জাতিসত্তা : আমরা বাংলাদেশী
খলিলুর রহমান : জাতি বলতে ভাষা-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূলবোধের কোন এক ও একক স¤প্রদায়কে বুঝায়। এটা হচ্ছে জাতি শব্দের আভিধানিক পরিভাষা বা অর্থ। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে বাঙ্গালি, সিলটী,টিপরা, মনিপুরি, গারো, মিজো, তামিল, নগা, মারঠী, পাঞ্জাবী, বেলুচী, চাকমা, ষিন্ধী, পশতু, বাধাইয়া, খাসিয়া, লালং, উরাং, মিকির, কাছারী, কার্বিয়, বিহারি প্রভৃতি ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতি।
আমাদের বাংলাদেশেও এ ধরনের অনেক জাতিসত্তার বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে মূল ও আদিবাসীরা ভায়ায় ও বর্নে চাকমা। ময়সনসিংহ অঞ্চলের অনেকস্থানে গারোদের বসবাস, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ছিলটী’দের প্রধান্য থাকলেও এখানে নিজস্ব ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে বসবাসরত রয়েছে অনেক মনিপুরি, টিপরা, খাসিয়া ও উরাং স¤প্রদায়ের লোক।
সিলেট নগরীতে মনিপুরীদের রয়েছে উলেখযোগ্য অবস্থান এবং মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় মনিপুরী ও টিপরাদের বসবাস। সিলেট জেলার উত্তরা পূর্বাঞ্চলীয় গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট এলাকায় অনেক খাসিয়া ও মিকিরের বসবাস। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ভাষা সমাজ ও সংস্কৃতি ভিত্তিক বহু জাতিসত্তার একটি দেশ। যদিও দেশে বাংলা ভাষাভাষিরা সংখ্যাগরিষ্ট। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৭টি জেলার অর্থাৎ বৃটিশ শাসিত সাবেক পূর্ববাংলার ভাষা একমাত্র বাংলা। পার্বত্য তিন জেলার আদি ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ন পাহাড়ি বা চাকমা। সিলেট বিভাগের ৪ জেলার প্রধান ভাষা ‘ছিলটী’ এবং বর্ন ‘দেবনাগরী’। ছিলটের পুথি-সাহিত্যের ভাষা ও বর্ন সম্পূর্ন দেবনাগরী ।পার্বত্য এলাকায় আলাদা ভাষা আছে, পৃথক বর্ন আছে কি না জানা নেই। তবে ব্যক্তিজীবনে রোহিঙ্গা বর্নের কিছু ব্যহার পরিলক্ষিত হয়। মনিপুরীদের পারিবারিক, সামসাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাষা আলাদা । তবে তাদের পত্র পত্রিকা ও বই পুস্তক বাংলা বর্নেই প্রকাশ পায়।
বেসরকারী এক পরিসংখ্যান মতে দেশে বাংলা ভাষাভাষির সংখ্যা ৬০ ভাগ এবং অন্যান্য ভাষাভাষির সংখ্যা হবে ৪০ ভাগ। বালাদেশে ছাড়াও প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরায় কয়েক কোটি মানুষের বসবাস। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পূর্ন বাংলা এবং তারাও ভায়ায় বাঙ্গালী। আমাদের বাংলদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ায় সবাই বাংলা লিখতে ও পড়তে বাধ্য। তবে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। তাই ভাষা সমাজ ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল থেকে যেমন আমাদের দেশের সকলকে এককভাবে ‘বাঙ্গালী বা বঙ্গালী জাতি’ বলা দুষ্কর। তেমনি প্রতিবেশী দেশের বাংলাভাষী কোটি-কোটি মানুষকে অবাঙ্গালী বলাও যাবে না। বাঙ্গারী বলতে যেমন বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ বাঙ্গালী তেমনি ভারতের উলেখিত দুটি রাজ্যের (পশ্চিম বাংলা ও ত্রিপুরা) সকলেই বাঙ্গালী। তাই ‘বাঙ্গালী জাতি’ বলতে, যেমন দেশের ৬০ ভাগ মানুষকেই বুঝায়, বাদ পড়ে যায় ৪০ ভাগ মানুষ, তেমনি ‘বাঙ্গালী জাতি’ বলতে বাংলাদেশের বাইরের কোটি কোটি মানুষও এ জাতি’র অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তাই নির্দ্বিধায় বলতে হয় ভাষা সমাজ ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের সব মানুষ বাঙ্গালী নয়, সবার ভাষা ও জাতিসত্তা একক বাঙ্গালী নয়।