বিদেশে পড়তে গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন বাংলাদেশিরা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ বা বিদেশে থাকা মেধাবীদের দেশে ফিরে আসার ধারণা। বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার ঘোষণায় আশার সঞ্চার হলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বরং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বেতন, স্থিতিশীল জীবনযাত্রা, আধুনিক কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তার আকর্ষণে দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ বিদেশে থেকে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ হারাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি গঠনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন প্রায় ৫২ হাজার শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষার জন্য বাংলাদেশিদের ব্যয় হয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।
তবে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরে আসেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তাদের বড় একটি অংশ আর দেশে ফেরেন না।
উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২১ সালে কানাডায় যান ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থী আরিফ হাসান। বর্তমানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরিফ বলেন, আপাতত বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই।
তার ভাষায়, ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা মানুষকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে পরিবার-পরিজন থাকলেও পেশাগত ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ আপাতত এখানেই বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান কানাডার অটোয়ায় বসবাসরত মাহিরা ইসলাম। ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়া এই শিক্ষার্থী বর্তমানে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি গবেষণাও চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাহিরা বলেন, ‘বাংলাদেশে এ বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। তবে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, গবেষণার পরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে ফিরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জন করা নিজেই কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যদি দেশের কাজে না লাগে, তাহলে সেটি জাতীয় উন্নয়নের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষার্থীদের অনেকেই বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ বিদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, আর বাংলাদেশ সেই দক্ষতার প্রত্যক্ষ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
তার মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; বরং দেশের কাঠামোগত বাস্তবতা, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার সুযোগের অভাব এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জেরও প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ বাস্তবে সফল করতে হলে দেশে উচ্চমানের গবেষণা পরিবেশ, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিদেশে মেধা পাচারের এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
Related News
বিদেশে পড়তে গিয়ে সেখানেই স্থায়ী হচ্ছেন বাংলাদেশিরা
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসেRead More
আমিরাতে ওয়ার্ক পারমিটে সংস্কার, সহজ হচ্ছে কর্মসংস্থান প্রক্রিয়া
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সহজ, আধুনিকRead More



Comments are Closed