Main Menu

ঘুরে এলাম রূপকথার রাজ্য: আলীর গুহা বা সুড়ঙ্গ

কবির হোসেন: ০৫ জুন ২০১৯, পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর এর সারাদিন কাটালাম বাড়িতে শুয়ে বসে। ব্যাগ মোটামুটি গুছানোই ছিলো। বাড়ির সবাই জানে আমি এক বন্ধুর সাথে বিকালে কক্সবাজার যাবো। কিন্তু সেটি ছিল মিথ্যার আশ্রয়। কাউকে সঙ্গি হিসেবে না পেয়ে ঐ দিন আমি একাই বেরিয়ে পড়ি কক্সবাজারের উদ্দ্যেশে। ঈদের তিন দিন আগে তিয়াম ট্রাভেলারের আলীর সুড়ঙ্গ অভিযান দেখার পর থেকে বান্দরবানের সেই গুহা দেখার ইচ্ছাটাও তীব্র ভাবে মাথা চারা দিয়েছে। প্রথমে উত্তরবঙ্গ থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাসে চেপে ঢাকা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে নামি।

তখন রাত দশটা। ঈদের কারণে একেবারে ফাঁকা রাস্তা, জীবনে সেটিই ছিলো প্রথম ফাঁকা রাস্তায় ঢাকা গমন। কিন্তু সায়েদাবাদে এসে দেখি মহা জনসমুদ্র। ঢাকার প্রত্যেকটা তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতি ও নানা বয়সি মানুষ ঈদের ছুটি কাটাতে কক্সবাজার, সিলেট ও বান্দরবানের টিকেট খুজছে। আমিও অনেক কষ্টে টিকিট জোগার করলাম। গন্তব্য আলীকদমের আলীর সুড়ঙ্গ।

আরব্য রূপকথা আলীবাবা চল্লিশ চোরের সেই গুহা অভিযানের থেকেও বেশি রোমাঞ্চিত হবেন এই সুড়ঙ্গে প্রবেশের মাধ্যমে। এখানে মূলত ৩টি গুহা রয়েছে। সবগুলা গুহা যদি ঘুরে দেখতে চান তাহলে আপনার ২ ঘন্টা সময় লেগে যাবে। গুহা ঘুরতে আপনাকে ঝিরি পথ দিয়ে চলতে হবে। ঝিরি থেকে গুহার মুখ উপরে অবস্থিত। প্রথম গুহা ঘুরতে আপনার বেশি সমস্যা হবেনা কারণ প্রথম গুহায় সিঁড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাকি গুহাগুলোতে পাহাড় বেয়ে আপনাকে উঠতে হবে। প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট রহস্যময় আলীর গুহা বা আলীর সুড়ঙ্গ বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় অবস্থিত। আলীর পাহাড় থেকে এর নাম করণ হয় আলীর সুড়ঙ্গ। আলীকদম সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মাতামুহুরী-টোয়াইন খাল ঘেঁষে দুই পাহাড়ের চুড়ার এই গুহা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। গুহার ভিতর পুরোটা অন্ধকার। ভিতরে যাওয়ার জন্যে আপনাকে টর্চ লাইট বা মশাল নিয়ে যেতে হবে। গুহার কিছু অংশ বেশ সরু, হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হবে। ভিতরে স্যাঁতস্যাঁতে গা ছমছমে পরিবেশ। প্রবেশ করার সাথে সাথেই এক অজানা জগতের সাথে পরিচিত হবেন। এই গুহা গুলোর ভিতর ছোট বড় অনেক বাদুর আছে। মানুষ দেখে বাদুর এদিক সেদিক উড়বে, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
১৭৫৬ সালে মুঘলরা আরাকান রাজ কং হ্লা প্রুকে আত্মসমর্পণ ও সপরিবারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে মুসলিম সভ্যতার বীজ শক্ত ভাবে রোপন করেন। যদিও আলিকদম এর পূর্বেই মুসলিম শাষণের আওতায় এসেছিল। আরকানি ভাষায় অনেক পাহাড় ও জায়গার নামে ডং, থং বা দং উপসর্গ জুড়ে আছে। সম্ভবত ডং মানেই পাহাড়। তাই ধারণা করা হয়, তাজিংডং ও কেউক্রাডং পাহাড়ের মতোই আলোহক্যডং একটি পাহাড়ের নাম, যা কালক্রমে আলীকদম নাম নিয়েছে।

