বিনা মজুরীতে সড়কে মাটি ভরাট করছে এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান
হাবিব সরোয়ার আজাদ, সুনামগঞ্জ থেকে: সুনামগঞ্জের শিল্পনগরী ও প্রবাসী অধ্যুষিত ছাতক উপজেলায় স্বেচ্ছায় বিনা মজুরীতে বিভিন্ন সড়কে মাটি ভরাটের কাজ করছে এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। বিগত এক বছর ধরেই ভাঙা সড়ক দেখলেই যান চলাচলে দূর্ঘটনার আংশকা কমাতে কাঁধে কোদাল আর হাতে খলই (উড়া) নিয়ে প্রত্যহ সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে না খেয়ে বেরিয়ে পড়ে মাটি ভরাটের কাজে ওই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।
স্বেচ্ছাশ্রমী ওই যুবকের নাম সুমন মিয়া (২২)। সে উপজেলার ছৈলা আফজলাবাদ ইউনিয়নের বাগইন গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মৌরশ আলীর ছেলে।
জানা গেছে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া জাতীর বীর সন্তানদের ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রেখেই গণমানুষের দূর্ভোগ লাগবে দীর্ঘ একবছর ধরে ওই যুবক বিনা পয়সায় স্বেচ্ছাশ্রমে সড়কে মাটি ভরাটের কাজ করে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে, উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ ট্রলারঘাট-বিনন্দপুর সড়কের শ্যামনগর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রজব উদ্দিনের বাড়ি সংলগ্ন পাকা সড়কের পার্শ্বে মাটি ভরাটের কাজ করতে দেখা গেছে ওই যুবককে। সড়কের উভয় পার্শ্বে মাটি না থাকায় অনেক সময় সিএনজি অটোরিকশা, অটো-টেম্পু ও অন্যান্য যানবাহন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে বেশ কিছু দূর্ঘটনা ঘটেছে । বড় দূর্ঘটনার এ আশঙ্কায় সুমন গত এক মাসেরও অধিক সময় ধরে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই সড়কে একা একাই মাটি ভরাটের কাজ করে যাচ্ছে। মাটি ভরাট ও সড়ক সংস্কারের বিনিময়ে কেউ কিছু দেয়ার চেষ্টা করলেও সে তা নিচ্ছে না, এমনকি খাবার দিলেও নিচ্ছে না ওই যুবক।
কুদালের সাহায্যে মাটি কেটে একা একা টুকরি মাথায় বহন করে সড়কের দু’পার্শ্বে বিরামহীন ভাবে মাটি ভরাটের কাজ করে যাচ্ছে যুবকটি। পাকা সড়কের পাশাপাশি গ্রাামীণ কাঁচা সড়কেও সমানতালে কাজ চলছে তার। বর্ষা মৌসুমে জন চলাচলের রাস্তায় সাঁকো, বন-জঙ্গল পরিস্কার করে দিয়েই জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় তার এ ব্যক্তি উদ্যোগ ইতিমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। সড়কে চলাচলরত সিএনজি অটোরিকশা চালক আবদুল্লাহ্ আল-আমিন, নুরুর নিকট থেকে এমন উদ্যোমী যুবককের সামাজিক কর্মকান্ডের কথা শুনে সরেজমিনে গিয়ে সুমনের সাথে আলাপকালে সে জানায়, ৭১’ সালে মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেয়া নিয়ে জাতীর প্রয়াত ও জীবিত বীর সন্তানদের ত্যাগের কথা চিন্তা করেই গত একবছর ধরে বিভিন্ন জনচলাচলের সড়কে ও গ্রামীণ কাঁচা সড়ক সংস্কারের জন্য ইচ্ছে করেই মাটি ভরাট, বর্ষায় সাঁকো তৈরী ও বনজঙ্গল পরিক্ষার করে আসছি। বিনিময়ে কোন কিছু কারো নিকট থেকে প্রত্যাশা করেন কি না জানতে চাইলে সুমনের সাফ কথা যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে জীবন উৎস্বর্ঘ করেছিলো কিংবা যারা পঙ্গু হয়েছে অথবা যারা জীবিত রয়েছেন সেই সব শ্রেষ্ট সন্তানরা যেমন মাতৃভুমির টানে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন আমিও তাদের উত্তরসুরী হিসাবে তাদের ত্যাগের মুল্যায়ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিনিময়ে জনপ্রতিনিধি, এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি কিংবা সরকারের কাছে কিছুই চাইন না।
