Main Menu

ঘুষ: ঢুকে না শুধু পকেটে, ক্ষয় করে রাষ্ট্রকে

আতিকুর রহমান নগরী: সাম্প্রতিককালে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি প্রশ্ন তোলে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা নিয়ে।

ঘুষের ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন নয়। সরকারি দপ্তর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা—বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষের অভিযোগ প্রায়ই সংবাদে আসে। কিন্তু সব ঘুষের প্রভাব এক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব যদি হয় আইন রক্ষা করা, নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া এবং অপরাধ দমন করা, সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অন্য মাত্রা পায়।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তাই শুধু দুজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো ঘটনা। অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তবে অভিযোগ ওঠার পর এর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ এখানে শুধু অর্থ লেনদেনের প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন আছে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, একজন নাগরিককে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে কি না এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে ব্যবহৃত হয়েছে কি না।

ঘুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি টাকার অঙ্কে নয়
ঘুষের ক্ষতি কত টাকা—এই হিসাব করা সহজ। কিন্তু ঘুষের কারণে রাষ্ট্র কতটা আস্থা হারায়, সেই হিসাব করা কঠিন।একজন নাগরিক যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যকে ঘুষ দেন, তখন তিনি শুধু একটি নির্দিষ্ট সেবার জন্য অর্থ দেন না; অনেক সময় তিনি একটি বার্তাও পান—আইনগতভাবে পাওয়ার কথা যে সেবা, সেটিও অর্থ ছাড়া পাওয়া কঠিন।

এই অভিজ্ঞতা একজন নাগরিকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তিনি তাঁর পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিতদের কাছে অভিজ্ঞতার কথা বলেন। এভাবেই একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সামাজিক ধারণায় পরিণত হয়—‘ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না।’ এই ধারণাই দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ভিত্তি।

কারণ যখন মানুষ দুর্নীতিকে অন্যায় হিসেবে না দেখে ‘স্বাভাবিক নিয়ম’ হিসেবে মেনে নিতে শুরু করে, তখন দুর্নীতি আর কেবল ব্যক্তির অপরাধ থাকে না; তা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়।

পুলিশের ঘুষের অভিযোগ কেন বেশি গুরুতর
পুলিশের হাতে রাষ্ট্রের বৈধ ক্ষমতা রয়েছে। একজন পুলিশ সদস্যের একটি সিদ্ধান্ত একজন নাগরিকের চলাফেরা, নিরাপত্তা, আইনি অধিকার এমনকি বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সেই ক্ষমতার সঙ্গে যদি অর্থনৈতিক লেনদেন যুক্ত হয়, তাহলে আইনের সমতার নীতি সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ধরা যাক, একজন নাগরিক তাঁর ন্যায্য অধিকার পেতে অর্থ দিতে বাধ্য হলেন। অন্যদিকে আরেকজন অর্থের বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা পেলেন। তখন আইন আর সবার জন্য সমান থাকে না। অর্থনৈতিক সক্ষমতা হয়ে ওঠে ন্যায়বিচার পাওয়ার অন্যতম অনানুষ্ঠানিক মাপকাঠি।
এমন পরিস্থিতি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর।

ঘুষ আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে
আইনের শাসনের শক্তি শুধু আইনের বইয়ে নয়; মানুষের বিশ্বাসে। নাগরিককে বিশ্বাস করতে হয় যে অন্যায় হলে তিনি আইনের আশ্রয় পাবেন, অপরাধ করলে শাস্তি হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাঁর সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করবে।ঘুষের সংস্কৃতি এই বিশ্বাসে ফাটল ধরায়।

বিশেষ করে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের ধারণা যদি হয়—অর্থ না দিলে হয়রানি, আর অর্থ দিলে সুবিধা—তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত গভীর।

অপরাধের শিকার কেউ অভিযোগ করতে অনাগ্রহী হতে পারেন। সাক্ষী সহযোগিতা করতে ভয় পেতে পারেন। সাধারণ মানুষ পুলিশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এড়িয়ে যেতে পারেন। আর অপরাধীরা ধরে নিতে পারেন, অর্থ বা প্রভাবের মাধ্যমে ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা সম্ভব।
এভাবে ঘুষ একসময় অপরাধ দমনের ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

ঘুষের প্রভাব সমাজে:
ঘুষের ক্ষেত্রে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—দোষী কে? যিনি টাকা নিলেন, নাকি যিনি দিলেন? আইনগত দায় নির্ধারণের বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট আইনের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি আরও বিস্তৃত।