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ভাষা সমাজ ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতিস^ত্তা বা জাতীয়তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে স্বীকৃত জাতিস^ত্তা বা জাতীয়তা সম্পূর্ন ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও দেশভিত্তিক। এখানে ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তার আদৌ কোন স্থান নেই। যেমন আমরা যখন আমাদের জীবন বৃত্তান্তে জাতীয়তার উলেখ করি, তখন বাঙ্গালী-ছিলটি-মনিপুরী, চাকমা ইত্যাদি না লিখে আমাদের লিখতে হয় বাংলাদেশী। আমাদের পাসপোর্টে লেখা হয়ে থাকে জাতীয়তা বাংলাদেশী। যেমন ইংল্যান্ডের নাগরিকরা ভাষা ও সংস্কৃতিতে ইংরেজ হলেও তাদের পরিচিতি কিন্তু ইংরেজ নয়, তাদের পরিচিতি ব্রিটিশ। সৌদী আরবের বাসিন্দারা ভাষা ও সংস্কৃতিতে খাটি আরবি হলেও তাদের পরিচিতি কিন্তু সৌদী। মিসর, ইয়েমন, সিরিয়া, ইরাক, কুয়েত, আমিরাত, লেবানন, ফিলিস্তীন, জর্ডান, বাহরাইন, ওমান, লিবিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, জেবুতি, মৌরেতানিয়া প্রভৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার সবক’টি দেশের মানুষের ভাষা বর্ন ও সংস্কৃতি আরবি হলেও তাদের পরিচয় আরবি নয়। তারা ইয়েমনী,ওমানী, লিবীয়, মিসরী, আলজেরীয়, মৌরতানীয়,নাইজেরীয়, আলজেরীয়, মারাকিশ (মাগরিবী), উর্দুনী, লবনানী, সিরিীয়, ইরাকী, ফিলিস্তীনী, বাহরাইনী, আমিরাতি, কুয়েতী প্রভৃতি। ইসরাইলের ভাষা হিব্র“ হলেও তাদের পরিচয় হিব্র“ নয়, তাদের পরিচয় ইসরাইলী। ইংল্যান্ড ছাড়াও ইউরোপের কয়েকটি দেশের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি ইংলিশ হলেও তাদের জাতীয় পরিচয় দেশভিত্তিক। আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড,গ্রীনল্যান্ড প্রভৃতি দেশের ভাষা ইংরেজী হলেও তারা ইংরেজ নয়, তাদের জাতীয় পরিচয় আইরিশ, নেদরল্যন্ডি প্রভৃুতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি কযেকটি রাষ্ট্রের রাস্ট্রীয় ও নাগরিক ভাষা ইংরেজী হলেও তাদের পরিচয় ইংরেজ নয়, পরিচয় মার্কিন, কানাডীয় ও অষ্ট্রেলীয়। মোট কথা ভাষা ও সংর্স্কতি ভিত্তিক জাতীয়তা আজকের দুনিয়ায় সম্পূর্ন অচল। এটা সামাজিক ও আঞ্চলিক পরিমন্ডলে সীমাবদ্ধ। তাই ভাষা সংস্কৃতি, ধর্ম ও বর্ন নির্বিশেষে আমরা সবাই বাংলাদেশী এবং সারা দুনিয়ায় আমাদের পরিচিতি ও স্বীকৃত জাতিসত্তা ‘আমরা বাংলাদেশী’।
Related News
বাংলাদেশে হামের বিস্তার: কেন হচ্ছে, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিরোধের উপায়
মো: ছালিম আহমদ খান: বাংলাদেশে চলতি বছর হামের সংক্রমণ নতুন করে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগRead More
আবির্ভাব ও বিলুপ্তির অন্তরালে
হক মোঃ ইমদাদুল: কোনো কিছু হারিয়ে যাওয়ার আগে তার কোনো শব্দ হয় না। একসময় চিঠিRead More



Comments are Closed