ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে বউ-শাশুড়িকে খুন করে শুভ ও তালেব
ছনি চৌধুরী, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি: নবীগঞ্জ উপজেলার কুর্শি ইউনিয়নের লন্ডন প্রবাসী আখলাক চৌধুরীর মা মালা বেগম (৫০) ও তার স্ত্রী রুমি বেগম (২২) হত্যাকান্ডের ঘটনায় টানা ৩দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে হত্যাকান্ডের লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দিয়েছে শুভ ও তালেব।
বৃহস্পতিবার (১৭ মে) সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত হবিগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শম্পা জাহানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় জাকারিয়া আহমেদ শুভ ও আবু তালেব। স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি শেষে আদালতের নির্দেশে তাদেরকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে বিকেল সাড়ে ৫টায় হবিগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বিধান ভ্রিপুরা জানান, আখলাক চৌধুরীর স্ত্রী রুমিকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে ঘরে প্রবেশ করে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যাকান্ড ঘটায় সাদুল্লাপুর গ্রামের বখাটে শুভ ও তালেব। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার সূত্রপাত ১১মে শুক্রবার থেকে। ওইদিন লন্ডন প্রবাসী রুমির স্বামী আখলাক চৌধুরী তার বন্ধু রিপন সুত্রধরকে রুমির মোবাইল ফোনের জন্য কাভার কিনে পৌঁছে দিতে বলেন। পরে মোবাইল কাভার কিনে রিপন ব্যস্ত থাকায় তার ছোট ভাই জয় সুত্রধরকে দিয়ে রুমির মোবাইল কাভার পাঠায়। জয় মোবাইল কাভার রুমির কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে শুভ’র সঙ্গে দেখা হয়, তখন শুভও তাদের বাড়িতে যাবে বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলে দুজন মিলে রুমির বাড়িতে যায়। তখন শুভ ঘরের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং জয় ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে রুমিকে মোবাইলের কাভার দেখায়, তখন রুমির কাভার পছন্দ না হওয়ায় কাভার ফেরত দিয়ে দেয়। কাভার নিয়ে যাওয়ার দিনই প্রথম পরিচয় হয় ফুরুক মিয়ার কাজের ছেলে আবু তালেব এর সঙ্গে। শুভ জানতে পারে রুমিদের বাড়িতে অপরিচিত কেউ গেলে গেট খুলে দেয়া হয় না। পাশের ফুরুক চৌধুরীর বাড়িতে কমর্রত কাজের ছেলে তালেব মিয়া মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে গিয়ে কাজ করে। ১২ মে শনিবার শুভ তালেব মিয়ার সঙ্গে দেখা করে তাকে একটি দোকানে অাপ্যায়ন করে এবং মোবাইলে থাকা পর্নোগ্রাফি দেখায় এবং তালেবকে তার নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা করে। পরে শুভ তালেবকে লন্ডন প্রবাসী আখলাক চৌধুরীর স্ত্রী রুমি বেগমের ছবি দেখায়। পরে তারা রবিবার (১৩ মে) মালা বেগমকে ছুরি দেখিয়ে হাত পা বেধে ফেলবে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণ করার পরিকল্পনা করে । পূর্ব পরিকল্পনা মতে রবিবার রাত অনুমানিক সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে শুভ ও তালেব ছুরি নিয়ে আখলাক চৌধুরীর বাড়িতে যায়। তালেব যেহেতু রুমি বেগম ও মালা বেগমের পরিচিত সে কারণে তালেব গিয়ে মালা বেগমকে (দাদী বলে) ডাক দেয়, তখন মালা বেগম কলাপসিবল গেইট খুলে দেন। তখন তালেব ঘরে প্রবেশ করে, আর তখনই শুভ পিছন পিছন প্রবেশ করলে তখন মালা বেগম তালেবকে জিজ্ঞাসা করেন এই ছেলেটি কে? তখনই তালেব প্রথমে মালা বেগমকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে পরে শুভ ও ফের মালা বেগমকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তখন