৪৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যান শিক্ষক!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্কুলের চাকরির কারণে পরিবার থেকে দূরে থাকেন মিশা ঘোষাল। ভারতের এই নারী প্রতিদিন তিনটি নদী, অনেক ছোট বড় ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ৪৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করতেন। তার সেই অদম্য কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। চলতি বছর ভারতের জাতীয় শিক্ষকের মর্যাদার পুরস্কার পেয়েছেন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে। খবর বিবিসির।
দুই বছর আগে ভুটানের তাদিং পাহাদের কোলে একটি ভারতীয় গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব নিয়ে নতুন চাকরি শুরু করেন। গ্রামের নাম টোটোপাড়া। আদিম, অতি ক্ষুদ্র উপজাতি টোটোদের বাসভূমি। গ্রামটার উত্তরে ভুটান সীমান্ত, দক্ষিণে একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য বিখ্যাত জলদাপাড়া অভয়ারণ্য, অন্যদিকে তোর্ষা নদী।
জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের মূল আকর্ষণ একশৃঙ্গ গণ্ডার যেমন এক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি, তেমনই এই টোটোরাও। গোটা জনজাতির বেশিরভাগ মানুষই দুরারোগ্য থ্যালাসেমিয়া বহন করেন, তাই এদের গড় আয়ু ৩৫ থেকে ৪০ বছর।
সংখ্যায় কমতে কমতে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখা গিয়েছিল মাত্র ৩২১ জন টোটো জীবিত আছেন। তাদের সংরক্ষণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেয়ার পরে এখন সংখ্যাটা বেড়ে হয়েছে প্রায় দুই হাজার।
সেই সময়ে স্কুলের যিনি সম্পাদক ছিলেন, ভাগীরথ টোটো, তিনি নতুন প্রধান শিক্ষিকাকে হাতজোড় করে বলেছিলেন, ‘এখানে এসে কেউই বেশিদিন থাকতে চান না, তাই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও ঠিকমতো হয় না। আপনি যেন ছেড়ে চলে যাবেন না।’
সেই থেকে ওই প্রধান শিক্ষিকা সেই গ্রামের স্কুলেই রয়ে গেছেন, আবার সেখান থেকেই সরাসরি পৌঁছে গেছেন দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতির সামনে। শনিবার ওই প্রধান শিক্ষিকা, মিশা ঘোষালকে ভারতের রাষ্ট্রপতি সম্মানিত করেছেন জাতীয় শিক্ষক হিসাবে।
প্রতিবছর ৫ই সেপ্টেম্বর ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, জনপ্রিয় শিক্ষক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কোন শিক্ষককে জাতীয় শিক্ষকের সম্মান দেয়া হয়।
এবছর পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুই জনসহ যে ৪৭ জন ওই সম্মান পেয়েছেন, তাদেরই একজন মিশা ঘোষাল – প্রত্যন্ত গ্রাম টোটোপাড়ার ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। করোনা মহামারির জেরে এবছর জাতীয় শিক্ষক সম্মাননা ভার্চুয়াল পরিবেশে দেয়া হয়েছে।
ওই সম্মান নিয়ে বাড়ি ফিরে রাতে মিশা ঘোষাল বলেন, ‘ওই যে সেক্রেটারি মশায় হাতজোড় করে বলেছিলেন, যে ছেড়ে চলে যাবেন না যেন, তারপর এখানেই থেকে গেলাম। গত ১২ বছর পরিবার থেকে দূরে থেকে অসম্ভব কষ্ট করে যাতায়াত করে যতদূর সম্ভব চেষ্টা করেছি টোটো ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনাটা ভাল লাগাতে। নানা রকমভাবে শিক্ষা দেয়ার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছি। হয়তো তারই স্বীকৃতি পেলাম আজ। ভার্চুয়ালি হলেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাকে নমস্কার করছেন, আমি প্রতি-নমস্কার করছি- কী যে অনুভূতি বলে বোঝাতে পারব না।’
