Main Menu

সিলেটে তারাপুর চা-বাগান গণহত্যা দিবস উদযাপন

বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: সিলেটের জেলা প্রশাসক মোঃ রাহাত আনোয়ার বলেন যে জাতি নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, সে জাতি স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় যেকোন ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির যতই ষড়যন্ত্র হোক মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের সকলের দায়িত্ব। একাত্তরে গণহত্যা যেসমস্ত স্থানে সংঘটিত হয়েছে, সেই সমস্ত স্থান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অংশ। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মৃতি সংরক্ষণ ও গণহত্যার স্থান সমূহ সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আশা ব্যক্ত করেন। তিনি তারাপুর চা-বাগানের গণহত্যার শিকার সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বারূপ করেন।
১৮ এপ্রিল মঙ্গলবার তারাপুর চা-বাগান গণহত্যা দিবস উপলক্ষে বাগানের শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ প্রাঙ্গনে আলোচনা সভা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি উপরোক্ত বক্তব্য রাখেন।
১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর তাদের দোসর রাজাকারদের সহায়তায় একাত্তরের এই দিনে তারাপুর ষ্টোর চা বাগান ও সিলেট ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই লি: প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা স্বত্ত¡াধিকারী বৈকুন্ট চন্দ্র গুপ্তের পরিবারের ৫জন সদস্য, বাগানের চিকিৎসক, স্টাফস্, শ্রমিক, প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক আরো ৩৯জন সদস্য সেদিন নির্মমভাবে প্রাণ হারান।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় তারাপুর চা-বাগান গণহত্যা দিবস উপলক্ষে প্রথমেই শহীদ স্মৃতি স্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সিলেটের জেলা প্রশাসক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সিলেট মহানগর ইউনিট কমান্ড, ডা: পংকজ গুপ্ত ও শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, মদনমোহন কলেজ অধ্যক্ষ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট, বাংলাদেশ উদীচি শিল্পীগোষ্ঠী, সিলেট জেলা সংসদ, খেলাঘর সিলেট জেলা শাখা সহ বাগানের চা-শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পরপরই স্মৃতি স্তম্ভ পার্শ্ববর্তী প্রাঙ্গনে আলোচনা সভা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তারাপুর চা-বাগানের সেবাইত ও শহীদ পরিবারের সদস্য ডা: পংকজ গুপ্ত। অনুষ্ঠানের শুরুতেই গণহত্যায় স্বীকার সকলের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সাধারণ সম্পাদক রজত কান্তি গুপ্তের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট মহানগর ইউনিট কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ রানা, ডেপুটি কমান্ডার আব্দুল খালিক, সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক বিজিৎ চৌধুরী, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ কংগ্রেজ বাদল কর, প্রবীণ সাংবাদিক জনাব বশির আহমেদ, সাংবাদিক সুকেশ চন্দ্র দেব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেটের সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ইলিয়াছুর রহমান।
এছাড়াও অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দেবজিৎ সিন্হা উপ-পরিচালক, স্থানীয় সরকার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট জেলা ইউনিট কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল, মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ইমজা সিলেটের সভাপতি আল-আজাদ, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের প্রধান পরিচালক অরিন্দম দত্ত চন্দন, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদর সিলেট মহানগর সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার দেব, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদ সিলেট জেলা শাখার সভাপতি ইন্দ্রানী সেন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে ১৮ এপ্রিল নির্মমভাবে নিহত শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে সম্মাননা স্মারক ম্যাডেল তুলে দেন সিলেটের জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ। মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথমবারের মত গতকাল মঙ্গলবার তারাপুর চা-বাগানের গণহত্যায় শহীদ পরিবারের সদস্যদের এক মঞ্চে এনে সম্মাননা প্রদানের আয়োজনে অনুষ্ঠানস্থলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিবারের আপনজন হারানো অনেকেই নীরবে নির্বৃত্তে চোখে জল মুছতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত শহীদ পরিবারের গণহত্যায় স্বীকার বাগানের চিকিৎসক ক্ষিতীশ চন্দ্র দে এর সহধর্মিনী ৯৪বৎসর বয়স্ক নিভা রানী দে চোখের জলে তাঁর স্বামীর পক্ষে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বাগানের চা-শ্রমিক, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক সহ বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

যা ঘটেছিলে সেদিন:
১৯৭১ সালে পাকহানাদার বাহিনীর তাদের দোসর রাজাকারদের সহায়তায় একাত্তরের এই দিনে তারাপুর ষ্টোর চা বাগান ও সিলেট ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই লিমিটেড প্রাক্তণ প্রতিষ্ঠাতা স্বত্ত্বাধিকারী বৈকুন্ট চন্দ্র গুপ্তের পরিবারের ৫জন সদস্য, বাগানের চিকিৎসক, স্টাফ, শ্রমিক, প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক আরো ৩৯জন সদস্য সেদিন নির্মমভাবে প্রাণ হারান।

বাগানের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ ব্যস্ত ছিলেন চা-বাগানের উত্তরাধিকারী গুপ্ত পরিবার। বেলা ১১টায় চা-বাগানের চারপাশ ঘিরে ফেলে পাকসেনা ও স্থানীয় রাজাকাররা, তখন কারফিউর মধ্যে কাজের জন্য আইডি কার্ড তৈরির কথা বলে রবীন্দ্রনাথ গুপ্ত, রাজেন্দ্র লাল গুপ্ত ও তাদের তিন সন্তান, চিকিৎসক, স্টাফসহ বাগানের ৩৯জন পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী মালনীছড়া চাবাগানের বাংলোর নিচে। সেখানে সবাইকে লাইন ধরিয়ে দাঁড় করে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে পালিয়ে আসা এক গুলিবিদ্ধ শ্রমিকের কাছ থেকে এই নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনা জানতে পারেন ডা.পংকজ গুপ্ত।

অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারা তারাপুর চা-বাগানের বৃহৎ এই গণহত্যায় স্বীকার নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করে সরকারের কাছে জাতীয় পর্যায়ে এই গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদানের জোর দাবী জানান।

Share





Related News

Comments are Closed