পার্বত্য আলীকদম উপজেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে আলীকদম প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক মমতাজ উদ্দিন আহমদ তার ‘গিরিনন্দিনী আলীকদম’ বইয়ে আলীর সুড়ঙ্গ নিয়ে একটি চমৎকার রূপকথা রয়েছে। রুপকথাটি এই রকম- লোকালয় থেকে মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী আলীর পাহাড়ে একদল কাঠুরিয়া জীবিকার সন্ধানে কাঠ, বাঁশ আহরণে যায়। প্রতিদিনের মতো পরিশ্রমি কাঠুরিয়ার দল নদীর ঢালুর পাড়ে নির্মিত এক চালা ঝুপড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছিল। সে সময় একজন ঝটাধারী লোক হঠাৎ তাদের সামনে আভির্ভূত হলে কাঠুরিয়াগণ ভীত-বিহ্বল হন। কাঠুরিয়ারা লোকটির প্রতি তেড়ে যায়। তখন লোকটি অপরাধীর ন্যায় করুণভাবে হাত জোড় করে বলে উঠে, আমাকে মেরো না। আমি কোনো জ্বিন, ভূত, পাগল বা দস্যু নই। আমি এক বিপন্ন, হতভাগ্য লোক। আমাকে আশ্রয় দাও। লোকটির করুণ মিনতিতে কাঠুরিয়াদের দয়া হলো। তাকে আশ্রয় দিয়ে তার আদ্যোপান্ত জানতে চাইলো। তখন লোকটি তাদের কাছে যে কাহিনীটি বর্ণণা করলো তার সংক্ষিপ্তি রূপ এই: লোকটি বলল, সেই অনেকদিন আগে আমরা তোমাদের মতো একদল কাঠুরিয়া আলীর সুড়ঙ্গ সংলগ্ন স্থানে বাঁশ কাঠতে এসেছিলাম। একদিন সবাই গভীর অরণ্যে বাঁশ কাটতে যাই। এ সময় আমি সঙ্গীদের থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই কোত্থেকে আদিম এক রূপসী কন্যা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। তার পরণে ছিল গাছের পত্রপল্লব। আমার সঙ্গী সাথীরা অনেক খোঁজাখুজির পর আমাকে না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেলো। তারা মনে করলো, আমি কোন হিংস্র জীবজন্তুর শিকারে পরিণত হয়েছি। সঙ্গীদের খোঁজাখোঁজি আমি লক্ষ্য করলাম কিন্তু আওয়াজ করার মতো শক্তি তখন আমার ছিলনা। পরে ঐ রূপসী কন্যা আমাকে নিয়ে আলীর সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লো। লোকটি আরো জানাল, আলীর পাহাড়ে সুড়ঙ্গ রয়েছে পর পর তিনটি। আমাকে নিয়ে ঐ রূপসী সুড়ঙ্গের তৃতীয়টিতে প্রবেশ করলো। সে থেকে আমি অন্ধকারে বন্ধি হলাম। আমার মনে হয় মহিলাটির উদ্দেশ্য ছিল আমাকে তার সঙ্গী করা। বাস্তবেও ঘটেছিল তাই। মাঝে মধ্যে ঐ রূপসী শ্বেতকায়ার বিশাল দেহী ইয়া লম্বা মহিলায় রূপ নিত। তার অবয়ব হয়ে যেত অদ্ভুত আকৃতির। তার পরণে থাকতো পশুর চামড়া। পাখির পলক ছাড়া কোনো অলংকার ছিলনা। আগুনের ব্যবহার জানতো না। পশু পাখির গোশত ও ফলমুল খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ক্ষুধার জ্বালায় আমিও আস্তে আস্তে সে সব খেতে বাধ্য হলাম। মহিলাটি আমাকে সুড়ঙ্গে রেখে গহীন অরণ্যে একাকী ঘুরে বেড়াতো। শিকারে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সে গুহা মুখে একটি বড় পাথর চাপা দিয়ে রাখতো। যাতে আমি সুড়ঙ্গ থেকে কোনো মতেই বেড় হতে না পারি। দিন যায়, মাস যায় এভাবে বছর পার হয়। ক্রমান্বয়ে মহিলাটি আমার সাথে ভাব জমাতে শুরু করে। সৌহার্দ্য সম্প্রীতি ও ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যমে আমরা একে অপরের কাছাকাছি আসতে থাকি। কখন দিন রাত হয় গুহার মধ্য থেকে আমি কিছুই জানতে পারতাম না। তিমির সুড়ঙ্গের বন্দিজীবন আমার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠলো। তারপর মহিলাটি তার মানস কামনা চরিতার্থ করতে আমাকে কাছে টানতে থাকে। আমিও তার ভয়ে সবকিছু করতে বাধ্য হতাম। এক পর্যায়ে আমাদের অভিসারের ফলে মহিলাটির গর্ভে সন্তান আসে। যথারীতি মহিলাটি একটি ফুটফুটে সন্তান প্রসব করে। ডাইনিটি তখন মনে করলো আমি তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে গেছি। কিন্তু আদৌ তার প্রতি আমার আসক্তি ছিলনা। আমরা একে অপরের ভাষা বুঝতাম না। ইশারা ইঙ্গিতে আমাদের কথাবার্তা হতো। একদিন ডাইনি শিকারে যাওয়ার সময় গুহামুখে পাথর চাপা দিয়ে যায়নি। এতে করে বাহির থেকে সূর্যের আলোর ঝলকানি ছিদ্র পথে গুহার ভিতর প্রবেশ করে। তখন আমি এই সুযোগটি গ্রহণ করি এবং গুহা থেকে বেরিয়ে আসি। বাইরে এসে এই মায়াময় পৃথিবীর আকাশ, হৃদয় দোলানো বাতাস আমার অস্তিত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। প্রকৃতির কোলাহল মনকে দোলা দিতে থাকে। সুন্দর পৃথিবীর অতীত স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে উঠে। ডাইনীর কথা মনে পড়তেই আমি সেখান থেকে এইতো পালিয়ে তোমাদের সামনে এলাম! তাদের সেই পারস্পরিক আলাপচারিতার শেষ হতে না হতেই হঠাৎ ডাইনী মহিলা তার শিশুকে বুকে জড়িয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। সকলে হতভম্ব ও দিকভ্রান্ত হলো। তখন ডাইনী রক্তচক্ষে পালিয়ে আসা লোকটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তর্জন গর্জন করতে থাকে। সেখানে দাড়িয়ে ডাইনী অনেক্ষণ অরণ্যরোদন করলো। তার সেই কান্নায় বিরহের সুর ফুটে উঠে। একপর্যায়ে তার আচরণে হিংস্ররতা প্রকাশ পায়। তখন দুর্বোধ্য ভাষায় কুলের শিশুকে কি যেনো বলতে চাইলো। অত:পর বাচ্চাটির দু‘পা ধরে টান দিয়ে আকস্মিক দ্বিখণ্ডিত করে ফেললো। এর এক খণ্ড তার প্রণয়ী লোকটির প্রতি নিক্ষেপ করলো অপর খণ্ড ডাইনী মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে গহীন অরণ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো। সে হতে সভ্য জগতের কোনো লোকচক্ষুর সামনে ডাইনিটি দৃশ্যমান হয়নি।

