Main Menu

মায়ের সাথে মা দিবস

পুলকরঞ্জন চৌধুরী: ‘মায়ের মত আপন কেহ নাই’ এই গান বা কথা শুনেনি এমন কেউ নেই। সেই মায়ের প্রতি ভালোবাসা সন্তানের প্রতিদিনের। শাশ^ত চিরসত্য এই ভালোবাসা। তাই সামাজিক যোগাযোগের কল্যাণে খুব সহজেই চোখে পড়ে বিশ্বময় মায়েদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে গুণমুগ্ধ শত-কোটি সন্তানেরা। হ্যাঁ একটি নির্দিষ্ট দিন মা আরও একটি দিন বাবা কিংবা প্রিয়জনের জন্য উদ্যাপন করা যেতেই পারে। মনে হয় সে দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন সর্বপ্রথম মা দিবসকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে।

১৯০৫ সালে মাকে ভালোবাসা ও সম্মান জানাতে প্রবর্তন করা হয় মাদার্স ডে। তারও অনেক অনেক আগে প্রাচীন গ্রিসে প্রতি বসন্তের একটি দিনে দেবতাদের মা ‘রিয়া’-কে উদ্দেশ্য করে পালিত হতো মা দিবস। ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেসে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস ঘোষণা করা হয়।

এবারে মা দিবস ১২ মে মায়ের সাথে বিশেষভাবে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেই আমরা দিবসের দুপুরে। জ্যেষ্ঠ ভাই দীপকরঞ্জন চৌধুরী সে সময় ব্যাংকের কাজে কর্মস্থল সুনামগঞ্জ এবং আমার ছোট ভাই চমকপদ চৌধুরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের মাসিক সমন্বয় সভায় সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ব্যস্ত। এ অবস্থায়ও কাজ শেষে সিলেটে মায়ের কাছে আসতে তাদের আগ্রহ অনেক বেশি। যদিও মাত্র দুই দিন পূর্বে ১০ মে মা-সহ আমরা সিলেট হতে একসাথে শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর বাড়ী ঢাকাদক্ষিণ, গোলাপগঞ্জ ঘুরে এলাম। গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপ আমাদের আনন্দ ম্লান করতে পারেনি। সেদিনও দাবু (দীপক চৌধুরী) এবং চমক সুনামগঞ্জ থেকে এসে যুক্ত হয়েছিলেন।

যাক মা দিবস উদযাপনের ইচ্ছায় আমাদের কনিষ্ট ভাই চয়ন চৌধুরী অন্য বোন-ভাগ্নিদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। সেদিন সন্ধ্যার পর মাকে নিয়ে ডাক্তারের নিকট সাক্ষাতের তারিখ ছিল পূর্ব নির্ধারিত। চয়ন ও আমি মাকে নিয়ে ডাক্তার দেখানোর পর প্যাথলজি টেস্টগুলো দিয়ে যখন বাসায় ফিরি তখন রাত প্রায় নয়টা। চমক ইতোমধ্যে সিলেট পৌঁছে গেছে। কিন্তু দাবু এক করুণ ঘটনায় সুনামগঞ্জ আটকা পড়েন। তাঁর এক সহকর্মির মেয়ের (ডাক্তার) অনাকাঙ্খিত মৃত্যুতে অন্ত্যষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিতির জন্যে। অন্যদিকে সেদিনই বড় বোন দিপালী চৌধুরী বৈশাখী ফসল তোলা শেষে সিলেট তাঁদের বাসায় আসেন। মেজবোন কৃষ্ণা চৌধুরী সিলেটই থাকেন কন্যা এবং জামাতাসহ। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ব্যানার, ফুল, কেক এবং রাতের খাবারের আয়োজন চয়ন সম্পন্ন করে। এদিকে চমক বাসায় আসার পথে কিছু ফুল নিয়ে এসেছিল। সিলেট উপস্থিত তিন জা যথাক্রমে শেফু দত্ত, ঝুম্পা চৌধুরী ও মালবিকা চৌধুরী তাদের বাচ্চারাসহ তৈরি হলো। বোনের দিকের সকল উপস্থিত হলেন। বাসায় পরিবেশ গম গম হয়ে উঠলো।

ড্রয়িং রুমে সাদা কেক সামনে রেখে মাকে বসানো হলো। আমরা সকল তাঁর পাশে। মা-সহ চার প্রজন্মের মিলন! দেখা গেল উপস্থিতির মধ্যে চার মাকে তাদের সন্তানেরা ভালোবাসা জানালো। রাত বারোটা গড়িয়ে গেল যেন দ্রত। আমরা খাওয়ায় মনযোগি হওয়ার আগে মাকে ঘুমাতে পাঠালাম। আমাদের মধ্যে আনন্দের রেশ তখনও শেষ হয়নি।

সব শেষে বলি দ্রত পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় সব ভালোবাসা যেন তার স্বাভাবিক রূপ হারাতে বসেছে। শাশ্বত সম্পর্কও যেন ক্রম ঝুঁকির দিকে। জানি আমার মধ্যেও তা সমভাবে বিরাজিত। বাস্তবতাকে স্বীকার করি। যৌথ পরিবারের ভাবনা বিলুপ্ত প্রায়। সেতো অনেক কাহিনী। মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা সম্মানটুকু অকৃত্রিম ও অটুট থাকুক এই প্রার্থনা করি।
আমি জানি ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও মা-বাবার সান্নিধ্য থেকে যারা বঞ্চিত তারা নিজেদের মা-বাবাকে দেখার জন্য এবং প্রাণভরে ডাকার জন্য কি-ই না আকুতির মধ্যে থাকেন। এ আকুতি ভাষায় ব্যক্ত করা দুরহ। আমাদের প্রিয় বোনটি (চম্পা চৌধুরী) আমেরিকা হতে এ অনুষ্ঠানের জন্য হায়-আফসোস করবে জানি। এরকম তো লক্ষ-কোটি সন্তান মা-বাবার দূরত্বে দেশে-বিদেশে আছে। নিজ বা সন্তানের জীবনের নিশ্চয়তা এবং বিত্ত-বৈভবতার মধ্যেও প্রাণের প্রশান্তির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তবে আমার বোনটি সৌভাগ্যবতী যে সদ্যগত মা দিবসের দশ দিন পর সে আমেরিকাতেই মাকে পাচ্ছে। অপেক্ষায় রইলাম সেই শুভ দিনের।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোয়াইনঘাট সরকারি কলেজ, সিলেট।

Share





Related News

Comments are Closed