সু-শিক্ষিত জাতিগঠনে শিক্ষার সকল বাধা দূর করতে হবে
এ এইচ এম ফিরোজ আলী: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৫ বছরেও শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। আমাদের দেশে শিক্ষা এখনও সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষার বিস্তারে সরকার নানা মুখী কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র, জাতীসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরিত দেশ হিসেবেও শিক্ষা বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার বলে উলেখ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার গণ্যকরে সংবিধান সংযোজন করা উচিৎ। কারন সু-শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত সু-শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। জাতি শিক্ষিত না হলে উন্নত জাতি গঠন করা কল্পনা মাত্র। ২০০৬ সালে ভারত, ২০০৩ সালে শ্রীলংকা ও ২০১৩ সালে নেপাল শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার আইনগত অধিকার না থাকায় সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার অর্জনে ব্যক্তি বিশেষ বা রাষ্ট্রের করুণার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় বুনিয়াদি শিক্ষা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের দেশে শিক্ষা মৌলিক অধিকার স্বীকৃত না থাকায় শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ আশানুরূপ হয় না। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে আঠারোটি মৌলিক অধিকারের কথা সুষ্পষ্টভাবে বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ২৭-৪৪ পর্যন্ত)। কিন্তু কোথাও শিক্ষার কথা বলা হয়নি। ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (ক), নেপালের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৭ এবং মালদ্বীপের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬ এ শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অবশ্য শিক্ষা আইন ২০১৬ এর খচড়ায় শিক্ষা শিশুর অধিকার হিসেবে উলেখ করা হয়েছে। তবে এখনও এ আইন চূড়ান্ত হয়নি।
শিক্ষা অধিকার বা সুযোগ যে, নামেই থাকুক না কেন বর্তমান সরকার শিক্ষার উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। প্রতিবছর পাহাড় সমান অসুবিধা উপেক্ষা করে পহেলা জানুয়ারী বিনা মূল্যে কোটি বই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া ইতিহাসে বিরল। জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে শিক্ষার গুরুত্ব দিয়ে ছিলেন, তেমনি তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা জাতিকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারুপ করেছেন। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসালাম নাহিদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে দেশের শিক্ষার উন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা করছেন। কিন্তু তার পরও মন্ত্রী বা সরকারের অগোচরে থাকা কিছু কিছু কার্যক্রম শিক্ষার সামগ্রীক উন্নয়নে চরম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বাঁধা দূর করা না হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় ঘটবে। আমি সংক্ষেপে কিছু বাঁধার কথা এখানে তুলে ধরতে চাই।
ক্লাস চার মাস, কোচিং হয় ১২ মাস
