Main Menu

বিশ্বনাথে বাসিয়া নদী খননের নামে চলছে চরভরাট

মো. আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ প্রতিনিধি : সিলেটের বিশ্বনাথে বাসিয়া নদী খননের নামে হচ্ছে চরভরাট। আলোচিত বাসিয়া নদীর বাজার এলাকায় দখলদারদের বিল্ডিংয়ের পেছনে নদী খননের নামে চরভরাট করে তৈরী করা হচ্ছে বিল্ডিংয়ের ভিটা। দখল উচ্ছেদ করে নদীর চর উদ্ধার করাতো দুরের কথা উল্টো তাদেরকে সুবিধা করে দেয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

ভবিষ্যতে চাইলে ওই ভরাট অংশে দখলদাররা তাদের বিল্ডিংয়ের পেছনে আরও স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবেন এমনটাই মনে করছেন লোকজন। নদী খননের নামে এমন চরভরাট কাজ দেখে উপজেলার জনসাধারনের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। নদীর তলদেশের খননকৃত মাটি দিয়ে তীর ভরাট কাজ দেখে উপজেলার জনসাধারনের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। এইভাবে খনন কাজ সম্পন্ন করা হলে খননকৃত মাটি নদীর তীর থেকে যদি অন্যত্র সরানো না হয় তাহলে এই খনন হবে অর্থহীন এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হবে, তাতে জনগণ কোন উপকার পাবে না এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল।

জানা গেছে, উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা ছিলো বাসিয়া নদীর চর দখলমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে তার নাব্যতা ফিরয়ে আনা। অবশেষে টেন্ডার হয়ে ১৬ সালের শেষের দিকে নদী খনন কাজ শুরু করা হয়। তবে সেই খনন কাজটি উপজেলাবাসীর প্রত্যাশানুযায়ি করা হচ্ছেনা।

বাজার এলাকার বাহিরে শুধু নদী চরের ঘাস পরিস্কার করে লোক দেখানো খনন কাজ করা হয়েছে। বর্তমানে সেই খননকৃত অংশটুকু কোনো উপকারে আসছেনা। গত শনিবার বিকেলে নদীর বাজার এলাকায় দখলকৃত অংশে একটি ভাসমান খনন মেশিন পানিতে নামানো হয়। দখলকৃত এই অংশে ২৭ জানুয়ারী রোববার সকাল থেকে নদীর উপরের ঢব নির্ধারণ না করে দখলদারদের বিল্ডিংয়ের পেছনে মনগড়া খনন কাজ শুরু করে ওই ভাসমান মেশিনটি। এতে দেখা যায় দখলদারদের বিল্ডিংয়ের পেছনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট চর অবশিষ্ট রেখে নদীর নিচ থেকে নামমাত্র মাটি উত্তোলন করে দখলদারদের বিল্ডিংয়ের পেছনের অংশটুকু ভরাট করে দিচ্ছে।

‘বাঁচাও বাসিয়া নদী ঐক্য পরিষদের’ আহবায়ক ফজল খান বলেন, মনে হচ্ছে রক্ষকরাই বক্ষক হয়ে গেছেন। অবৈধ দখল উচ্ছেদতো দুরের কথা উল্টো তাদের বিল্ডিংয়ের পেছন ভরাট করে দেয়া হচ্ছে। এতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে খনন কাজের ঠিকাদার অবৈধ দখলদারদের সুবিধা করে দিচ্ছে।

তিনি বলেন উপজেলা সদরে বাসিয়া নদীর দু’তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা বহাল রেখেই নদীর পুনঃখনন কাজ করা হচ্ছে। পুনঃখননের নামে ভরাট করা হচ্ছে নদীর তীর। নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করাতো দূরের কথা এখন উল্টো তাদের (দখলদার) বিল্ডিংয়ের পেছন ভরাট করে দেয়া হচ্ছে।