ছেলে, স্বামী থাকেন শিলিগুড়ি শহরে। তিনি বহুদূরের মাদারিহাটে থাকতেন একা। বাড়ি থেকে স্কুলে পৌঁছতে তাকে পেরতে হয় তিনটে নদী, আরও অনেক ছোট বড় ঝোড়া আর ঘন জঙ্গল। বছর খানেক টোটোপাড়ার রাস্তাতেই একটা বাড়িই করে ফেলেছেন।
তিনি জানান, ‘মাদারিহাট থেকে স্কুলে আসতে ২২ কিলোমিটার পথ পেরোতে হত। মাঝে নদী, নালা, জঙ্গল কী না আছে। একটা নদী ভীষণ খরস্রোতা। জল কমার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয়। একবার তো নদী পেরতে গিয়ে প্রায় ভেসে যাচ্ছিলাম। একটি ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে না ধরে রাখলে ভেসেই যেতাম। কখনও আবার ব্যাগ, চটি ভেসে গেছে। কিছুদিন আগে বড় একটা দুর্ঘটনাতেও পড়েছিলাম। গাড়িতে নদীর শুকনো খাত পেরতে গিয়ে গাড়িই উল্টে গেল। নয়টা সেলাই পড়ল।’
জঙ্গলের রাস্তা পার হতে গিয়ে পড়েছেন হাতির পালের সামনে বা কখনও চোখে পড়েছে চিতাবাঘ। এতকিছুর পর হাসিমুখে মিশা ঘোষাল জানান, ‘এত কিছুর পরেও ওসব আর কষ্ট বলে মনে হয় না। আবার আমি যে চেষ্টা করছি ওদের শিক্ষার মানটা বাড়াতে, সেটা বুঝে ছাত্রছাত্রীরাও আমাকে অসম্ভব ভালবাসে। তবে ছাত্রীদের সঙ্গে একটু বেশীই খাতির আমার।’
যে বছর মিশা ঘোষাল ওই স্কুলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সে বছর একজন মাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করতে পেরেছিল। আর যে বার তিনি জাতীয় শিক্ষকের সম্মান পেলেন, সে বছর পাশের হার হয়েছে ৮০ শতাংশ। ২০-২১ জনের মধ্যে ১৭ জন মাধ্যমিক পাশ করেছে এবছর।
মিশা ঘোষাল বলেন, ‘ওরা তো এমনিতেই পড়াশোনায় কিছুটা পিছিয়ে, তাই আমি চেষ্টা করি ওদের প্রথাগত পড়াশোনা ছাড়াও নানা ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে ওদের বিকাশ ঘটাতে। কেউ হয়তো অঙ্ক বা বিজ্ঞানে কাঁচা, তাদের অন্যভাবে পড়াশোনার দিকে আকৃষ্ট করতে থাকি, না হলে পিছিয়ে পড়তে পড়তে হয়তো পড়াশোনাটাই ছেড়ে দেবে। এখন হয়তো পাশ করছে অনেকে, কিন্তু আমার লক্ষ্য শিক্ষার মান উন্নত করা। এবছর থেকেই উচ্চমাধ্যমিক বিভাগও চালু করা হল।’
ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেলামেশা করতে করতে টোটোদের সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে গেছেন তিনি। টোটোদের সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত চর্চা করেন আদতে গণিতের এই শিক্ষিকা। তিনি জানান, ‘ওদের গানগুলো কী সুন্দর। টোটো ভাষায় লিপি নেই, আমি ওদের কাছ থেকে শুনে বাংলাতেই লিখে নিই। স্কুলের অনুষ্ঠানেও আমি ওদের গান গাই। আবার ওদের যে ট্র্যাডিশনাল পোশাক, সেগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই জিনস পড়ে আজকাল। আমি ঠিক করেছি ওদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের যেসব জিনিষ, সেগুলোর জন্য স্কুলেই একটা ঘরে সংগ্রহশালা বানাবো। জাতীয় শিক্ষকের সম্মান পাওয়ার পরে প্রশাসনও সহায়তা করবে বলেই মনে হচ্ছে। শুধু স্কুলের জন্য নয়, একটা দুটো সেতুও শুনছি বানিয়ে দেবে সরকার।’
Related News
হঠাৎ সৌদিতে জরুরি সতর্কতা জারি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করার প্রেক্ষাপটে সীমান্তবর্তী আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত ওRead More
পশ্চিমবঙ্গে একসঙ্গে ২৫২ মাদরাসা বন্ধের নির্দেশ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পর্যালোচনা চালানোর অংশ হিসেবে ২৫২টি মাদরাসা বন্ধের নোটিশ দিয়েছেRead More



Comments are Closed