছোট্ট কলেবরের বই বা কিতাব আছে, যেটার নাম “ফতহুল করিম ফী সিয়াসাতিন্ নাবিয়্যিল আমীন”। সেই বই বা কিতাবের প্রনেতা হলেন যুশ্রেষ্ট আলেমে দ্বীন হযরত আলামা মুহাম্মদ মুশাহিদ বায়মপুরী (র.)। সেই পাঠ্য বাইটি একবার দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। বইয়ের প্রনেতা বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত লেখক, মনিষী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের প্রণীত রাজনীতি বিষয়ের বহু মূল্যবান গ্রন্থের উদৃতি দিয়ে তাঁর এই বইয়ে রাজনীতির সংজ্ঞার সংক্ষিপ্ত বর্ননা দিয়েছেন। সব বর্ননা এক এবং অভিন্ন না হলেও এর মূল তথ্যে কোন ভিন্নতা নেই। তার বর্ননামতে রাজনীতি মানে ‘রাজার নীতি’। অর্থাৎ রাজা ও প্রজা এবং শাসক ও শাসিতদের মধ্যকার সু-সম্পর্কের-যে নীতিমালা আছে, মূলত সেই নীতিমালার নামই রাজনীতি। মোট কথা রাজনীতি এমন বিষয়ের নাম যে বিষয় একটি দেশের বা ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রক, শাসক এবং শাসিতদের মধ্যে সু-সম্পর্ক সৃষ্টি করে থাকে বা বজায় রাখতে পারে। সার্বিক কল্যাণ বয়ে আনেত পারে রাজা-প্রজা, শাসক ও শাসিত জনগোষ্টির। রাস্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতার সমনদ (সিংহাসন) দখল ও আরোহন জনিত কার্যকলাপ ও কর্মসূচীর নাম আদৌ রাজনীতি নয়। এগুলো রাজনীতি ও ক্ষমতা দখলের উপায় উপাদান এবং মাল-মসলা মাত্র। তাই আমাদের সকলকে রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার আগে ভাল করে রাজনীতির সংজ্ঞা পরিভাষা ও পরিধি জেনে নিতে হবে। জেনে বুঝে রাজনীতি করলে রাজনীতি দেশ ও জনগনের কল্যাণ বয়ে আনবে। অন্যথায় প্রচলিত রাজনীতি নামের দানব কেড়ে নিচ্ছে আমাদের দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণ।
Related News
জনস্বাস্থ্যে ডেঙ্গু্র প্রভাব: সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা
মো. আকিকুর রেজা: প্রতি বছর বর্ষাকাল আসলেই জনমনে ভর করে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। তবে ডেঙ্গু এখনRead More
নীরবতার এক অদৃশ্য আয়না
হক মোঃ ইমদাদুল, জাপান: বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, যার সবকিছু কোনো বইয়েRead More



Comments are Closed