Main Menu

স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: দ্রুত উত্তরই কি যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য?

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন: একজন মানুষ অসুস্থ বোধ করছেন। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে তিনি মোবাইল ফোনে নিজের উপসর্গ লিখে জানতে চাইলেন, কী কারণে এমন হতে পারে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তিনি একটি উত্তর পেলেন। উত্তরটি পরিষ্কার, গোছানো এবং আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—উত্তরটি কি তাঁর পরিস্থিতির জন্য সঠিক?

স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে ভাবতে গেলে আমার কাছে এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রযুক্তি এখন শুধু তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করছে না; মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিন্তা করা, সম্ভাব্য রোগ নিয়ে ধারণা নেওয়া এবং চিকিৎসার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি করার পদ্ধতিও বদলে দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং প্রয়োজন হলো এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝা। কারণ স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত উত্তর পাওয়া অবশ্যই সুবিধাজনক, কিন্তু ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকিও উপেক্ষা করা যায় না।

তথ্যের সহজলভ্যতা বেড়েছে, কিন্তু নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন রয়ে গেছে

একসময় স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য জানতে মানুষকে বই, চিকিৎসক বা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন সার্চ ইঞ্জিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মুহূর্তেই অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

এটি মানুষের জন্য একটি বড় সুযোগ। কেউ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে নিজের প্রশ্নগুলো গুছিয়ে নিতে পারেন। কোনো রোগ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা পেতে পারেন। চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা বুঝতে অসুবিধা হলে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা খুঁজতে পারেন।

কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় না। একই উপসর্গের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কোনো রোগ সম্পর্কে সাধারণ তথ্য একজন মানুষের বয়স, শারীরিক অবস্থা, পূর্ববর্তী চিকিৎসা কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি নাও মিলতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু ভাষার সাবলীলতা আর তথ্যের যথার্থতা এক বিষয় নয়।

স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু তথ্য পাওয়া নয়; কোন তথ্যের ওপর আস্থা রাখা যায়, সেটি বুঝতে পারা।

এআইয়ের কাজ কি চিকিৎসকের বিকল্প হওয়া?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার চেয়ে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখা বেশি কার্যকর। এটি তথ্য সংগঠিত করতে, জটিল বিষয় সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে, প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে এবং স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শুধু কয়েকটি উপসর্গ বা পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না। রোগীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা, প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট, চিকিৎসকের পেশাগত বিচার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আরও মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

তাই কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্ভাব্য তথ্য দিতে পারলেও সেটিকে ব্যক্তিগত চিকিৎসা-সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে অনলাইনে উত্তর খুঁজতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে। গুরুতর বা দ্রুত অবনতিশীল উপসর্গ দেখা দিলে ডিজিটাল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

আমার দৃষ্টিতে, এআইয়ের সাফল্য চিকিৎসকের ভূমিকা কমিয়ে দেওয়ার মধ্যে নয়; বরং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করার মধ্যে।

হাসপাতালের ডিজিটাল কৌশলে দায়িত্বশীলতার জায়গা কোথায়?

একটি হাসপাতালের ডিজিটাল উপস্থিতি এখন শুধু ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ এসব মাধ্যম থেকে স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য পান, চিকিৎসকের পরিচয় সম্পর্কে জানেন এবং সেবা নেওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ খুঁজে দেখেন।

ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারীও এই প্রক্রিয়ায় আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারে। রোগীর সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করা কিংবা হাসপাতালের বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ব্যবহারিক সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে হাসপাতালের ক্ষেত্রে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন—ডিজিটাল সহকারী কী করতে পারে এবং কোন পর্যায়ে মানুষের সহায়তা প্রয়োজন, তা যেন রোগী বুঝতে পারেন।

সাধারণ প্রশাসনিক তথ্য দেওয়া এবং রোগীর ব্যক্তিগত উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া এক বিষয় নয়। এই দুইয়ের মধ্যে সীমারেখা অস্পষ্ট হলে রোগী প্রযুক্তির সক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারেন।

তাই হাসপাতালের ডিজিটাল ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত কর্মীর কাছে যাওয়ার সুযোগ এবং দায়িত্বশীল তথ্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

প্রযুক্তি যত বুদ্ধিমান হবে, তার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকাও তত জরুরি হবে।

রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা উপেক্ষা করা যাবে না

স্বাস্থ্যতথ্য অত্যন্ত ব্যক্তিগত। একজন মানুষ তাঁর রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার ফল, ওষুধের তালিকা কিংবা শারীরিক সমস্যার কথা কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থায় জানালে সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোকে তথ্যের গোপনীয়তা, প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা এবং তথ্য ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিয়ে আরও সচেতন হতে হবে।