প্রাইভেট পড়া বা কোচিং ব্যবসা এখন একটি সামাজিক ব্যাধি। এ ব্যাধি জাতির হৃদয় তিলে তিলে ক্ষত করছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন শিক্ষা প্রতিষ্টানে সীমাবদ্ধ আছে নাকি প্রাইভেট, বা কোচিং সেন্টারে চলে গেছে – এ বিষয়টি নিয়ে সরকার সহ সকল মহলের চিন্তা ভাবনা করা বা মনোযোগী হওয়ার উপযুক্ত সময় এসে গেছে। বলতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে যাচ্ছে। বিষয়টি সবার চোখের সামনে ঘটলেও কেউ কোন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ঢাকা, সিলেট সহ দেশের বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা শহর এমনকি গ্রামে গঞ্জের হাট বাজারে দালানের দেয়ালে রাজনৈতিক নেতাদের সাইন বোর্ডের মত প্রাইভেট কোচিং সেন্টারের সাইন বোর্ড ঝুলছে। যে দিকে তাকাবেন দেখবেন, অমুক স্যার অংক করান, তমুক স্যার যতœ সহকারে ইংরেজী পড়ান, বিখ্যাত, বিজ্ঞ, অমুক স্যার এ প্লাসের শতভাগ গ্যারান্টি সহকারে পড়ান। আসন সীমিত বৎসরের শুরু থেকে চলবে, পরে কোন সুযোগ নেই ইত্যাদি। কেউ কেউ ঠিকানা না দিয়ে শুধু মোবাইল নম্বর সাইন বোর্ডে দিয়ে দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা এনবিআরের কর্মকর্তারা হয়তো তা দেখেন না। এসব বিজ্ঞাপনের জন্য কারও কোন অনুমতি আছে কিনা জানিনা। এনবিআর চাইলে এসব কোচিং সেন্টার থেকে ভাল রাজস্ব আদায় করতে পারতেন। ভ্রাম্যমান আদালত নজর দিলে সরকারের কোষাগারে অর্থের সংকট হতো না। কোচিং ব্যবস্থার পরিধি কলেজ গুলোতে বেশি স¤প্রসারিত হয়েছে। কলেজে পা রাখা মাত্রই শিক্ষার্থীরা লাইন ধরে স্যারের বাসা কিংবা কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য হয়। এটিই হচ্ছে এখন একমাত্র মহৌষধ বা শিক্ষার চিকিৎসা। বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ক্লাস হয় প্রায় চারমাস আর কোচিং করতে হয় ১২ মাস। বলতে গেলে শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকরা ক্লাস করে থাকেন। একজন শিক্ষার্থী দিনে প্রতিষ্ঠানের ক্লাস শেষে প্রায় ২/৩ টি বিষয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। শহরের একজন শিক্ষার্থীর সাথে পালা বদল করে অভিভাবকরা কোচিং সেন্টারের বাইরে লাইন ধরে মাটিতে বা ঘাসে বসে থাকতে হয়। কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট পড়ানো শিক্ষকের বাসার আশ-পাশের রাস্তায় উঠতি বয়সি বখাটে বা ছিনতাইকারীরা বসে থাকে। তারা সুযোগ বুঝে শিক্ষার্থীও অভিভাবকদের নগদ টাকা সোনা-গয়না ছিনিয়ে নেয়। পুলিশি ঝামেলায় অনেকে তা প্রকাশও করেন না। শিক্ষকদের একটি বড় অংশ শিক্ষাকে বানিজ্যিক করণ করেছেন। যারা এসব পছন্দ করেন না তারা মূলত শিক্ষক সমাজে কোনঠাসা হয়ে আছেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাও আদর্শবান শিক্ষকদের পছন্দ করে না। পরীক্ষায় পাস শিক্ষক সন্তুষ্টির বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আদর্র্শবান কোন শিক্ষক যদি বেশি ব্যাখ্যা করে কোন বিষয় বুঝান তা হলে শিক্ষার্থীরা অধৈর্য হয়ে উঠে এবং উক্ত শিক্ষক তাদের বিরাগ ভাজন হন। যে শিক্ষক যত বেশি নোট দিতে পারেন ,যে প্রশ্ন গুলো পরীক্ষায় আসার সম্ভাবনা সেগুলো গাইড বইয়ে দাগ দিয়ে কিংবা পরিক্ষার হলে প্রশ্নে দাগ দিয়ে দিতে পারেন তিনি তত শিক্ষার্থীদের নিকট প্রসংশিত হন।
সরকার প্রদত্ত বইয়ে বাঁধা