স্থানীয় লোকজন জানান, সুমনের নিজ গ্রামের পূব বাগইন কাঁচা সড়ক থেকে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে এক বছর ধরে বিরামহীন ভাবে লাকেশ্বর বাজার থেকে বুরাইয়া গ্রাম, সোনালী বাংলাবাজার থেকে লাকেশ্বর, বসন্তপুর, বানারশিপুর, ছৈলাগাঁও, কহল্লা, বাউভোগলী, বড়চাল, শরিষপুর, বড় ও ছোট পলিরগাঁও, খলাগাঁও সহ ছৈলা আফজলাবাদ ইউনিয়নের অসংখ্য পাকাঁ ও গ্রামীণ সড়কে মাটি ভরাটের কাজ করেছে সুমন একাই। সর্বশেষ সুমন গত নভেম্বর মাসের শেষের দিকে শুরু করে বিজয়ের এ মাসেও গড়ে ৩৫ দিনের অধিক সময় ধরে গোবিন্দগঞ্জ ট্রলারঘাট থেকে বিনন্দপুর পাকা সড়কে দু’পার্শ্বে মাটি ভরাটের কাজ করে আসছে।
সুমন জানায়, প্রথমে সড়কে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করলে মালুম নামের এক ব্যক্তি বাঁধা দিয়ে বলেছিলেন এসব মাটি ভরাটের কাজ চেয়ারম্যান, মেম্বার, এমপি-মন্ত্রীদের, তাই কাজ বন্ধ করতে বার বার তিনি বারণ করেছিলেন। কিন্তু ধমেনি সুমন মাত্র ২শ’ টাকায় একটি টুকরি ও ৬শ’ টাকা দিয়ে একটি কুদাল ক্রয় করে একাই শুরু করে মাটি ভরাটের কাজ।
সিএনজি অটোরিকসা চালক রিহাব, জসীম, শুকুর আলী বলেন, সুমন ৩৫দিনে একা একা যে কাজ করেছে তা ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকার কাজ হবে।
উপজেলার ছৈলা আফজলাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গয়াছ আহমদ বলেন, শিল্পনগরী ও প্রবাসী অধ্যুষিত অত্র উপজেলায় দৈনিক ৪ থেকে ৫শ টাকা ছাড়া কোন দিনমজুর পাওয়া যায়না, সেখানে একবছরেরও বেশি সময় ধরে সুমন বসন্তপুর সড়ক সহ ইউনিয়নের সব ক’টি জন চলাচলের কাঁচা-পাকা সড়কে স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি ভরাটের কাজ করে যাচ্ছে, তার এ মহতি কাজ থেকে আমাদের মত জনপ্রতিনিধিদের অনেক কিছু শেখার আছে বলে আমি মনে করি। তিনি আরো বলেন আমি বিভিন্ন সময় তাকে কিছু দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সুমন কোন কিছু নিতে আগ্রহী না।’ বীর মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন লালা বলেন, মহান বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের এমন কর্ম নিশ্চয় আমাদের ত্যাগকে গর্বিত করেছে।
Related News
পাখির কলকাকলিতে মুখর নাজিরপাড়া, ১৫ বছর ধরে অতিথিদের মিলনমেলা
মো. সফিকুল আলম দোলন, জেলা প্রতিনিধি,পঞ্চগড়: ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পাখিদের কিচিরমিচির। গাছের ডালেRead More
ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন ৮শ বছরের পুরাতন সেতু
শাহ মনসুর আলী নোমান, লন্ডন থেকে: ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টির উইকলার (Wycoller )গ্রামেRead More



Comments are Closed