সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, ২ লাখ মানুষ পানিবন্দী
আল হেলাল, সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা: সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী চার উপজেলায় পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে সোমবার জেলার প্রধান নদী সুরমার পানি বিপদ সীমার ৮২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টায় ১২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রায় ২ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। শতাধিক স্কুল মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে বন্যার পানি উঠায় এসব প্রতিষ্টানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হযরত আলী। বন্যায় গত শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত ১ জনের মৃত্যু ও ৪ জনের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার কলাউড়া গ্রামের ফরিদ মিয়া ফটিক এর ছেলে ইউসুফ (৩) বাড়ির সামনে বন্যার ভরা পুকুরের পানিতে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরন করে। এছাড়া বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া সুনামগঞ্জ পৌরসভার নবীনগরের আলমাছ আলীর ছেলে শরাফত আলী (২০), ধর্মপাশা উপজেলার মলয়শ্রী গ্রামের মৃত লতিচরন দাসের ছেলে লনি দাস (৫৫), ছাতক উপজেলার বোয়ালগাও গ্রামের কামরুজ্জামানের ছেলে ৫ম শ্রেণির ছাত্র তৌহিদুজ্জামান রাশান (১১) ও বদরুজ্জামান খসরুর ছেলে হামিদুজ্জামান আবিদ (৮) এর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি।
সোমবার বিকেলে সুরমা নদীতে বালিবাহী ২টি বলগেড পরিবহন বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যায় ৩৫০ হেক্টর আউশ, রোপা আমনের বীজতলা সম্পুর্ণরুপে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। পানিবন্দী মানুষের খাবার সংকঠের পাশাপাশি গো খাদ্যের সংকঠ দেখা দিয়েছে দূর্গত এলাকায়।
সুনামগঞ্জ পৌর এলাকার পূর্ব সুলতানপুর, মল্লিকপুর, জলিলপুর, নবীনগর, উত্তর আরপিননগর, তেঘরিয়া, কালীপুরসহ ১০টি গ্রামের শতাধিক পরিবারের বসতঘরে পানি প্রবেশ করেছে। সরকার ও বেসরকারী পর্যায়ে ত্রাণ বিতরন শুরু হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ কামরুজ্জামান বলেছেন, দূর্গত এলাকার জন্য ইতিমধ্যে ৮ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ও ১১৬ মেঃ টন চাল বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপদকালীন অবস্থা মোকাবেলায় তাৎক্ষনিক বরাদ্ধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোন আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়নি।
অর্ধশতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক পানি বন্দী
প্রবল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলে সুনামগঞ্জে বন্যা শুরু হওয়ায় গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলা সদর সহ নিন্মাঞ্চলে অবস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিক গুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ক্লিনিকের সামনের রাস্তা-ঘাট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার অসহায় বন্যার্ত জনসাধারন। জেলার হাওরাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে পানিবাহিত রোগের লক্ষণও দেখা দিয়েছে বলে জানান সচেতন এলাকাবাসী।
জানা যায়, জেলার তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, বিশ্বাম্ভরপুর, দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, ছাতক, দোয়ারা বাজার সহ ১১টি উপজেলায় ২১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। চালুর অপেক্ষায় আছে আরো ২০টি। এর মধ্যে বিভিন্ন উপজেলার অর্ধশতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও গ্রামীন সড়কের রাস্তা বর্তমানে পানিতে ডুবে গেছে। ক্লিনিকগুলো পানিবন্দী থাকায় রোগীরা যেমন ক্লিনিকে যেতে পারছে না, তেমনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ক্লিনিকে যেতে না পারায় সাধারন মানুষকে কাক্ষিত সেবা দিতে পারছেনা। ক্লিনিকগুলো মান্ধাতার আমলের মতই দায়সারাভাবে মুল সড়ক থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে ও নিচু স্থানে সংযোগ বিচ্ছিন্নভাবে তৈরী করার কারনে বর্ষার সময় বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় হাওরাঞ্চলের মানুষকে। তাছাড়া গ্রামীন সড়কগুলো পাহাড়ী ঢলের পানিতে ভেঙ্গে ও ডুবে যাওয়ায় স্থানীয়রা কমিউনিটি ক্লিনিক সহ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে পারছেন না।
আরো জানা যায়, সদর উপজেলার রঙ্গারচর, মদনপুর, মনোহরপুর, তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিনকুল, মোযাজ্জেমপুর, মিয়াচর সহ বিভিন্ন উপজেলার নিন্মাঞ্চলে অবস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর রাস্তা পানিতে ডুবে গেছে। দূর্যোগ মোকাবিলায় এসব ক্লিনিকের কর্মরত সিএইসসিপি (কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার) দের সব রকমের প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ প্রতিটি ক্লিনিকে দূর্যোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করেছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর রাস্তা মুল সড়ক থেকে নিচু, সেই সাথে সংযোগ সড়ক না থাকায় বর্ষায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে আমাদের। চিকিৎসা সেবা নিতে পারছি না আমরা।
তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বোরহান উদ্দিন বলেন, আমার উপজেলার বেশির ভাগ বাড়ি-ঘর পাহাড়ী ঢলের পানিতে ডুবে গেছে। কিছু কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক পানিবন্দী রয়েছে সবার খোঁজ খবর রাখছি। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সংযোগ সড়ক আরো উচু করা প্রয়োজন।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জানান, বন্যা কবলিত এলাকা গুলোর বিষয়ে খোঁজ খবর রাখছি। দূর্যোগ মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
সুনামগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুল হাকিম বলেন, পাহাড়ী ঢলে জেলার কিছু কিছু কমিউনিটি ক্লিনিক গুলোর রাস্তা পানিতে ডুবে গেছে। তারপরও ক্লিনিকের কর্মরর্তা সিএইসসিপি (কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার) দেরকে র্সাবক্ষনিকভাবে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য বলা হয়েছে।
পানির উপর ভাসছে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রবল বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলের কারনে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা শুরু হওয়ায় পানির উপর ভাসছে জেলার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্টান। পানিবন্দী হওয়ার কারনে কমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের পিতা মাতাসহ অভিভাবকরা দূর্ঘটনার আশঙ্কায় তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্টানে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে হাওরাঞ্চলের শিক্ষকরাও স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী না আসায় অলস সময় পাড় করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবর্তমানে বন্ধ রয়েছে জেলার প্রায় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্টান।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, জেলায় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১ হাজার ৪২৬ টি। এর মধ্যে জেলার ৮টি উপজেলায় তাহিরপুরে ১২টি স্কুল, দোয়ারা বাজারে ৬টি, বিশ্বম্ভরপুরে ২০টি, ছাতকে ২টি, ধর্মপাশায় ৪টি, জগন্নাথপুরে ১৫টি, সুনামগঞ্জ সদরে ৭টি, দক্ষিন সুনামগঞ্জে ২৪টি সহ মোট ৯৫টি শিক্ষা প্রতিষ্টান পানিবন্দী থাকায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও তাহিরপুর উপজেলার রাস্ক প্রকল্পের ৭৫টি আনন্দ স্কুলে পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়াও জেলার প্রায় দু-শতাধিক প্রাথমিক, মাধ্যমিক, নিন্ম মাধ্যমিক ও কলেজের সংযোগ সড়ক ও স্কুলের আঙ্গিনা পানিতে ডুবে গেছে। বন্যার পানি বাড়তে থাকায় আরো দু-শতাধিক অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্টানে পানি ছুই ছুই করছে। তাহিরপুর উপজেলার বড়দল নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়,লক্ষীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়,পাতারগাঁও সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইমলামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মানিকখিলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাড়ালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামলাবাজ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালগড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয, রতনশ্রী পূর্বপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়খলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিজুরী, দুমাল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধর্মপাশা উপজেলার আটাইশা মাছিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘাসি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিসসিম পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিশ্বাম্ভপুর উপজেলার মুক্তিখলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নিয়ামতপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় গত ৩দিন ধরে পাঠ বন্ধ রয়েছে বলে জানান স্থানীয় এলাকাবাসী।
বড়খলা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মঞ্জু তালুকদার জানান, আমার বিদ্যালয়ের আজ পানি প্রবেশ করায় বন্ধ করে চলে আসছি। উপজেলার অন্যান্য স্কুল গুলোর আবস্থাও খারাপের দিকে যাবে পানি আরো বাড়লে।
তাহিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম জাহান রাব্বি জানান, উপজেলার ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যার পানিতে ডুবেছে। হাওরাঞ্চলের বাকি স্কুল গুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা উবর্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে স্কুল বন্ধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেব।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কমরুল জানান, উপজেলায় পাহাড়ী ঢল ও বৃষ্টির পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। যার জন্য শিশু শিক্ষার্থী ও মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তাদের পিতা মাতা ভয়ে পাঠাচ্ছে না। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ খালেদুর রহমান জানান, বন্যার পানি বৃদ্ধির কারনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানে পানি প্রবেশ করছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Related News
সুনামগঞ্জের হাওরে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল আটটার দিকেRead More
শান্তিগঞ্জে ৮ বছর ধরে অকেজো কোটি টাকার সোলার প্যানেল, রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য শান্তিগঞ্জ উপজেলার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে বসানো এক কোটি ৪৭ লাখRead More



Comments are Closed