সরাকার প্রদত্ত বিনামূল্যে বিতরণকৃত কিছু কিছু বই শিশু শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। কেউ কেউ এ কথাটির সাথে দ্বিমত পোষন করতে পারেন। কিন্তু একটি বিষয়ে আলোচনা করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। সরকার কর্তৃক ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে নবম-দশম শ্রেণী পর্যন্ত যে ইংরেজি গ্রামার বই সরবরাহ করা হয়। সেসব বইয়ে একটি বাংলা শব্দ ও নেই। বর্ণ বা অক্ষর, শব্দ, বাক্য, ভাষা, ব্যাকরণ, পদ, বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয়, ক্রিয়া, লিংঙ্গ, বচন, কাল বা সময় ইত্যাদি বিষয় গুলো ইংরেজিতে সংজ্ঞা ব্যাখ্যা ও উদাহরণ দেয়া রয়েছে। কোন রকম ৫ম শ্রেণি পাস করা শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে গ্রামার পড়া তাদের পক্ষে অনেক কঠিন। ইংরেজীতে লেখা এ সব বই শিক্ষকরা পড়ান না এবং শিক্ষার্থীরাও অন্য গ্রামার পড়ে থাকে। ফলে জে এস সি ও এস এস সি পরিক্ষায় অনেক শিক্ষার্র্থী ইংরেজিতে ভাল ফলাফল করে না। গণিতে বহু নির্বাচনী পরিক্ষায় যে সব প্রশ্ন থাকে, তা খাতায় খচড়া করার কোন সুযোগ নেই। অথচ এক নম্বরের অংকটি খচড়া না করলে শিক্ষার্থীরা সঠিক উত্তর খোঁজে পায় না। ফলে পরিক্ষায় পাস করার আসায়, শিক্ষার্থীরা গাইড বই থেকে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন মুখস্ত করে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে গাইড বইয়ের দিকে ঝোঁকে পড়ছে।
ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি গঠনে দূর্বল আইন
শিক্ষার উন্নয়নে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে প্রতিষ্টানের পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডি। দেশের শিক্ষা বোর্ডের প্রজ্ঞাপন বা প্রবিধান মতে প্রতিষ্টানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানের শৃংখলা মূলক যতেষ্ট ক্ষমতা কমিটির হাতে দেয়া আছে। শিক্ষিত, দক্ষ, অভিজ্ঞ সৎ ব্যক্তিরা/ব্যক্তিবর্গ কোন প্রতিষ্ঠানের কমিটিতে থাকলে স্বল্প সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উন্নয়নের গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে। যদি এমন না হয় তা হলে ম্যানিজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি সামাগ্রিক উন্নয়নে বাঁধা হয়ে দাড়াঁয়। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রবিধান মতে, কোন ব্যক্তি বা বাক্তিবর্গ নগদে বা চেকের মাধ্যমে দশ লক্ষ টাকা কিংবা সমমূল্যের স্থাবর সম্পত্তি প্রতিষ্ঠানে দান পূর্বক কোন প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত করলে তিনি প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য হবেন। প্রবিধানের ২এর (চ) মোতাবেক সিলেট মহানগর এলাকায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠনের ১৮০ দিন পূর্বে দেড় লক্ষ টাকা এবং মহানগরের বাইরে বিশ হাজার টাকা প্রতিষ্ঠানে দান করলে যে কেউ সাময়িক দাতা এবং মহানগর এলাকায় এক কালীন ছয় লাখ টাকা এবং মহানগরের বাইরে ২লাখ টাকা দান করলে আজীবন দাতা সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু ম্যানেজিং কমিঠি বা গভর্নিং বডি গঠনের সময়ে এ সমস্ত ডকুমেন্ট বা প্রমানাদি জমা দেয়ার আইনগত বাধ্য বাধকতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সাথে আতাঁত করে শুধু মাত্র ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করলেই ভূয়া ব্যক্তিরা দাতা বা প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার সুযোগ পান। অনুরূপভাবে সভাপতি, অভিভাবক সদস্য, শিক্ষনুরাগী সদস্যের বিষয়ে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকায় টিপসই কারীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়ে থাকেন। আমার জানামতে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অশিক্ষিত সুবিধা ভোগী, দালাল প্রকৃতির লোক ও সদস্য রয়েছেন। এরা কোন কিছু না জেনে চা-নাস্তা, পান সুপারি বা সামান্য অর্থের বিনিময়ে খাতায় স্বাক্ষর করেন। রেজুলেশন খাতায় কি লেখা আছে কিংবা বিদ্যালয়ের স্বার্থের পরিপন্থি কোন সিদ্ধান্ত কি না তা কেউ দেখেন না। