Main Menu

রাজনগরের পাঁচগাঁও গণহত্যা দিবস আজ

রাজনগর (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা: মৌলভীবাজারের রাজনগরের পাঁচগাঁও গণহত্যা দিবস আজ রোববার। ১৯৭১ সালের এই দিনে ইতিহাসের নির্মম এক হত্যাকান্ড ঘটে রাজনগর উপজেলার পাচঁগাও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামে। স্থানীয় রাজাকার মৃত আলাউদ্দিন ও তার সহযোগীরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পাক হানাদার বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের বর্বরোচিত এ হত্যাকান্ড ঘটায়। পাক হানাদার বাহিনী নিরীহ ও অসহায় ৫৯ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্থানীয় সরকারবাজার দীঘিতে হাত পা বেঁধে ফেলে দেয়। পরে দীঘির পাড়ে তাদেরকে সমাধিস্থ করা হয়। এই গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে বধ্যভূমিতে সরকারিভাবে আজও নির্মাণ করা হয়নি কোন স্মৃতিস্তম্ভ।

১৯৮৫ সালে স্থানীয়রা চাঁদা তুলে নির্মাণ করেছিলেন একটি ছোট স্তম্ভ। যা দেখে বোঝার উপার নেই, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ দেয়া ৫৯ জন মানুষ সমাহিত আছেন এখানে। এ ছাড়া স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। যার কারণে স্থানীয় জনগণ নানা অজুহাতে গণকবরের জায়গা দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

রাজনগর উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত পাঁচগাঁও গ্রাম। ১৯৭১ সালের ৭ মে গ্রামে পাক সেনারা হানা দেয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুমন্ত মানুষকে তুলে এনে সরকারবাজার দীঘির পাড়ে লাইন ধরিয়ে গুলি করে নিরস্ত্র অসহায় ৫৯ জন কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধকে নির্মমভাবে হত্যা করে দীঘিতে ফেলে দেয়। হানাদার বাহিনী চলে যাওয়ার পর পানি থেকে লাশ তুলে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে নিহতদের চিতায় দাহ করার রীতি থাকলেও ভয়ে সেদিন শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারেননি স্বজনরা। পরে তাদের মৃতদেহ দীঘির পশ্চিমপাড়ে গণকরব দেন এলাকাবাসী।

সাধু শব্দকর, কটি শুক্ল বৈদ্য, চরিত্র শব্দকর ও সুবোধ মালাকারসহ কয়েকজন সেই হত্যাকান্ড থেকে ভাগ্যগুণে বেঁচে যান। তাদের মধ্যে অন্যরা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে মারা গেলেও সেদিনের ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী সুবোধ মালাকার (৮২) দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে আজো বেঁচে আছেন। সেই দিনের পৈশাচিক সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে সুবোধ মালাকার বলেন, সারিবদ্ধভাবে ২ জন করে বেঁধে দাঁড় করানো হয় দীঘির পাড়ে। যখন পাক বাহিনী গুলি চালায়, তখন একটি গুলি আমার কান ফুটো করে বেরিয়ে যায়। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমাকে মৃত ভেবে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে জ্ঞান ফিরলে দীঘির পানিতে ভাসমান কচুরিপানার ভেতরে আশ্রয় নেই। পাকিস্তানী বাহিনী চলে যাওয়ার পর আমিসহ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনি দুঃখ করে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কতো মন্ত্রী, এমপি ও সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিবরণ দিয়েছি। কেউ কি কিছু করেছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেছি, এখন আর বলে কোন কিছু হবে না। আমার সাথে যারা বেঁচে ছিল তারা সবাই মারা গেছে। কোন কিছু কি পাইছে ? আমিও আর কতদিন বাঁচবো জানি না,তবে এটুকু বলতে পারি বাকি জীবনে কোন কিছু দেখে যেতে পারবো না। চোখের সামনে অনেককে মরতে দেখা সুবোধ মালাকার গণকবরের স্থানটি প্রসঙ্গে বলেন, এই জায়গাতে যাদের মাটি চাপা দেয়া হয়েছে, সেখানে তাদের নামের তালিকা দেওয়া হলে নিজের আত্মা শান্তি পেত।

বিভিন্ন সময়ে সরকারের উর্ধতন কতৃপক্ষ গণকররের স্থানটি পরিদর্শন করলেও তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি স্থানটির। জায়গা কম বলে নানা অজুহাতে দায় সেরেছেন তারা।

রাজনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সজল কুমার বলেন, স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে ও আগামী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানাতে পাঁচগাঁওয়ের গণকবর এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানকে সংরক্ষণ করার স্বার্থে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার অনুরোধ করার পরও কোনো কাজ হয়নি। স্বাধীনতা ৪৭ বছরে পদার্পন করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শহীদদের স্মরণে এখানে গড়ে উঠেনি কোন স্মৃতি ভাস্কর। প্রশাসনিক এই জটিলতার কারণে পাঁচগাঁওয়ের গণকবর এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানটি রক্ষা করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, পাঁচগাঁও গণকবরের জায়গায় অবৈধ দখলদারদের কারণে সীমানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সমাহিত করে গণকবরের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে এখানে কোন কাজ করা যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই সীমানা নির্ধারণ করে সরকারি গণকবর হিসেবে সাইন বোর্ড লাগানো হবে বলে জানান তিনি।

Share





Related News

Comments are Closed