আলীর গুহায় যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বান্দরবান জেলার আলীকদম আসতে হবে। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা হয়ে আলীকদম অথবা বান্দরবান শহর থেকে থানচি-আলীকদম রোড দিয়ে আলীকদম আসতে পারবেন। তবে চকরিয়া হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক ও সময় সাশ্রয়ী। বর্তমানে ঢাকা থেকে শ্যামলি ও হানিফ বাস সরাসরি আলীকদমে চলাচল করে। ঢাকা থেকে আলীকদম বাস ভাড়া ৮৫০ টাকা। ঢাকা থেকে গেলে সরাসরি আলীকদম গেলেই ভালো। এতে হাতে অনেক সময় থাকে এবং যাওয়ার ঝামেলা কমে যাবে। এছাড়া চকরিয়া হয়েও আলীকদম যাওয়া যায়। কক্সবাজারগামী যে কোন বাসে যাওয়া যাবে চকরিয়া। ঢাকা থেকে চকরিয়া বাস ভাড়া শ্রেণিভেদে ৭৫০ থেকে ১৫০০ টাকা। যাবার সময় বাসের সুপারভাইজারকে চকরিয়া বাজারে নামিয়ে দিতে বললে আপনাকে নামিয়ে দিবে। চকরিয়া নেমে সেখানকার নতুন বাস টার্মিনাল থেকে আলীকদম যাবার লোকাল বাস পাওয়া যায়। বাস প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ থেকে সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত আলীকদমের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অথবা লোকাল চান্দের গাড়িতে করে কিংবা একসাথে অনেকজন থাকলে চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে আলীকদম যেতে পারবেন। চকরিয়া থেকে আলীকদম চাঁদের গাড়িতে অর্থাৎ জীপে আসতে পারবেন। লোকাল ভাড়া জন প্রতি ৬৫ টাকা। রিজার্ভ ভাড়া এক পথ ১২০০-১৫০০ টাকার মত (দামাদামি করতে হবে)। বাসে গেলে দুই ঘণ্টা আর চাঁদের গাড়িতে গেলে ৩০ মিনিট বা ৪০ মিনিট কম লাগবে।

