Main Menu

পটকা কেনো এতো বিষাক্ত

নিজাম উদ্দীন সালেহ: পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যুর খবর মাঝে মাঝে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে দেখা যায়। আগে এ ধরনের বিষাক্ত পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে। গত ক’বছর ধরে এ ধরণের ঘটনা কমে এসেছে। হয়তো মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পটকা মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকছেন লোকজন। গত মঙ্গলবার (৬ ডিসেম্বর) জৈন্তায় বিষাক্ত মাছ খেয়ে যে ৬ ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা যেমন মর্মান্তিক তেমনি বিস্ময়কর। ২০০২ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২৩ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

জানা যায়, পটকা বা পাফার ফীস, যা জাপানে ফুগো মাছ হিসেবে পরিচিত একটি জলজ মাছ। এ মাছে রয়েছে ক্ষতিকারক টিটিএস বা টেট্রোডোটোক্সিন বিষ। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় এই পটকা মাছ খেয়ে একই পরিবারের ২ শিশুসহ ৪ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। দেখা গেছে এই মাছ খাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারা সবাই মাছের যকৃত বা কলজে রান্না করে খেয়েছিলেন।

আর বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী পটকা মাছের দেহের যে ক’টি নির্দিষ্ট অঙ্গ প্রত্যঙ্গে সবচেয়ে বেশি বিষ থাকে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই লিভার বা যকৃত। তাদের মতে, পটকা মাছের বিষ সায়ানাইডের চেয়ে ১২০০ গুণ বেশী মারাত্মক। অবশ্য এই মাছ সব সময় ও সবক্ষেত্রে বিষাক্ত হয় না। তাই অত্যন্ত স্বাদের কারণে এবং সব সময় এ মাছ বিষাক্ত না হওয়ায় অনেকে ঝুঁকি নিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকে।

জাপানের হোটেল রেস্তোরাঁয় পটকা বা ফুগো মাছের অনেক কদর। দামও অত্যন্ত চড়া। এসব হোটেল রেস্তোরাঁয় উচ্চ বেতনে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শেফ বা বাবুর্চি রাখা হয় ফুগো মাছ কেটে তা থেকে সতর্কতার সাথে বিষাক্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে বের করার জন্য। কারণ তাদের সামান্য ভুলে ফুগো মাছ ভক্ষণকারীর মৃত্যু ঘটতে পারে। বাংলাদেশের নদী ও উপকূলে সবচেয়ে বেশী যে পটকা মাছের প্রজাতিটি পাওয়া যায়, তার বৈজ্ঞানিক নাম টেট্রাওডেন কাটকুশিয়া, ইংরেজিতে অক্সিলেটেড পাফার ফীস বলা হয়। এর দেহ অনেকটা গোলাকার ফুলো ফুলো, মাথা চওড়া। মাছের দৈর্ঘ্য সচরাচর ৫ থেকে ৯ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

তবে বিল ও নদীতে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যরে পটকা মাছও পাওয়া যায়। উপরিতল থেকে সামান্য নীচে মুখ, উভয় মাড়িতে দু’টি ছেদন দন্ত রয়েছে। এই ৪টি দাঁতের কারণেই এর বৈজ্ঞানিক নামে ‘টেট্রাডন’ শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নদী হাওর বিল ও বঙ্গোপসাগরে ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির পটকা মাছ পাওয়া যায়। তবে বেশী পাওয়া যায় টেট্রাওডোন কাটকুশিয়া প্রজাতির পটকা মাছ। এ মাছকে স্থানীয়ভাবে টেপা বা ফোটকা মাছও বলা হয়। সাধারণত: প্রজনন ঋতুতে বা বর্ষাকালে এ মাছটি অধিক মাত্রায় বিষাক্ত হয়ে পড়ে। তবে অন্যান্য সময়েও মাছটি কমবেশী বিষাক্ত থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে বিষাক্ত পটকা মাছ খেলে কিছুক্ষণ পর বিষক্রিয়ায় বমি হতে পারে বা বমি বমি ভাব হতে পারে। হতে পারে তলপেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া।

শরীর অসাড় হয়ে হাত পায়ের পেশী দুর্বল হয়ে নিস্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। তখন শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা সৃষ্টি হয়ে দম বন্ধ হয়ে রোগী মারা যেতে পারে। জনৈক বিশেষজ্ঞের মতে, মাছের বিষাক্ত প্রত্যঙ্গ না ফেলে মাছটি খেলে মানবদেহের নিউরন মাসল কানেকভিটি অর্থাৎ নিউরন পেশীর যোগাযোগ ক্ষমতা বিনষ্ট বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। অবশ্য টিটিএস বিষ ব্রেনে যেতে পারে না। তা সত্বেও এটা মুখমন্ডলের নার্ভ বা স্নায়ুগুলো এবং নার্ভ নিয়ন্ত্রণকারী বক্ষ ডায়াফ্রামের উপর ক্রিয়া করে, যার ফলে রোগীর শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন পটকা মাছ খেয়ে অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত বমি করানোর ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শরীর থেকে বিষ বেরিয়ে আসে। তাকে প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে। চেষ্টা করতে হবে সজ্ঞান রাখার কারণ জ্ঞান হারালে মস্তিস্ক তার প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। এক্ষেত্রে কাঠ কয়লার গুঁড়ো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ্য হিসেবে স্বীকৃত। সর্বোপরি, পটকা মাছ খেয়ে অসুস্থ ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালের ইমার্জেন্সীতে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে এবং বলতে হবে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখতে। এ পর্যন্ত নিউরোটক্সিনের কোন ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়নি, তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে। বাদ দিতে হবে পটকা মাছ খাওয়া।

লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক জালালাবাদ।

Share





Related News

Comments are Closed