মালা বেগম চিৎকার করে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন তালেব ও শুভ মালা বেগমের পিছু দৌড়ে যায় ঘরের দক্ষিণ পাশে একটি রুমে যাওয়ার পর তারা ওড়না দিয়ে মালা বেগমকে বেধে ফেলে। তখন শাশুড়ির চিৎকার শোনে পুত্রবধূ রুমি বেগম তার রুম থেকে বের হয়ে ঘটনাস্থলে আসলে শাশুড়িকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার দেয়া শুরু করলে শুভ রুমিকে ছুড়ি দিয়ে বুকে আঘাত করে। তখন রুমি বাঁচতে আত্মচিৎকার করে বাসার বাহিরে বের হয়ে বাড়ির উঠানে গিয়ে হুচট খেয়ে পড়ে যায়। তখন তালেব রুমিকে ছুরি দিয়ে শেষ আঘাত করে। এসময় রুমির চিৎকার শোনে পার্শ্ববর্তী চেয়ারম্যানের বাড়ির লোকজন এগিয়ে আসলে শুভ ও তালেব দুইদিকে পালিয়ে যায়। শুভ তার নানার বাসায় যাওয়ার পথিমধ্যে একটি খালে রক্তমাখা পোশাক গুলো খুলে তার নানার বাসার রুমে ঢুকে পড়ে এবং তালেব গোয়াল ঘরে গিয়ে তার পোশাক খুলে ফেলে। পুলিশ সুপার আরো বলেন বৃহস্পতিবার সকালে শুভ ও তালেবের দেয়া তথ্যমতে আমরা হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও পোশাক উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। পরে শুভ ও তালেব আদালতে হত্যাকান্ডে জড়িত রয়েছে উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দেয় । ওইদিন ধর্ষণের ঘটনায় শুভর আরেক বন্ধু অংশগ্রহণ করার কথা থাকলেও তার কাজ ছিল বিদায় সে আসেনি। সেটাও আমরা খতিয়ে দেখছি।
এসপি বিধান ত্রিপুরা আরও জানান, নবীগঞ্জ উপজেলার আমতৈল গ্রামের আমীর হোসেনের ছেলে তালেব হোসেন (২৪) রুমি বেগমের গ্রামের বাড়ির লোক হওয়ায় সহজেই তাদের বাড়িতে আসা যাওয়ার সুযোগ পায়। অপরদিকে জাকারিয়া চৌধুরী শুভ (২০) বানিয়াচং উপজেলার খাগাউড়া গ্রামের হাফিজুর রহমানের ছেলে। সে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নবীগঞ্জ হোমল্যান্ড আইডিয়াল স্কুলে লেখাপড়া করে এবং এলাকায় একজন বাখাটে হিসেবে পরিচিত। শুভ তার নানার বাড়িতে বসবাস করতো। তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করে ছোটবেলাতেই শুভকে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
এসপি বলেন, এই ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে পারিবারিক বিশৃঙ্খলা এবং অবাধ পর্নোগ্রাফি সমাজে অপরাধ সৃষ্টি করে। তিনি জানান, এত বড় ঘটনার পরও তালেব মিয়া এবং শুভ হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি এবং রক্তমাখা কাপড় ধুয়ে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে থাকে। দ্রত মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে বিচার কাজ শুরু হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে রাতে নবীগঞ্জের কুর্শি ইউনিয়নের সাদলাপুর গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে রুমী বেগম ও মালা বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর ১৫ মে এ ঘটনায় রুমি বেগমের ভাই পপ্লী চিকিৎসক নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে নবীগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে নবীগঞ্জ থানার ওসি তদন্ত হাবিবুর রহমানকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
Related News
হবিগঞ্জে আইফোন ছিনিয়ে নিতে বন্ধুকে হত্যার অভিযোগ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় আইফোন মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার লোভে বন্ধুকে গলা কেটে হত্যারRead More
হবিগঞ্জে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: হবিগঞ্জ শহরে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।Read More



Comments are Closed