সিলেটে হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থেকেই বিয়ে করলেন প্রবাসী
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট নগরীর আরেক হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় এক প্রবাসী বিয়ে করেছেন বলে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্য ফেরত ওই প্রবাসী নগরের লামাবাজার এলাকার ‘হোটেল লাভিস্তা’তে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন। সেই হোটেলেই বিয়ের আয়োজন করা হয়। এতে কনে ছাড়াও বাইরে থেকে আসা অনেক অতিথিরা অংশ নেন।
গত ২০ মার্চ রাতে ঘটা করে এ বিয়ের আয়োজন হয়। চলে খানাপিনাও।
জানা যায়, গত ১৮ মার্চ যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে আসা যাত্রীদের মধ্যে ১১ জনকে হোটেল লাভিস্তায় প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। এদের মধ্যে দুজন সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার জাঙ্গাইল এলাকার এক নারী (৪৮) ও তার ছেলে (২৮)। মা অবস্থান করেন ৪০১ নম্বর কক্ষে আর তার ছেলে অবস্থান করেন ৪০৬ নম্বর কক্ষে।
নিয়ম অনুযায়ী তারা সব ধরনের জনসমাগম এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলার কথা থাকলেও লাভিস্তা হোটেলে স্টেজ সাজিয়ে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী ওই যুবক (২৮)। আর এ বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেন বাইরে থেকে আসা প্রায় ৫০ জন অতিথি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভূরিভোজও হয় হোটেলের রেস্টুরেন্টে।
এরআগে গত ১৮ মার্চ বিকেলে একই হোটেলেই ‘এঙ্গেজমেন্ট’ অনুষ্ঠান হয়।
সূত্র জানায়, ছেলের বিয়ে উপলক্ষে বাইরে বের হয়ে নগরীর বিভিন্ন বিপণিবিতান থেকে কেনাকাটাও করেছেন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকা যুক্তরাজ্য প্রবাসী যুবকের মা। যার পুরোটাই হয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে।
হোটেল কর্তৃপক্ষ বিয়ের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে বেরিয়ে আসে আসল তথ্য।
হোটেল অভ্যর্থনার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক তারেক আহমদ প্রথমে পুরো ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, ‘এমন কোন ঘটনাই হয়নি। এমনকি এসব কক্ষে কোন প্রবাসীও অবস্থান করছেন না।’
পরে অন্য একটি সূত্র থেকে ১৮ মার্চ হোটেল লাভিস্তায় আসা ১১ জনের তালিকা সংগ্রহ করে নাম এবং কক্ষ নম্বর মিলে যাচাই করা হলে দেখা যায় ৪০১ এবং ৪০৬ নম্বর কক্ষে অবস্থান করছেন মা-ছেলে।
এমন তথ্য জানানোর পর হোটেল ব্যবস্থাপক তারেক আহমদ বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার কথা অস্বীকার করলেও আকদ (বিবাহ রেজিস্ট্রি) হয়েছে বলে জানান।
বিয়ের পর কনে ৪০৬ নম্বর কক্ষেই বরের সাথে অবস্থান করছেন এমন তথ্য জানিয়ে হোটেলের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখতে চাইলে অপারগতা প্রকাশ করেন ব্যবস্থাপক।
লাভিস্তা হোটেলের ব্যবস্থাপক তারেক আহমদ বলেন, ‘বিয়ের অনুষ্ঠানের তথ্য ভুল। তবে আকদ হয়েছে (বিবাহ রেজিস্ট্রি)। এজন্য কাজিসহ ৪ থেকে ৫ জন মানুষ এসে তারা কেবল স্বাক্ষর নিয়েছেন। মূলত মানবিক দিক বিবেচনায় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদেরকে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের এমন আজব খবর কেবল এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ আছে নগরীর অধিকাংশ হোটেলের বিরুদ্ধে। এসব হোটেলে অবস্থানরত প্রবাসীরা হোটেল কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে বের হন বাইরে। ঘুরেন, প্রয়োজনে স্বজনদের সাথে দেখা করেন। কেনাকাটাও করেন। যার পুরোটাই হয় হোটেল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে।
