সিলেটে এখনো পানিবন্দি অনেক এলাকা, সড়কে পশুর সঙ্গে বসবাস
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কয়েকটি এলাকার সহস্রাধিক পরিবার এখনো পানিবন্দী। এর সঙ্গে প্রায় ১৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুরবস্থায় আছেন ব্যবসায়ীরাও।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ গত ১৯ দিন। প্রধান সড়কে হাঁটুর ওপর পানি থাকায় দক্ষিণ সুরমার লাউয়াই সড়কটির ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছে পথচারীরা। যারা সে পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করে, তারা ওই এলাকারই বাসিন্দা। নিজ নিজ বাসাবাড়িতে যেতে বাধ্য হয়ে ওই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সোমবার দক্ষিণ সুরমা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ সুরমার বঙ্গবীর সড়ক, লাউয়াই সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চণ্ডীপুল সড়কের আগপর্যন্ত জলাবদ্ধ অবস্থায় আছে। বঙ্গবীর সড়কে কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরসমান পানি। এ সড়কের দুই পাশের প্রায় ১৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ ছাড়া ধরাধরপুর, মোমিনখলা, রায়েরগাঁও, লাউয়াইন, কামুসনা, আলমপুর ও তেতলী এলাকার ঘরবাড়ি এবং সড়কে হাঁটুসমান পানি রয়েছে। চণ্ডীপুল এলাকার দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণেও পানি দেখা গেছে। বঙ্গবীর সড়কের জ্বালানি তেলের পাম্প এবং চণ্ডীপুল মোড়ে জ্বালানি তেলের আরেকটি পাম্প পানিতে তলিয়ে থাকায় জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ আছে।
এদিকে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন প্রাঙ্গণেও প্রায় হাঁটু পর্যন্ত পানি দেখা গেছে। এতে রেলস্টেশনে নামার পর গন্তব্যে যেতে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক যাত্রীকে মালপত্র নিয়ে ময়লা পানি মাড়িয়ে স্টেশনে প্রবেশ করতে দেখা গেছে।
বঙ্গবীর রোডের মিতালি অটোমোবাইল নামের একটি দোকানে যানবাহনের সরঞ্জাম বিক্রি করেন সামসুল ইসলাম (৪৭)। তিনি বলেন, ‘২৫ বছর ধরে ব্যবসা করছি। কিন্তু এমন অবস্থা কখনোই হয়নি। জুন মাসের ১৫ তারিখে সন্ধ্যায় হঠাৎই সড়কে পানি উঠে দোকানে প্রবেশ করে। সে সময় মেঝেতে থাকা মালামাল তুলে কিছুটা ওপরে রাখা হয়েছিল। পরদিন পানি বেড়ে হাঁটুসমান হয়ে যায়। সে সময় তেমন পাত্তা দিইনি। এর পরদিনই পানি বেড়ে বুকসমান হয়ে যায়। এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে থাকা প্রায় ১৫ লাখ টাকার মালামাল ভেসে গেছে। এখন পথে বসার উপক্রম।’
ধরাধরপুর এলাকার বাসিন্দা আবদুর রউফ (৩৬) বলেন, এলাকায় অনেকেই অপরিকল্পিতভাবে বাসাবাড়ি বানিয়েছেন। এতে পানি নামার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে এবার পানি নামতে পারছে না। এর আগে বৃষ্টির সময় কিছুটা পানি জমলেও দ্রুতই সেগুলো নেমে যেত। তবে এবার ১৫ দিন হয়ে গেলেও পানি নামছে না।
মোমিনখলা এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, এলাকাগুলোতে সুরমা নদীর পানি উপচে প্রবেশ করেছিল। পানিগুলো সাধারণত জৈন্তারখাল হয়ে কুশিয়ারা নদীতে নামে। কুশিয়ারা নদীর পানি না কমায় এলাকার পানি নামছে না। তিনি আরও বলেন, এলাকার জৈন্তার খাল, ছড়া ও বক্স কালভার্টে ময়লা-আবর্জনা জমে পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এসব ময়লা-আবর্জনা স্থানীয় ব্যক্তিরাই বিভিন্নভাবে এসব খালে ফেলেছিলেন। এতে পানিপ্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশন ছড়া, খালের ময়লা-আবর্জনা পরিচ্ছন্ন করছে। যেদিকে খবর পাওয়া যাচ্ছে, সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা দল সেদিকে গিয়ে অভিযান চালাচ্ছে। দক্ষিণ সুরমার ওই এলাকাগুলোও পরিচ্ছন্ন করা হবে।
ছড়া খালের বিষয়ে তিনি বলেন, দক্ষিণ সুরমার কিছু এলাকা সিটি করপোরেশনে নতুন করে অধিভুক্ত হয়েছে। সেসব এলাকা ঘরবাড়িগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী হয়েছে কি না, তদারকি করা হবে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, সিলেটের নদ-নদীর পানি সুনামগঞ্জ দিয়ে নামে। সুনামগঞ্জে পানি বেশি থাকায় পানি নামতে সময় লাগছে।