আলীকদম থেকে প্রথমে মংচুপ্রু পাড়ায় যেতে হবে। হেঁটে বা ইজিবাইকে করে যাওয়া যাবে এই ৩ কিলোমিটাড় এর মত পথ। এই পাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে টোয়াইন খাল। টোয়াইন খাল পার হয়ে বেশ কিছুক্ষণ পাহাড় ও ঝিরি পথে হেঁটে আলীর সুড়ঙ্গ যেতে হবে। মংচুপ্রু পাড়া থেকে প্রথম আলীর গুহার কাছে যেতে ২০-৩০ মিনিটের মত সময় লাগবে। সব গুলো গুহা দেখতে চাইলে আলীকদম থেকে যাওয়া আসা ও দেখা মিলিয়ে ৩ ঘন্টার মত সময় লাগবে।

আলীকদমে চাইলে থাকতেও পারবেন। এখানে কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেলগুলোতে অবস্থান করে আলীকদমের আশে-পাশের অনেক এডভেঞ্চারপূর্ণ ও দর্শনীয় স্থান দেখে নিতে পারেন। তবে আমরা যেখানেই যাইনা কেন, যত নিভৃত্ত্বেই যাই। অসচেতন ভ্রমণার্থীদের আচরণে কষ্ঠ পাই। চিপসের প্যাকেট কিংবা প্লাস্টিকের বোতল ফেলে চলে আসে অনায়াসেই। আসুন আমরা ঘুরতে গিয়ে অমানবিক না হই।

লেখক: কবি ও গল্পকার
kabirhossain02021998@gmail.com

0Shares





Related News

Comments are Closed