সুনামগঞ্জের নৌপথে থেমে নেই চাঁদাবাজি
তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, জামালগঞ্জ (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা-তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও মধ্যনগর নদী পথে দিন দুপুরে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি থামছে না। অথচ পুলিশ বলছে এই নৌপথে চাঁদাবাজি হয় না। নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবীতে ২ ঘন্টা কর্মবিরতী পালন করেছেন নৌশ্রমিকরা। চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে গত ১ নভেম্বর সিলেটের ডিআইজি বরাবরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন, সুনামগঞ্জ মালবাহী নৌ পরিবহন শ্রমিক সমবায় সমিতি লি: এর সভাপতি সফিজুল ইসলাম ও সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ আলী।
তাদের লিখিত আবেদন থেকে জানা যায়, নারায়নগঞ্জের বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন, বাংলাদেশ জাহাজী শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ ভাল্কহেড শ্রমিক ফেডারেশন, ঢাকার সদরঘাট এলাকার বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার এসোসিয়েশন নামীয় সংগঠন থেকে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, মধ্যনগর, ধর্মপাশা এলাকার নৌপথে আরকাটি’র অযুহাতে অনুমোদন দিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজ তৈরী করা হচ্ছে। ঐ নদী পথে পরিতোষ বর্মন, করিম মেম্বার, আবুল বাশার, শুক্কুর আলী, আইনাল হক, কামরুল-সবুজ’র,
নারায়নগঞ্জের বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় সংগঠন থেকে সুলেমান ও কিবরিয়া নামে অনুমোদন নিয়ে তাদের সংগঠনের শাখা করে সংগঠনের দোহাই দিয়ে অবৈধভাবে নদী পথে মালবাহি ভাল্কহেড, ষ্টীলবডি নৌকা, কার্গো থেকে বেপরোয়া ভাবে চাঁদা আদায় করছে। এ ছাড়া দূর্লভপুর, রাঙ্গারচর, ফাজিলপুর, মিয়ারচর, টেকেরঘাট, শ্রীপুর, বোয়ালমারা, সুলেমানপুর, ফতেহপুর নদীতে চাঁদাবাজী করছে বেপরোয়া ভাবে। চাঁদাবাজ চক্রটি বছরে প্রায় কয়েক কোটি টাকা চাঁদা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এ নৌপথে যারা চাঁদাবাজি করে তারা খুবই ভয়ঙ্কর, অপ্রতিরোদ্ধ। চাঁদাবাজদের সাথে পুলিশ, কতিপয় সংবাদকর্মী, সরকার দলের কতিপয় পাতিনেতাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে।
চাঁদাবাজদের নিষ্ঠুরতা আর মারমুখী হুমকীতে নৌকার মাঝি-চালকরা আতংকিত অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীপথে চলাচল করছেন। এমন তথ্যই জানালেন ভুক্তভোগী মাঝি, চালক ও নৌযানের মালিকরা।
তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া, টেকেরঘাট, ছাড়াগাঁও শুক্ল ষ্টেশন থেকে কয়লা, ফাজিলপুর থেকে বালু ও নুরী পাথর ক্রয় করে সারা দেশে যোগান দেয় ব্যবসায়ীরা। এসব আমদানিকৃত পণ্য বহনের একমাত্র মাধ্যম জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও ধর্মপাশার নদীপথ। ওই নদীপথে ষ্টীলবডি নৌকা, কার্গো, সাধারণ নৌকা গুলো চলাচলের সময় জন মানবহীন ৮-৯টি স্থানে ইঞ্জিন চালিত ছোট নৌকা দিয়ে চাঁদা আদায় করে চলছে সংঘবদ্ধ ওই চাঁদাবাজ চক্রটি। প্রতিদিন প্রায় শতাধিক নৌকা ও শতাধিক কার্গো থেকে ১ থেকে দেড় হাজার করে টাকা অদায় করা হয় বলে জানান চালক ও মাঝিরা। ভুক্তভোগীরা আরো জানান, চাঁদাবাজদের কথামতো চাঁদা না দিলে মারপিটসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রান নাশের হুমকি দেয়। এ সব চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর থানায় একাধিক চাঁদাবাজির মামলাও রযেছে। কার্গোর মাস্টার ও সুকানীরা চাঁদা দিতে বিলম্ব কিংবা অপরাগতা প্রকাশ করলেই শুরু হয় তাদের উপর শারীরিক নির্যাতন। এমনকি কার্গো ও বলগেট থেকে তাদের খাবার ও পড়নের কাপড় সহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি জোড় পূর্বক নিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন চালকরা।
