Main Menu

সিলেটের রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার, ঘটনার তদন্তে পিবিআই

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট নগরীর রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তভার পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যাকাণ্ডের এক মাসের বেশি সময় পর মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মামলটি পিবিআইয়ে স্থানান্তর করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)।

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে এখন পর্যন্ত তিন বয়ান সামনে এসেছে। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে উঠে এসেছে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে গ্রেপ্তার বাবলু মিয়ার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা। নিহত দম্পতির পরিবারের অভিযোগ, তাদের দীর্ঘদিনের জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। আর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বাবলু বলেছেন, বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তিনি তিনজনকে হত্যা করেন।

একই ঘটনায় সামনে আসা এসব ভিন্ন বয়ানের কোনটি সত্য, কিংবা এর বাইরে অন্য কোনো কারণ বা কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না? এখন থেকে সেটিই খুঁজে দেখার দায়িত্ব পিবিআইয়ের হাতে এসে পড়লো।

গত ১২ আগস্ট সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর নিকুঞ্জ ভিলার দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে ব্যবসায়ী এম আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সকাল নয়টার দিকে বাসার বাইরে রক্ত দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজনের সন্দেহ হয়। পরে খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার করে।

ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে পুলিশ। ঘটনার দিনই রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবলু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বয়স প্রায় ৪০ বছর। তিনি সেখানে বসবাস করতেন এবং রংমিস্ত্রির কাজ করতেন।

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ জানিয়েছিল, তাহমিনার সঙ্গে বাবলুর আগে থেকে পরিচয় ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন তিনি ওই বাসায় যান। সেখানে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। বিষয়টি দেখে ফেলায় সাত্তার ও সুরাইয়াও হামলার শিকার হন বলে পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে বলা হয়। পরে বাবলুর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৩ আগস্ট একটি ছুরি উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানায়।

তবে তদন্তের সেই প্রাথমিক বয়ানই একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে থাকছে না। ১৪ আগস্ট নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। মামলায় বাবলুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সাত্তার দম্পতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমি ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে তাদের চাপ ও হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছিল। এমনকি আদালত প্রাঙ্গণেও তাদের চাপ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।

মামলার এজাহারে জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সরাসরি যোগসূত্র এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

এদিকে ১৬ আগস্ট বাবলুকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২০ আগস্ট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন বাবলু। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

তখন আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, জবানবন্দিতে বাবলু বলেন, বাড়িভাড়া নিয়ে চাপের কারণে তিনি চুরির সিদ্ধান্ত নেন। এরপর নিকুঞ্জ ভিলায় গিয়ে চুরি করার চেষ্টা করেন। সেখানে তাহমিনা তাকে দেখে ফেললে তিনি তাকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে সাত্তার ও সুরাইয়াকেও হত্যা করেন।

এরইমধ্যে তদন্ত নিয়ে নিহত দম্পতির পরিবারের উদ্বেগের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছায়।

১ সেপ্টেম্বর সিলেট সফরে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন নিহত সাত্তার দম্পতির দুই মেয়ে সেলিনা সুলতানা শিখা ও তারানা সুলতানা শিমু এবং তাদের স্বজনেরা। তারা মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। মন্ত্রী তাদের যথাযথ তদন্তের আশ্বাস দেন এবং পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান।

ওইদিন সিলেট সার্কিট হাউসে আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত সভাতেও বিষয়টি ওঠে। সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী মন্ত্রীর কাছে হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সরোয়ার মুর্শেদ শামীমের কাছে মামলার অগ্রগতি জানতে চান এবং দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেন।

পরে ঢাকায় ফেরার পথে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীও মন্ত্রীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরেন। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে কথা বলে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেওয়ার নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

আজ বৃহস্পতিবার সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। আমরা মামলার তদন্তকাজ প্রায় শেষ করে এনেছিলাম। এরইমধ্যে মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তরের নির্দেশ আসে।

এদিকে পিবিআই সিলেটের পুলিশ সুপার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, মামলাটি মহানগর পুলিশের কাছ থেকে পিবিআইয়ে এসেছে গত পরশুদিন। ইতিমধ্যে পুলিশ পরিদর্শক মো. মোরসালিন (নিরস্ত্র) নামের এক কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্রুত মামলাটির রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের লক্ষ্যেই তদন্তভার পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও যোগ করেন তিনি।

Share





Related News

Comments are Closed