শুধু নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করাই ডিজিটাল রূপান্তর নয়। সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে রোগীর তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, ভুল তথ্য কীভাবে শনাক্ত করা হবে এবং কোনো সমস্যা হলে দায়িত্ব কার—এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে।

একটি হাসপাতালের ডিজিটাল উদ্যোগের সাফল্য তাই শুধু কত দ্রুত উত্তর দেওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। রোগী কতটা নিরাপদে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে সেবাটি ব্যবহার করতে পারছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা ভাষায় নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্যের গুরুত্ব

বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—ভাষা।

অনেক মানুষ স্বাস্থ্যবিষয়ক জটিল পরিভাষা বুঝতে অসুবিধা অনুভব করেন। কেউ ইংরেজিতে পাওয়া তথ্য সহজে বুঝতে পারেন না, আবার কেউ অনলাইনে পাওয়া তথ্যের চিকিৎসাবিষয়ক অর্থ যাচাই করতে পারেন না।

এআইয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যতথ্য সহজ বাংলায় উপস্থাপন করা গেলে মানুষের বোঝার সুযোগ বাড়তে পারে। চিকিৎসকের নির্দেশনা সম্পর্কে সাধারণ ধারণা পাওয়া কিংবা কোনো স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয় সহজভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু সহজ ভাষায় উপস্থাপন করতে গিয়ে তথ্যের অর্থ বদলে গেলে সেই সুবিধাই ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যতথ্য তৈরির ক্ষেত্রেও চিকিৎসাবিষয়ক যথার্থতা, ভাষার স্পষ্টতা এবং বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে হাসপাতালের যোগাযোগ ও ডিজিটাল দলের দায়িত্বও রয়েছে। মানুষের প্রশ্ন কী, কোন বিষয়গুলো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে এবং কোন তথ্য সহজ ভাষায় দেওয়া প্রয়োজন—এসব বুঝে কার্যকর কনটেন্ট তৈরি করতে হবে।

স্বাস্থ্যতথ্য সহজ হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সেই সরলীকরণ যেন কখনো তথ্যের যথার্থতাকে দুর্বল না করে।

ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে আস্থার জায়গায়

আগামী দিনে আরও অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। তথ্য পাওয়া আরও দ্রুত হবে, ডিজিটাল যোগাযোগ আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে এবং নিয়মিত অনেক কাজ প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

তখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করার বিষয়টি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট পার্থক্য তৈরি নাও করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে প্রযুক্তিটি কতটা নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল এবং রোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি হাসপাতাল যদি ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য দেয়, কিন্তু সেই তথ্য রোগীর জন্য বিভ্রান্তিকর হয়, তাহলে প্রযুক্তির সুবিধা প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। অন্যদিকে, সঠিক তথ্য, পরিষ্কার নির্দেশনা এবং প্রয়োজনের সময়ে মানবিক সহায়তার সমন্বয় রোগীর অভিজ্ঞতাকে আরও কার্যকর করতে পারে।

এখানেই ব্র্যান্ডের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি হাসপাতাল প্রযুক্তিতে কতটা আধুনিক, সেটি তার পরিচয়ের একটি অংশ। কিন্তু প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগী কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য ও সহায়তা পাচ্ছেন, সেটিও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

আমার বিশ্বাস, স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল নেতৃত্বের দায়িত্ব শুধু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা নয়; প্রযুক্তি মানুষের জন্য কী মূল্য তৈরি করছে, তা বোঝা এবং তার ব্যবহারকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা।

শেষ কথা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যসেবায় তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে, যোগাযোগ সহজ করতে পারে এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কিছু কাজে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—মানুষ যে তথ্য পাচ্ছেন, তা কি নির্ভরযোগ্য এবং তাঁর প্রয়োজনের জন্য উপযুক্ত?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু প্রযুক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার, তথ্যের যথার্থতা যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যথাযথ ভূমিকা।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির মূল্য শুধু তার গতি বা সক্ষমতায় নয়। এর মূল্য নির্ভর করে মানুষের জন্য কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও অর্থবহ সহায়তা তৈরি করতে পারছে তার ওপর।

এআই হয়তো কয়েক সেকেন্ডে উত্তর দিতে পারবে। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার আসল সাফল্য নির্ভর করবে সেই উত্তর কতটা নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল এবং মানুষের উপকারে আসছে তার ওপর।

কারণ স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু আরও বুদ্ধিমান প্রযুক্তি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই প্রযুক্তিকে মানুষের আস্থা ও কল্যাণের উপযোগী করে তোলাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

লেখক: হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।

Share





Related News

Comments are Closed