ঘুষের লেনদেনের প্রকৃত ক্ষতি বহন করেন সেইসব নাগরিক, যারা ঘুষ না দিয়েও ন্যায্য সেবা পাওয়ার আশা করেন। তারা হয়তো সময় হারান, হয়রানির শিকার হন কিংবা কোনো সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

অর্থাৎ ঘুষ একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে—যেখানে যোগ্যতা বা অধিকার নয়, অর্থ ও প্রভাব অনেক সময় সিদ্ধান্তের অনানুষ্ঠানিক নিয়ামক হয়ে ওঠে।

আস্থার সংকট:
রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকে।

থানায় গিয়ে একজন নাগরিক কেমন আচরণ পেলেন, অভিযোগ করতে গিয়ে তাঁকে কী ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হলো, আইনের প্রয়োগে তিনি সমতা দেখলেন কি না—এসব অভিজ্ঞতার ওপর রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর ধারণা গড়ে ওঠে।
তাই ঘুষের একটি ঘটনাকেও হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।

একটি ঘটনা যদি যথাযথ তদন্ত ছাড়া চাপা পড়ে যায়, তাহলে তার চেয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে। কারণ তখন মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হতে পারে যে ক্ষমতাবান বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের জন্য আলাদা নিয়ম আছে।
আইনের শাসনের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক ধারণা খুব কমই আছে।

শাস্তি ও জবাবদিহিতা:
ঘুষের অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা যায় না। অভিযোগের তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষভাবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।এই ভারসাম্যই আইনের শাসন।

তবে শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। ঘুষ নেওয়ার সুযোগ কোথায় তৈরি হচ্ছে, কেন তৈরি হচ্ছে, তদারকি কোথায় দুর্বল, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।কারণ একজনকে শাস্তি দিয়ে আরেকজনের জন্য একই সুযোগ রেখে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

‘এভাবেই চলে’—এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বাধা শুধু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি নন; বরং দুর্নীতিকে মেনে নেওয়ার সামাজিক মানসিকতা।
‘কিছু টাকা দিলে কাজটা দ্রুত হবে’, ‘এটা না দিলে ফাইল নড়বে না’, ‘পুলিশকে কিছু না দিলে ঝামেলা হবে’—এই ধরনের ধারণা যতদিন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক থাকবে, ততদিন ঘুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
ঘুষকে ‘চলতি নিয়ম’ হিসেবে মেনে নেওয়া মানে দুর্নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করা।

রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নাগরিককে এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে বৈধ সেবা পেতে কাউকে অবৈধ অর্থ দিতে হবে না। একই সঙ্গে নাগরিকেরও দায়িত্ব অন্যায় লেনদেনে অংশ না নেওয়া এবং ঘুষের দাবি উঠলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোর সুযোগ ব্যবহার করা।
চুনারুঘাটের ঘটনাটি হোক জবাবদিহির পরীক্ষা

চুনারুঘাটে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে। কিন্তু ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে একটি সুযোগও তৈরি করেছে—প্রমাণ করা যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কেউই জবাবদিহির বাইরে নন।
অভিযোগটি সত্য হলে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।কারণ দুটো ক্ষেত্রেই লাভবান হবে প্রতিষ্ঠান।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ঘুষের টাকা একটি ব্যক্তির পকেটে যায়; কিন্তু তার মূল্য পরিশোধ করে সমাজ। হারায় সময়, বাড়ে বৈষম্য, দুর্বল হয় আইনের শাসন এবং ক্ষয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।

একটি রাষ্ট্রের পুলিশ যদি নাগরিকের কাছে নিরাপত্তার প্রতীক না হয়ে ঘুষ ও হয়রানির প্রতীকে পরিণত হয়, তবে সমস্যাটি কেবল পুলিশের নয়—সমস্যাটি রাষ্ট্রের।

তাই ঘুষের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিকের অধিকার কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দয়া নয় এবং আইন প্রয়োগ কোনো ব্যক্তিগত দর-কষাকষির বিষয় নয়।
আইন যদি বিক্রয়যোগ্য হয়ে যায়, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা তখন আর অটুট থাকে না। আর আস্থা ভেঙে গেলে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘদিন শক্তিশালী থাকতে পারে না।

Share





Related News

Comments are Closed