শনিবার সরেজমিন নদীপথের বিশ্বম্ভরপুরের ফতেহপুর নদীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায় শতাধিক মালবাহি নোঙ্গর করা ষ্টিলবডি নৌকা চাঁদাবাজি বন্ধের দাবীতে কর্মবিরতী পালন করছেন। চালকদের সাথে কথা হলে এ প্রতিবেদককে কাছে পেয়ে কান্না বিজড়িত কন্ঠে তারা বলেন, সাংবাদিক ভাই “পেট বাঁচাতে আমরা অনেকেই পিঠ পেতে দেই”। অনেক সময় টাকা দিয়েও আমাদের জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও পেটের টানে আর বাচ্চা-কাচ্চার খাওন যোগাতে এই পথে আসতে হয়। পরিবহন মাষ্টার সজল মিয়া, আঃ সালাম, জাহাঙ্গীর, ইশরাফিল, বিল্লাল মিয়া বলেন, এখন চাঁদাবাজদের মারপিঠ থেকে বাঁচতে পুলিশ কে প্রতি নৌকা থেকে দেড় হাজার করে টাকা তোলে দিচ্ছেন তারা। চাঁদাবাজদের মারপিঠ থেকে বাঁচতেই আমরা বিকল্প হিসেবে পুলিশকে টাকা দিচ্ছি, এ ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক’জন পরিবহন চালক জানান, ফতেপুরের নদীতে, জামালগঞ্জে গজারিয়া ও মিলনপুর নদী এলাকায় শ্রীমন্তপুর, শানবাড়ি, আহছানপুর, সুন্দর পুর, বেহেলী নদীতে শুক্কুর আলী, আয়নাল, হিরু, বাবুল, বাশার, সাইদুল, কামরুল, সামায়ন ও আলী রেজা গংদের লোকজন চাঁদাবাজি করে। সাচনা বাজার ইউনিয়নের দুর্লভপুরের সুরমা-রক্তি নদীতে এনামুল গংরা চাঁদা তুলছে।
সুনামগঞ্জ মালবাহী নৌ পরিবহন শ্রমিক সমবায় সমিতি লি: এর সভাপতি সফিজুল ইসলাম ও সাধারন সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, নৌকার মাঝিরা জানিয়েছেন, পুলিশ পাহারায় নৌ শ্রমিকদের জামালগঞ্জ নদীপথ পাড়ি দিতে পুলিশ কে প্রতি নৌকা থেকে দেড়হাজার করে টাকা দিতে হচ্ছে। অথচ পুলিশ বলছে তারা নাকি টাকা নেয়নি। সমিতির সভাপতি সফিজুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় চাঁদাবাজ তৈরী করেছে নারায়নগঞ্জের কিছু নৌযান নামীয় শ্রমিক সংগঠন। এগুলো বাতিল করার আহবান জানান প্রশাসনের উর্দ্ভতন কতৃপক্ষের কাছে।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা মুক্তিযোদ্ধ ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার ইউসুফ আল-আজাদ বলেন, নদীতে আরকাটির অজুহাতে দুর্লভপুর হয়ে গজারিয়া ও শ্রীমন্তপুরসহ নৌপথে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হয়। বার-বার প্রশাসন ও পুলিশ কে জানানো হয়েছে কোন উপায় হয়নি। রক্ষকরা যদি ভক্ষক হয় তা হলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে আমাদের এলাকায়।
জামালগঞ্জ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) মো: আতিকুর রহমান বলেন, জামালগঞ্জ এরিয়ায় কোন চাঁদাবাজি হয়না, আমার থানা এলাকায় নদী পথে পুলিশ টহল আছে, আমাদেরকে নৌশ্রমিকরা কোন চাঁদা দেয়না।
Related News
সুনামগঞ্জে ২টি বালুমহাল থেকে সব ধরনের বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল থেকে সব ধরনের বালুRead More
সুনামগঞ্জে বৃদ্ধা ও যুবকের মরদেহ উদ্ধার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ডোবা থেকে এক বৃদ্ধা এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলা থেকে একRead More



Comments are Closed