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন চোরাচালানী অপর একটি প্রতিষ্ঠানে একজন টিপসই কারী, মাটি কাঠার শ্রমিকও সভাপতি হতে দেখেছি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার কোন পরিবেশ নেই, প্রাইভেট কোচিং সেন্টারের মত চলছে। সভাপতি, অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগী সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নূন্যতম এস.এস.সি পাস এবং দাতা প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার ক্ষেত্রে নমিনেশন দাখিলের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সহ উপযুক্ত প্রমানপত্র প্রদান করার বিধি বিধান সংযুক্ত করা জরুরী।
প্রশ্ন বেশি সময় কম
বিদ্যমান প্রশ্ন কাঠামোনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরের পাবলিক পরীক্ষায় এমসিকিউ (বহু নির্বাচনী) প্রশ্ন থাকে ৪০ নম্বরের এবং লিখিত সৃজনশীল প্রশ্ন থাকে ৬০ নম্বরের। পরীক্ষার সময়নুযায়ী সৃজনশীল ৬০ নম্বর প্রশ্নের জন্য সময় থাকে ২ ঘন্টা ১০ মিনিট এবং বহু নির্বাচনী প্রশ্নের ৪০ নম্বরের জন্য সময় থাকে ৪০ মিনিট এবং মধ্যখানে বিরতি দেওয়া হয় ১০ মিনিট। গড়ে সৃজনশীল একটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রায় সময় লাগে ২১ মিনিট। ১০ মার্কের ৬টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে সময় লাগে ১৩০ মিনিট + ৪০+১০ মিনিট=১৮০ মিনিট অর্থাৎ ৩ ঘন্টা। কিন্তু ২০১৭ সালে এমসিকিউ ১০ নম্বর কমিয়ে সৃজনশীল প্রশ্ন ৭০ করা হলে সময় লাগবে অতিরিক্ত ১১ মিনিট। ফলে কোনমতেই শিক্ষার্থীরা ৩ ঘন্টা সময়ে ১০০ নম্বরের উত্তর লিখতে পারবে না। আবার সকল বইয়ে সৃজনশীল প্রশ্নে ১০ নাম্বারের প্রশ্নে ৪টি করে প্রশ্ন দেওয়া থাকে। এই ১০ নম্বরের প্রশ্ন উত্তর অনেক শিক্ষার্থী ২১ মিনিটে লিখতে পারে না। সুতরাং এই পদ্ধতিতে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৩ ঘন্টা সময় যথোপযোক্ত নয়। যে কারনে অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর লিখতে শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে ব্যথা হয়ে যায়। এক পরিক্ষার পর পরবর্তী পরিক্ষায় অনেক শিশুর আঙুল ফুলে যায়, অনেক শিক্ষার্থী ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ ও ১০০ নম্বরের উত্তর লিখতে পারে না।
শিশুর কাঁধে বইয়ের বোঝা
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক বোর্ড (এনসিটিভি) এর বাইরে বই পাঠ্য না করার জন্য আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কিন্ডার গার্টেন গুলো সহ বিভিন্ন প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ১০/১২ টিরও বেশি বই পড়ানো হয়। শিশুদের পিঠে বইয়ের ব্যাগ দেখলে মনে হয় তারা যেন সব কিছু নিয়ে এভারেস্ট চূড়ায় আরোহন করার জন্য যাত্রা শুরু করেছে। ২০১২ সালের ২৫ জানুয়ারি ভারতের দিলীর স্কুল ছাত্র বরুণ জৈইন বইর ব্যাগের ভার সইতে না পেরে সিড়িঁতে পড়ে মৃত্যু বরণ করে। এ ঘটনা পুরো বিশ্বকে কাদিঁয়ে তুলে। বইয়ের বোঝা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ে এবং লেখাপড়া বাধা গ্রস্ত হয়।
কমিশন বাণিজ্য