এদিকে গত রোববার সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে পাগলবাজার এলাকায় আশ্রয় নেওয়া মবশ্বির আলীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘১৫ জুন ঘরে পানি ওঠে। ঘর থেকে এখনও পানি নামেনি। পানিতে ঘরের সব মাটির দেয়াল ভেঙে গিয়েছে। তাই সড়কের পাশেই আশ্রয় নিয়েছি।’
মবশ্বির বলেন, ‘এই ছাপরা ঘরেই বউ, বাচ্চা নিয়ে থাকি। দুটি গরুও থাকে এখানে। রাতে গরুর মলমূত্রের গন্ধে ঘুমানো যায় না। তবু আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। গরুগুলোও কোথাও রাখার জায়গা নেই।’
এই মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ পার হলেই দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে অসংখ্য ছাপড়া ঘর। পুরো সড়কই যেন হয়ে উঠেছে আশ্রয় শিবির।
মবশ্বিরের মতো কয়েক শ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে সড়কের পাশে। তাদের সবার ঘরেই বন্যার পানি। কারও ঘর ভেঙেও গেছে পানিতে।
সড়কের পাশে আশ্রয় নেয়া অনেকে নিজেদের হাঁস-মুরগি আর গবাদি পশুও নিয়ে উঠেছেন এখানে। এসব ঝুপড়ি ঘরে মানুষ আর পশু করছে যৌথ বাস।
পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামের কৃষক সোহাগ আহমদও আশ্রয় নিয়েছেন সড়কের পাশে। সড়কই হয়ে উঠেছে তার অস্থায়ী ঘর। সোহাগ বলেন, ‘১৫ দিনেও ঘর থেকে পানি নামেনি। যাওয়ার মতোও আর কোনো জায়গা নেই। তাই সড়কের পাশেই বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিয়েছি।
‘রাত হলে গাড়ির শব্দে ঘুমাতে পারি না। আর বৃষ্টি হলে ছাপড়া ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে। এসব কষ্ট সহ্য করেই এখানে থাকতে হচ্ছে।’
গত শনিবার এই সড়কে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপরই পানিতে ভিজে যাওয়া ধান শুকাচ্ছেন অনেকে। ভেজা আসবাবপত্র আর লেপ-তোশকও সড়কের ওপর রোদে শুকাতে দিয়েছেন তারা।
গবাদি পশুরও রক্ষণাবেক্ষণ করছেন কেউ কেউ। কয়েকজনকে ছাপড়া ঘরের ভেতরে চুলো জ্বালিয়ে রান্নার আয়োজন করতেও দেখা যায়।
ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত নাজমা বেগম বলেন, ‘আগের বন্যায় বেশিরভাগ ফসল ভাসিয়ে নিয়েছিল। সামান্য যেটুকু ঘরে তোলা গিয়েছিল, তাও এই বন্যায় ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে।’
সড়কে শুকাতে দেয়া ধান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এইগুলা একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব ধান থেকে আর চাল পাওয়া যাবে না; গবাদি পশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। নিজেরা যে কী খেয়ে বাঁচব, তা বুঝতেছি না।’
একই সড়কের জানিগাঁও ইউনিয়ন এলাকায় সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন কুতুব উদ্দিন। গরু আর মুরগির সঙ্গে একই ঘরে রাত কাটে তার। তিনি বলেন, ‘পশুর সঙ্গে আমাদের জীবনের এখন কোনো পার্থক্য নেই। বন্যায় সব এক হয়ে গেছে। লজ্জা ভুলে ঘরের নারীদের নিয়েও রাস্তায় আশ্রয় নিতে হয়েছে।’
গত ১৫ জুন থেকে চলতি বছর তৃতীয়বারের মতো বন্যা দেখা দেয় সিলেটে। চলমান বন্যাকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বলছেন অনেকে। এই বন্যায় তলিয়ে যায় সিলেটের ৮০ শতাংশ এলাকা।
তিন দিন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল এ জেলা। পানি উঠে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সিলেটের সাথে ১৩টি উপজেলার। এ ছাড়া বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ ছিল অনেক জায়গায়। এসময় সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কও কয়েকদিন বন্ধ ছিল।
পানি কমতে শুরু করলেও এখনও প্লাবিত জেলার অনেক এলাকা। সড়ক থেকে পানি নামার পর সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের দুই পাশে অস্থায়ী ঘর বাড়িতে আশ্রয় নেয় প্লাবিত এলাকাগুলোর কয়েক শ’ পরিবার।
Related News
জৈন্তাপুরে ১১ লাখ টাকার ভারতীয় কম্বল জব্দ, আটক ২
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় একটি কাভার্ডভ্যান থেকে ৭৭২ পিস ভারতীয়Read More
বিশ্বনাথে ছুরিকাঘাত ৩৫ হাজার টাকা ছিনতাই
Manual7 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে ডেলিভারি ম্যানকে ছুরিকাঘাত করে ৩৫ হাজার টাকাRead More



Comments are Closed