জানা যায়, সিলেট সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার নামক স্থানে ‘সুরমা নদী’ থেকে বাসিয়া নদীর উৎপত্তি হয়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার খাইকা নামক স্থানে ‘কুশিয়ারা নদীতে’ গিয়ে শেষ হয়েছে। বাসিয়া নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ কিলোমিটার ও প্রস্থ প্রায় ৩০ মিটার। এই নদীটি এক সময় প্রচন্ড খড়স্রোতা ছিল। কালের বির্বতনে পাহাড়ি ঢল ও পলি মিশ্রিত বন্যার পানিতে ভরাট হতে থাকে বাসিয়ার তলদেশ। বিশেষ করে বিশ্বনাথ বাজার এলাকায় নদীতে বর্জ্য ফেলে ভরাট করে দেয়া হয়েছে নদীর স্বাভাবিক গতি পথ। সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দস্যুতা দখল করে নিয়েছে নদীর দুই তীর। গড়ে তুলেছে শত শত অবৈধ স্থাপনা। উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছে করে নদী পুনঃখনের দাবি করে আসছেন। উপজেলাবাসীর প্রত্যাশা ছিলো বাসিয়া নদীর তীর দখলমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা ফিরয়ে আনা হবে। ২০১৪ সালে ৪টি প্রকল্পে সিলেট সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার থেকে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর পর্যন্ত বাসিয়া নদীর ১৮ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ সম্পন্ন করা হলেও অদৃশ্য কারণে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর এলাকায় প্রায় ৩শত মিটার নদী খনন না করেই কাজ সম্পন্ন করা হয়। এরপর ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাষ্ট ফান্ডের অর্থায়নে আরো ৭ কিলোমিটার ‘বাসিয়া নদী পুনঃখনন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের কার্যক্রম গ্রহণ করে সিলেটের পানি উন্নয়ন বোর্ড। তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের গেটের সামন থেকে ৭ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে এই খনন কাজ করার কথা। নদীর উত্তর তীর হতে দক্ষিণ তীরে ফিতা দিয়ে মেপে ৩৩মিটার (১শত ৯ফুট) সীমানা নির্ধারণ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মকর্তারা। সীমানা নির্ধারণ করে অনেক গড়িমশির পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিকে কালিগঞ্জবাজার এলাকা থেকে নদী খনন কাজ শুরু করা হয়। কিন্ত ২কিলোমিটার খনন কাজ করার পর বৃষ্টির পানি নদীতে আসায় খনন কাজটি বন্ধ রাখে ঠিকাদারি প্রতিষ্টান। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে আবারো অবশিষ্ট অংশ খনন করা হয়। কিন্ত তখনও খনন করা হয়নি বিশ্বনাথ উপজেলা সদরের ৩শত মিটার নদী। ইতিমধ্যে বিশ্বনাথে বাসিয়া নদীর দুই তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৮৬জন দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ মামলা করা হয়। পরবর্তিতে দখলদারদের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হলে আদালত ৬মাসের জন্য মামলাটি স্থগিত করেন। বর্তমানের মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা যায়। চলমান মামলা নিস্পত্তির মাধ্যমে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে দু’তীরে গড়ে উঠা সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদী পুনঃখনন কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিতে বাঁচাও বাসিয়া ঐক্য পরিষদ নামে একটি সামজিক সংগঠন আন্দোলন চালিয়ে আসছে। কিন্ত মামলা নিম্পত্তি না হওয়ায় অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ ও সীমানা নির্ধারণ না করেই গত রোববার থেকে ভ্রাম্যমান এস্কেভেটর (এসিবিএন) মেশিনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ওই ৩শত মিটার নদী পুনঃখনন কাজ।

তবে খনন কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সাধন এন্টারপ্রাইজ’র ঠিকাদার বাদল সরকার জানিয়েছেন- নদীর নীচের অংশে ৯ মিটার প্রস্থ অনুসারে খনন করা হবে দেড় মিটার। নীচের খননের সাথে স্লোপ করে মিলানো হবে টব। তবে টব কতটুকু হবে তার নির্ধারণ নেই। ডিজাইন অনুযায়ীই খনন করা হবে।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফ আয়নাল বক্র জানিয়েছেন, নিয়মানুযায়ী নদীর পুনঃখনন কাজ চলছে। দুটি ধাপে খনন করা হবে। খনন কাজের সুবিধার্থে আপাতত তলদেশের খননকৃত মাটি তীরে রাখা হচ্ছে, তারপর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি বলেন- দীর্ঘ ৫ বছরেও নদীর এই অংশটির খনন কাজ হয়নি, তা আমরা শুরু করেছি। নদীকে বাঁচাতে হবে, এজন্য আমাদের সকলের সহযোগীতার প্রয়োজন। নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো যদি প্রশাসন উচ্ছেদ করে দিতেন তাহলে আমরা আরো সুন্দর পরিকল্পনা নিয়ে নদী খনন করতাম এবং দু’পাড়ে ওয়াকওয়ে তৈরী করতাম।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অমিতাভ পরাগ তালুকদার বলেন, নদীর অবশিষ্ট অংশে ফের পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে। নদীর তলদেশ থেকে ময়লা আবর্জনা আপাতত তীরে রাখা হচ্ছে। শীঘ্রই অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হবে। এনিয়ে একটি মহল গুজব ছড়ানোর চেষ্ঠা করছে। তিনি বলেন- চলমান উচ্ছেদ মামলায় আদালত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেই তাৎক্ষণিক অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে।

Share





Related News

Comments are Closed