এমন কর্মকাণ্ডের একাধিক অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সূত্র জানায় সম্প্রতি এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২১ মার্চ প্রথমে আম্বরখানার ব্রিটানিয়া হোটেলে পরিদর্শনে যান গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই’র দুই কর্মকর্তা। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটের দিকে তারা হোটেলে গেলে হোটেলের ২০৩, ৬০৩ নম্বর কক্ষের দরজা বন্ধ দেখতে পান। তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ জানান, ওই দুই কক্ষের লোকজন ঘুমিয়ে আছেন। পরবর্তিতে এনএসআইর পক্ষ থেকে তাদের ডাকার জন্য বলা হলে কথা পরিবর্তন করেন কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকেই শুরু হয় টালবাহানা।
এসময় ফোনে কল দেওয়া হলে এসব কক্ষে অবস্থানকরা প্রবাসীরা জানান, তারা জকিগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছেন এবং সন্ধ্যায় ফিরবেন। এমন অবস্থায় সিলেটে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিয়ে চলছে সমালোচনা।
করোনার নতুন ধরণ ছড়িয়ে পড়ার শংকা থাকার কারণে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা করা হলেও সিভিল সার্জনের অনুমতিতে মিলে বাইরে বের হওয়ায় সুযোগ। লিখিত আবেদনের মাধ্যমে এ সুযোগ নিয়ে কোয়ারেন্টিনে থাকা প্রবাসীরা ঘুরেন অনায়াসে। সে ক্ষেত্রে করোনা ছড়ানোর শংকা থাকে কি না তা নিয়েও আছে প্রশ্ন।
একটি সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মার্চ সোমবার ব্রিটানিয়া হোটেলে পরিদর্শন শেষে বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে দরগাগেট ‘হোটেল হলি গেট’ পরিদর্শনে যান এনএসআইর ওই দুই কর্মকর্তা। সেখানে গিয়ে লিমু মিয়া (৬০), মনু মিয়া (৫২), রওশন আরা সাথী (৪৯), সজেদা বেগমকে (৪১) অনুপস্থিত পান। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের চারজনের বাইরে বের হওয়ায় জন্য সিভিল সার্জনের অনুমতিপত্র দেখান। তবে সে অনুমতির সময়েও আছে প্রশ্ন। ওই ছাড়পত্রে বাইরে অবস্থান করার জন্য এ চারজনকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত অনুমতি প্রদান করা হলেও বিকাল সাড়ে ৩টায়ও তারা উপস্থিত ছিলেন না হোটেলে। সে ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
তবে এসবের বিরুদ্ধে এবার কিছুটা পদক্ষেপও নিচ্ছে প্রশাসন। হোটেল ব্রিটানিয়া থেকে ৯ প্রবাসী উধাও হওয়ায় ঘটনার পর পর শিশু ছাড়া ৬ জনকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট মেজবাহ উদ্দিন আহমদ। আর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্রিটানিয়া হোটেলের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
তবে হোটেল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে এমন ঘটনা ঘটলেও দোষ পুলিশ প্রশাসনের উপর চাপানো হয় বলে মন্তব্য করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের। তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাজ হচ্ছে নিরাপত্তা দেওয়া। হোটেল কর্তৃপক্ষ কোন সমস্যা অনুভব করলে পুলিশকে জানাবেন। কিন্তু তারা পুলিশের অগোচরে অন্যান্য বোর্ডারের মতো প্রবাসীদের বিয়ে করা, বাইরে বের হওয়ার সুযোগ দিয়ে দোষ চাপায় পুলিশের উপর।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( সার্বিক, অতিরিক্ত দায়িত্ব) আ.ন.ম. বদরুদ্দোজা বলেন, আমরা এসব বিষয়ে কঠোর হচ্ছি। কিন্তু সকল কিছুর উর্ধ্বে সচেতনতা। চাইলেই কারো সাথে আসামির মত আচরণ সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে প্রবাসীদের সহযোগিতা করতে হবে। আর হোটেল কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে ইতোমধ্যে দেখেছেন আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। লাভিস্তার বিয়ের বিষয়টি আমি এখন অবগত হলাম। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Related News
সিলেটে অনুমোদনহীন ৪ প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট মহানগরীর দক্ষিণ সুরমায় অনুমোদনহীন সার্জিক্যাল পণ্য বিক্রি ও লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা পরিচালনারRead More
ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে শাবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু, তিন দিনের শোক
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট মহানগরীর চৌকিদেখি এলাকার ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে পানিতে ডুবে শাহজালালRead More



Comments are Closed