Main Menu

ইঁদুরের উপদ্রব, ধান নিয়ে শঙ্কিত দোয়ারাবাজারের কৃষকরা

Manual1 Ad Code

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সোনার ফসল ঘরে তোলার আগেই ইঁদুরের আক্রমণে নিঃশেষ হচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। শিষ ধরা আমন ধানের জমিতে নেমেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক-ইঁদুর। হাওরের বুকে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে যে ধানের শীষ দোলার কথা, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে কাটা ধানগাছের সারি। কৃষকেরা বলছেন, যতই ফাঁদ পাতছেন বা ওষুধ ব্যবহার করছেন, কিছুতেই দমন করা যাচ্ছে না এই বুদ্ধিমান প্রাণীটিকে।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, রাতারাতি ধানগাছ কেটে ফেলছে ইঁদুরের দল। অনেক জমিতে ধানগাছ এমনভাবে কাটা, যেন কেউ ধারালো কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দিয়েছে। এক রাতের মধ্যেই কয়েক শত গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। ফলে মাঠে শীষ গজালেও তা ঘরে তোলা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র শঙ্কা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১৪ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে ধানের চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে উচ্চফলনশীল (উফশি) ও হাইব্রিড জাতের ধান রোপণ করা হয়েছে। সরকারিভাবে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ করা হলেও ইঁদুরের আক্রমণে এখন সেই ফসল ঝুঁকির মুখে।

সুরমা ইউনিয়নের হাছনবাহার গ্রামের কৃষক সাদত আলী এখন প্রায় প্রতিরাতেই ধানক্ষেতে থাকেন। ইঁদুর তাড়ানোর জন্য তিনি খেতে আলো জ্বেলে রাত ১২টা পর্যন্ত হাটেন। তবুও ফল মিলছে না। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘ধানের ফলন ভালো হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখি গাছ কাটা পড়ছে একের পর এক। ইঁদুর যেন খেত দখল করে ফেলেছে। এত চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছি না। মনে হয় এবার ঘরে তোলার মতো ধানই থাকবে না।’

লক্ষীপুর ইউনিয়নের রসরাই গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নানও একই দুর্ভোগের শিকার। তিনি বলেন, ‘ইঁদুর মারার ওষুধ, বাঁশের ফাঁদ; সব চেষ্টা করেছি। এমনকি খেতে পলিথিন টাঙিয়েছি, যাতে বাতাসে উড়লে শব্দ হয়, ইঁদুর ভয় পায়। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। ইঁদুর যেন বুঝে ফেলেছে আমাদের ফাঁদ।’

কৃষকদের দাবি, ইঁদুরের আক্রমণ এ বছর গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের নিচু ও স্যাঁতস্যাঁতে জমিগুলোতে ইঁদুরের সংখ্যা বেড়েছে। জমির ধারে গর্ত তৈরি করে তারা গাছ কেটে খাদ্য হিসেবে মজুত রাখছে।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এখনই সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া না গেলেও, যদি ইঁদুরের দমন কার্যক্রম দ্রুত সফল না হয়, তবে আমন মৌসুমের কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আগে থেকেই জমিতে ফসল পেকেছে, সেখানে ক্ষতির পরিমাণ বেশি।

কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে খেতে গিয়ে দেখি, গাছ কাটা পড়ে আছে। এক রাতেই ৩ থেকে ৫ শত গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই ধান বিক্রি করে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ, সংসারের বাজার;সব চালাই। এখন মনে হচ্ছে সব শেষ।’

Manual4 Ad Code

কৃষকেরা বলছেন, ইঁদুর নিধনে নানা পদ্ধতি প্রয়োগ করেও তারা সফল হচ্ছেন না। কেউ কেউ বাজারে পাওয়া রাসায়নিক ওষুধ ব্যবহার করছেন। কেউ ব্যবহার করছেন বাঁশের তৈরি ঐতিহ্যবাহী ফাঁদ। তবে ইঁদুর যেন সব কৌশল বুঝে যাচ্ছে।

সুরমা ইউনিয়নের কৃষক বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আগে বাঁশের ফাঁদে এক রাতে ১০-১২টা ইঁদুর মারা যেত। এখন ওরা ফাঁদ চিনে গেছে মনে হয়, ফাঁদের পাশ দিয়ে চলে যায়। ইঁদুর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ধূর্ত।’

দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে এ ধরনের খবর পেয়েছি। প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাঁরা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে কৃষকদের ইঁদুর মারার পদ্ধতি দেখিয়ে দিচ্ছেন। ইঁদুর খুবই বুদ্ধিসম্পন্ন একটি প্রাণী।’

তিনি আরও বলেন, জমির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। একধরনের পাখি রয়েছে যে পাখি ইঁদুর ধরে খেয়ে ফেলে। তাদের জমিতে বসার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে।

Manual8 Ad Code

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ইঁদুরের প্রজনন খুব দ্রুত হয়। একটি ইঁদুর বছরে ৫ থেকে ৬ বার বাচ্চা দেয়, প্রতিবারে গড়ে ৮-১০টি করে। ফলে নিয়ন্ত্রণ না করলে দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুর নিধনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একটি গ্রাম বা অঞ্চলের কয়েকজন কৃষক একসাথে অভিযান না চালালে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ, এক জায়গা থেকে তাড়ালে তারা পাশের জমিতে আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ফসলের প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ ইঁদুরে নষ্ট হয়, যার অর্থমূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। তাই এই ক্ষতি রোধে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের যৌথ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দোয়ারাবাজারের কৃষকেরা এখন সরকারের কাছ থেকে কার্যকর উদ্যোগ আশা করছেন। তাঁরা চান, কৃষি অফিসের মাধ্যমে সমন্বিত ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হোক। অনেক কৃষক চান, প্রতিটি ইউনিয়নে দল গঠন করে নিয়মিত ফাঁদ পাতার ব্যবস্থা করা হোক, যাতে ইঁদুরের প্রজনন কমে।

কৃষক সাদত আলীর ভাষায়, ‘ধান যখন ঘরে তোলার কথা, তখন ইঁদুরে মাঠ খালি হয়ে যাচ্ছে। একদিনের ফসলের জন্য সারা বছর কষ্ট করি। এখন মনে হয় সেই পরিশ্রম সব বিফলে যাবে। সরকার যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাব।’

দোয়ারাবাজারের প্রতিটি ইউনিয়নে ‘ইঁদুর নিধন সপ্তাহ’ পালন এর আওতায় কৃষকদের হাতে ফাঁদ, ওষুধ ও নির্দেশিকা সরবরাহ করাসহ বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সংগঠনের সহযোগিতায় সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হবে।

Manual2 Ad Code

এখনও মাঠে সবুজ ধান গাছগুলো বাতাসে দুলছে, কিন্তু কৃষকের চোখে ভর করছে উদ্বেগ। একদিকে ভালো ফলনের আশা, অন্যদিকে ইঁদুরের থাবায় ক্ষতির ভয়। হাওরপাড়ের কৃষকেরা বলছেন, ‘প্রকৃতি ও ভাগ্যের লড়াই তো আছেই, কিন্তু এবার লড়াইটা ইঁদুরের সঙ্গে।’

দোয়ারাবাজারের বিস্তীর্ণ হাওরে তাই এখন কৃষকের মুখে একটাই প্রশ্ন-‘ধান কি ঘরে তোলা যাবে?’ এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় কি না, আর কৃষকের স্বপ্নের ধান ইঁদুরের দাঁতের আঘাতে হারিয়ে যায় কি না।

Manual7 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code