কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই
বিনোদন ডেস্ক: ভারতের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।
শনিবার (১১ এপ্রিল) হৃদরোগে আক্রান্ত হলে আশা ভোঁসলেকে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
অবশেষে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সংগীতজগতকে সমৃদ্ধ করেছেন আশা ভোসলে। হিন্দি সিনেমা ছাড়াও একাধিক ভারতীয় ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৮ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ প্রদান করা হয়।
এ ছাড়া তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। তার গাওয়া ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’, ‘ইন আঁখোঁ কি মস্তি কে’ কিংবা ‘ইয়ে ক্যায়া জাগাহ হ্যায় দোস্তোঁ’-এর মতো অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
ভারতীয় সংগীতের আকাশে এক অনন্য নক্ষত্রের নাম আশা ভোঁসলে। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে কোটি কোটি শ্রোতা। প্রেম, বিরহ, উচ্ছ্বাস কিংবা জীবনের গভীর অনুভূতি, সবকিছুকেই যেন তিনি কণ্ঠে রক্তমাংসের মতো জীবন্ত করে তুলেছিলেন। সেই কিংবদন্তি কণ্ঠ আজ স্মৃতির অমলিন আলো হয়ে রয়ে গেলেন শ্রোতাদের হৃদয়ে।
১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলি অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন আশা ভোঁসলে। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী দীননাথ মঙ্গেশকর। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানোর পর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর এবং বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের কাঁধে। খুব অল্প বয়সেই তাই গানকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয় তাঁকে।
মাত্র দশ বছর বয়সে প্রথম গান গেয়েছিলেন একটি মরাঠি ছবিতে। এরপর ধীরে ধীরে হিন্দি চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। শুরুটা সহজ ছিল না। সে সময় সংগীতজগতে শক্ত অবস্থান ছিল অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর। তবু ধৈর্য আর প্রতিভা দিয়ে এক সময় নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন আশা ভোঁসলে।
ষাট ও সত্তরের দশকে সুরকার রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তাঁর জুটি হয়ে ওঠে কিংবদন্তি। তাঁদের সৃষ্ট অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরে। প্রেমের আবেশ, উচ্ছ্বাস কিংবা আধুনিক সুরের পরীক্ষায় তিনি ছিলেন সব সময় সাহসী।
গজল, আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, সব ধারাতেই সমান দক্ষ ছিলেন এই শিল্পী। এমনকি বয়সের শেষ দিকেও নতুন সুরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছেন তিনি।
শুধু হিন্দি নয়, বাংলা গানেও ছিল তাঁর দাপট। বাংলা গানের শ্রোতারা আজও মনে রাখেন তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানগুলো যেমন- কিনে দে রেশমি চুড়ি, আজ যাই, আসব আরেক দিন কিংবা একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও। পুজার মণ্ডপ থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠানে এখনও বাজে সেই গান।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন। ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ বহু মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি তাঁর ঝুলিতে রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবেও তাঁর নাম ইতিহাসে লেখা আছে।
কণ্ঠের মোহ, সুরের মায়া আর অসংখ্য অমর গান। সব মিলিয়ে আশা ভোসলে যেন এক অনন্য যুগের প্রতীক। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠের জাদু আজও শ্রোতাদের মনে একই রকম মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়।
সংগীতপ্রেমীদের কাছে তাই তিনি শুধু একজন শিল্পী নন। এক অমলিন অনুভূতির নাম।
হিন্দির পাশাপাশি বাংলাদেশি সিনেমার গানেও পদচারণ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করা কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলের। আশির দশকে মুক্তি পাওয়া কয়েকটি যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে তার গাওয়া গান আজও সংগীতপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত ‘অবিচার’ সিনেমায় আশা ভোঁসলে কণ্ঠ দেন ‘নাগর আমার কাঁচা পিরিত’ গানে। এই গানে তার সহশিল্পী ছিলেন ভারতের শৈলেন্দ্র সিং।
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও শক্তি সামন্ত। গানের কথা লিখেছেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার এবং সুর করেছেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আর ডি বর্মণ।
এই ছবিতে অভিনয় করেন বাংলাদেশের রোজিনা ও নূতন এবং ভারতের মিঠুন চক্রবর্তী, উৎপল দত্ত প্রমুখ।
এরপর ১৯৮৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বিরোধ’ সিনেমাতেও পাওয়া গেছে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ।
প্রমোদ চক্রবর্তীর পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে তিনি গেয়েছেন ‘মায়াবী এই নেশায়’ গানটি। একই ছবিতে ‘তোরে আঁচলে’ শিরোনামের আরেকটি গানে কণ্ঠ দেন তার বড় বোন লতা মঙ্গেশকর। গানগুলোর কথা লিখেছেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার এবং সুর করেছেন আর ডি বর্মণ।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষভাগ থেকে সত্তর ও আশির দশক পর্যন্ত ভারতীয় সংগীতজগতে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে ছিলেন আশা ভোঁসলে।
হিন্দি চলচ্চিত্রে নায়িকাদের কণ্ঠধারায় তিনি আনেন নতুনত্ব, যা আধুনিক নারীর এক ভিন্ন প্রতিচ্ছবি তৈরি করে।
বিশেষ করে আর ডি বর্মণের সঙ্গে তার যুগল কাজ সংগীতজগতে এনে দেয় অসাধারণ সাফল্য। আধুনিক ও পাশ্চাত্য প্রভাবিত সুরের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব ধারা।
সংগীতে নতুনত্বের প্রতি অদম্য আগ্রহ থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে জায়গা করে নেন বিশ্বরেকর্ডের তালিকায়।
Related News
সালমান শাহর দেহাবশেষ তুলতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ
Manual7 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যRead More
হিজাব ছাড়া গান, ইরানি গায়িকাকে কঠোর শাস্তি
Manual4 Ad Code বিনোদন ডেস্ক: ইরানের জনপ্রিয় নারী গায়িকা পারাস্তু আহমদিকে হিজাব ছাড়া কনসার্টে পারফর্মRead More



Comments are Closed