প্রকাশনী সংস্থা, লাইব্রেরী কিংবা নোট বই, গাইড বইয়ের লেখকগণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান গণের সাথে অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য করে থাকেন। বছর শেষে বিভিন্ন প্রকাশনার সংস্থার বাণিজ্যিক বিভাগের কর্মচারিরা স্কুল কলেজে গিয়ে বইপ্রতি কমিশনের দেন দরবার করে নগদ বা বাকিতে যুক্তি করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেশী হলে কমিশন ও বেড়ে যায়, বই প্রতি ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমিশন দেওয়া হয়। এভাবে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে স্কুল কলেজে ১০ থেকে ১৫ টি বই পাঠ্য করা হয়। কোন কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক চুক্তি করেন, আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিঠি গভর্নিং বডি, পদ-পদবি অনুসারে অর্থের ভাগ বাটুরা করা হয়। আর এসব পাপের বোঝা বহন করছে অবুঝ শিশুরা। বছর শেষে শিশুদের হাতে নোটবই – গাউড বইয়ের নাম ও লেখকের নামের তালিকা তুলে দেওয়া হয়। চালাক চতুর শিক্ষকরা মৌখিক ভাবে লাইব্রেরীর নাম বলে দেন। একটি মূল বইয়ের সাথে ভালো ফলাফলের আসায় তিন চারটি করে গাউড বই কিনে শিক্ষার্থীরা। এটাই সত্য এটাই বাস্তবতা। এসব তদারকির জন্য কেউ নেই। আবার গ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ স্কুল কলেজ কমিঠির অনেকেই এধরনের বাণিজ্যের কথা জানেন না।
নীতি নৈতিকতার শিক্ষা নেই
সামগ্রিক উন্নয়নে নীতি নৈতিকতার শিক্ষা গ্ররুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মণীষীদের জীবন পাঠ করলে দেখা যায় তাদের জীবন গড়ার ক্ষেত্রে নৈতিকতা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের দেশে আজকাল নীতি-নৈতিকতা শিক্ষার ব্যাপারটি একবারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নৈতিকতার অবক্ষয় হতে থাকলে সভ্যতা-ভব্যতা কিছুই থাকবে না। পরিবার থেকে এ শিক্ষা শুরু হলেও শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু কিছু শিক্ষা গুরুদের অনৈতিক কর্মকান্ড গণমাধ্যমে দেখে বিচলিত হই। কতিপয় শিক্ষা গুরু রাতারাতি বড়লোক হওয়ার কারণে প্রশ্ন পত্র ফাঁস,ক্লাস ফাঁকি দেওয়া,প্রাইভেট পড়া বা কোচিং পড়ায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে থাকেন। বড়দের সম্মান ছোটদের স্নেহ, সব সময় সত্য কথা বলা, দেশ প্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মতো নৈতিক শিক্ষা দেয়া এখন আর চোখে পড়ে না। অথচ এসব নৈতিক শিক্ষা দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শিক্ষদের উপরেই বর্তায়। শীক্ষাক্ষেত্রে সকল উদ্যেগ, সকল প্রচেষ্টা বিফলে যেতে বসেছে সরকারের আমলা কতিপয় শিক্ষক অসাধু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট অদক্ষ লোক ও সরকারের দূর্বল আইনের কারনে। এজন্য শিক্ষার শরীর ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ক্ষয় রোধ করে একটি শিক্ষিত জাতি গঠনে সকল বিধিবিধানের পরিবর্তন, প্রাইভেট কোচিং ব্যবসা বন্ধ, শিক্ষকদের মন মানসিকতার পরিবর্তন, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তদারকি করণ এবং নীতি নৈতিকতা শিক্ষাদান ই পারে একটি সুশিক্ষিত জাতি গঠন করতে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষা শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। সু-শিক্ষা, সভ্যতা, সততা, নিষ্টা, আদর্শ, নীতি-নৈতিকতা, দেশ প্রেম, জীব প্রেম, মানবতা মহানুবতা সর্বোপরি মনুষত্ব বিকাশের পথ প্রশস্ত করে।
লেখক: কলামিষ্ট
Related News
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু
হক মোঃ ইমদাদুল: বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের,Read More
স্ত্রীর আয় নয়, সংকট পুরুষের পুরোনো পরিচয়ে
হক মোঃ ইমদাদুল: একটি সংসারে স্ত্রী যখন স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখনRead More



Comments are Closed