নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলাকারীর যাবজ্জীবন দন্ড
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত বছরের সালের ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দু’টি মসজিদে বর্বরোচিত হামলার দায়ে অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেন্টন টারান্টকে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন স্থানীয় আদালত। দেশটির ইতিহাসে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন দন্ড দেয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। এক্ষেত্রে তার প্যারোলেরও সুযোগ নেই। আরও ৪০ জনকে হত্যা চেষ্টাসহ তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিচারক ক্যামেরন ম্যান্ডার বলেন, ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান ব্রেন্টনের অপরাধগুলো এতটাই বিদ্বেষপূর্ণ যে কারাগারে আজীবন তাকে এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
ব্রেন্টনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার কাজটি ছিল খুবই অমানবিক, আপনি বাবার পা জড়িয়ে থাকা একটি তিন বছরের শিশুকেও ইচ্ছাকৃতভাবে মাথায় গুলি করে হত্যা করেছেন।’
বৃহস্পতিবার বিচারক ব্রেন্টন ট্যারান্ট-এর সাজা ঘোষণার সময় হামলায় বেঁচে যাওয়া এবং ভুক্তভোগীদের স্বজনরা আদালতে তার সামনেই উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত মার্চ মাসে ক্রাইস্টচার্চের দু’টি মসজিদে হামলা চালিয়ে ৫১ জনকে হত্যা, ৪০ জনকে হত্যার চেষ্টা এবং সন্ত্রাসী হামলার একটি অভিযোগ স্বীকার করে নেন টারান্ট।
চলতি সপ্তাহে টানা চারদিন ধরে হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী পরিবারের কয়েক ডজন সদস্য আদালতের শুনানিতে অংশ নেন। তাদের সবাই হত্যাকারী টারান্টের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
আদালতের বিচারক টারান্টের কর্মকাণ্ডকে ‘পাশবিক’ বলে মন্তব্য করেন এবং এমন জঘন্য অপরাধের শাস্তিতে কোনও ধরনের দয়া দেখানো হয়নি বলে জানান।
শুনানির শেষ দিন আদালতে পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত তিলাওয়াত করা হয় এবং ভুক্তভোগী ও তাদের প্রিয়জনদের ছবি প্রদর্শন করা হয়। তবে রায় ঘোষণার আগপর্যন্ত আদালতে কোনও কথা না বলার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন ব্রেন্টন টারান্ট।
যা ঘটেছিল সেদিন
২০১৯-এর ১৫ মার্চ শুক্রবার। অন্যান্য সপ্তাহের মতো জুমার নামাজ আদায়ে ব্যস্ত নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানরা। ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল নুর ও লিনউড মসজিদে হামলা চালান ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক ব্রেন্টন ট্যারান্ট। মসজিদ দু’টিতে জুমার নামাজের সময় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি করে হত্যাযজ্ঞ চালান তিনি।
এতেই থেমে থাকেনি ব্রেন্টন, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানোর দৃশ্য ফেসবুক লাইভে ১৭ মিনিট ধরে সরাসরি সম্প্রচারও করেন তিনি।
সেদিনের ক্রাইস্টচার্চে অবস্থান করা বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
মুসল্লিদের মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকেন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী টারান্ট। এ হামলায় বাংলাদেশিসহ ৫১ জন নিহত ও ৪০ জন আহত হন। এমন নৃশংস হামলায় নিউজিল্যান্ডসহ হতবাক হয়ে যায় সারাবিশ্বের মানুষ।
কেন এই হামলা?
ব্রেন্টনের ভেতরে আগে থেকেই ছিল বর্ণবাদ, অন্ধত্ব ৷ নিজের ভেতরে বাড়তে থাকা বিদ্বেষের সাথে এমন হামলার কারণ ইশতেহারে জানিয়ে দেন তিনি।
তবে হামলাকারী কোনো চরমপন্থি সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার খবর মেলেনি ৷ কিন্তু তার ইশতেহার থেকে পুলিশ ধারণা করে যে একাধিক বর্ণবাদী, ইহুদিবিদ্বেষী ও ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিদের দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন৷
অভিবাসীদের বহিরাগত ভাবা এই যুবকের বন্দুকের গায়ে হিটলারের স্লোগান লেখা ছিল।
২৮ বছর বয়সী এ অস্ট্রেলিয়ান যুবকের অভিবাসী ও মুসলিমদের প্রতি বিরূপ মনোভাব ছিল। তার ফেলে যাওয়া ৭৪ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ইশতেহারে বারবার সে শ্বেতবর্ণ মানুষদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছে, অর্থাৎ ‘শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ’। মূলত এই ধারণা বা মতাদর্শ থেকেই হামলা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
হামলায় নিহতদের পরিচয়:
শান্তিতে জীবনযাপন করতে নিউজিল্যান্ডকেই বেছে নিয়েছিলেন হতাহতরা। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, সিরিয়া, মিসর, জর্ডান, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও সোমালিয়ার নাগরিক রয়েছেন তাদের মধ্যে।
নিহতের তালিকায় ২ শিশু ও ২ কিশোর রয়েছে। তারা হলো- মুকাদ ইব্রাহীম (৩), আবদুল্লাহ দিরিয়া (৪), সায়দ মিলনে (১৪) ও হামজা (১৬)।
হামলায় আরো যারা প্রাণ হারান – ওসামা আদনান আবু কাইক (৩৭), মহসিন আল হারবি (৬৩), জিহান রাজা (৩৮), লিন্ডা আর্মস্ট্রং (৬৫), কামাল দারিশ (৩৯), মাহবুব খন্দকার (৬৫), খালেদ মুস্তফা (৪৫), ড. হারুন মাহমুদ (৪০), মোহাম্মদ আবদুস সামাদ (৬৬), নাঈম রশিদ ও তার ছেলে তালহা (২১), হুসনে আরা পারভিন (৪২), আলি ইলমাদানী (৬৬), তরিক রহমান (২৪), সৈয়দ জাহানদাদ আলি (৪৩), মনির সোলায়মান (৬৮) ওজায়ের কাদের (২৪), মোহাম্মদ ইমরান খান (৪৭), আমাদ জামালুদ্দিন আবদুল গনি (৬৮), সৈয়দ আরীব আহমেদ (২৬). মাতুল্লাহ সাফি (৬৫), হুসাইন মোস্তফা (৭০), রমিজ ভোরা (২৮), লিলিক আবদুল হামিদ (৫৮), হাজি দাউদ নবী (৭১), ফরহাজ আহসান (৩০), মোহাম্মদ আলি ভোরা (৫৮), মোজাম্মেল হক (৩০), গোলাম হুসেইন ( ৬০), আত্তা ইলায়ান (৩৩), করম বিবি (৬০), হুসেইন আল উমারি (৩৬), মুসা ওয়ালি সুলেমান প্যাটেল (৬০), মোহাম্মদ ওমর ফারুক (৩৬), আবদেল ফাত্তাহ কাসেম (৬০), জুনায়েদ ইসমাইল (৩৬) এবং আশরাফ আলী (৬১)। এদের মধ্যে পাঁচ বাংলাদেশিও তার বর্বরতা থেকে রক্ষা পাননি।
Related News
অনলাইনে গুজব-মিথ্যা তথ্য, ব্যবস্থা নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যRead More
মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকRead More



Comments are Closed