সুনামগঞ্জে চোর অপবাদে যুবকের আত্নহত্যা: পরিবারের দাবি হত্যা
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাদাঘাটে চাল পড়া ও নির্যাতন করে চোর শনাক্ত করতে গিয়ে সদ্য বিবাহিত এক যুবককে হত্যার পর মুখে বিষ ঢেলে ওই যুবক নিজেই আত্বহত্যা করেছে বলে অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
তবে নিহতের পিতার দাবি তার ছেলে বিষপান করেনি, তাকে যুবলীগ নেতা ও বণিক সমিতির সাধারন সম্পাদক মাসুক ও তার লোকজন নির্যাতন করে খুন করার পর বিষপানে আত্বহত্যা করেছে বলে খুনের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা করছে।
বুধবার রাতে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসার পুর্বেই ওই যুবক মুত্যুবরণ করেছে বলে কর্তব্যরত মেডিক্যাল অফিসার জানিয়েছেন।
নিহত ওই যুবকের নাম মানিক মিয়া (২০)। সে তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের বারহাল গ্রামের ছাত্তার মিয়ার ছেলে ও স্থানীয় বাজারের পান দোকানদার। মুত্যুর মাত্র দুই মাস পূর্বে মানিক বিয়ে করেন। এদিকে হাতের মেহেদীর রঙ মুছতে না মুছতেই ওই নববধু বিধবার কাপড় পড়তে হল।
এ ঘটনায় গোটা জেলা জুড়ে নিন্দার পাশাপাশি দায়িদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়ার দাবী উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বাদাঘাটে মেইনরোডে দিঘিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা শফিকুলের সুতা ও মসলার দোকানের ক্যাশ বাক্স ভেঙ্গে একদল চোর মঙ্গলবার রাতে ৭০ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শফিকুল তার অপর সহযোগী মোল্লাপাড়া গ্রামের জুবায়েরের সহযোগীতায় বুধবার চোর শনাক্ত করার জন্য কথিত এক নারী কবিরাজের নিকট থেকে চাল পড়া নিয়ে আসে।
এরপর চোর সন্দেহে রাত সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার ভেতর শফিকুলের দোকানের সামনে পান দোকান নিয়ে বসা হতদরিদ্র পরিবারের মানিক, গাড়ি চালক, হোটেল কর্মচারী ও তার নিজের দোকানের কর্মচারীকে চাল মুখে দিয়ে ভাঙ্গতে দেয়।
তবে মানিক চাল পড়া ভাঙ্গতে না পারায় শফিকুল ও তার সহযোগীরা বাজারের শতাধিক ব্যবসায়ীর উপস্থিতিতে তাকে চোর বলে চিহ্নিত করেন।
এরপর সালিশ বৈঠকে বাজারের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুক মিয়া, তার ভাগ্নে মনসুর, মাহবুব আলম, তার শ্যালক আজহারুল ইসলাম সোহাগ সহ তার লোকজন এসে মানিককে চুরির টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ দেন। এছাড়া টাকা উদ্ধারের জন্য মাসুক ও তার লোকজন মানিককে বণিক সমিতির কার্যালয়ে নিয়ে যাবার কথা বলে রাতে কাপড় পট্রিতে নিয়ে গিয়ে তাদের নিজস্ব ঘরের ভেতর নিয়ে দরজা বন্ধ করে নির্যাতনও করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, বণিক সমিতির অফিসের কথা বলে কাপড় পট্রির দিকে নিয়ে গিয়ে কোন এক দোকানের পেছনের একটি ঘরের ভেতর দরজা বন্ধ করে মানিকের নিকট থেকে টাকা উদ্ধারে মানসিক চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি তাকে মারধর করা হয়। পরবর্তীতে চোর অপবাদ দিয়ে মানিকের পান দোকান বন্ধ করে দেয়া হয়।
এদিকে শারীরিক নির্যাতন করার পর অবস্থা বেগতিক দেখে চুরির অপবাদ সইতে না পেরে রাতেই মানিক বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় বলে নির্যাতনকারী ও শালিসীগণ অপপ্রচার চালায়। মানিককে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে তাকে জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার আগেই মানিক অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
মানিককে চুরির অপবাদ দেয়া ব্যবসায়ী শফিকুল বুধবার রাতে জানান, মানিক সহ কয়েকজনকে চোর সন্দেহে চাল পড়া খাওয়ানো হলে মানিক চাল ভাঙ্গতে না পারায় তাকে টাকা চোর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে আরো জানায় সালিশের এক পর্যায়ে বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ তার সাথে থাকা বেশ কয়েকজন টাকা উদ্ধারের জন্য মানিকের সাথে আলাপ করলে একদিন পর মানিক তা জানানোর কথা বলে বাড়ি চলে যায়।
নির্যাতনের কথা অস্বীকার করে উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন আহবায়ক বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুক মিয়া বলেন, আমি সালিশের শেষ পর্যায়ে লোকজনের ভীড় দেখে ওখানে গিয়ে লোকজনকে সরিয়ে দিয়েছি। আমি মানিককে টাকার জন্য কোনো চাপও দেইনি।
বণিক সমিতির সভাপতি সেলিম হায়দার বলেন, বিচারে যাবার আগে মাসুক আমায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম চাল পড়া দিয়ে চোর শনাক্তকরণের বিচারে না যাওয়ার জন্য, পরে জেনেছি চোর সন্দেহে মানিককে মাসুক ও তার সাথে থাকা লোকজন কাপড়পট্রির দিকে নিয়ে গেছে।”
এদিকে অন্যায়ভাবে ছেলেকে চোর অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করে মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে খুন করার পর ছেলেকে আত্বহননকারী সাজানোর চেষ্টা করেছে বলে নিহতের পিতা ছাক্তার মিয়া অভিযোগ তুলেছেন। ছেলেকে নির্যাতন করে খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, আমার ছেলে নিরপরাধ। তাকে মাসুক, শফিুকল, মনসুর, মাহবুব, মাসুকের শ্যালক সোহাগ ও তাদের লোকজন জোর করেই চোর বানিয়েছে। আর আমার ছেলে নিজে বিষপান করেনি, তাকে নির্যাতন করে খুন করার পর বিষ খাইয়ে আত্বহত্যা করেছে বলে খুনের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে । আমি আইনশৃংখলা বাহিনী ও সরকার প্রধানের নিকট এ ঘটনার ন্যায় বিচার চাই।
সদর মডেল থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) রিপন চন্দ্র গোপ বৃহস্পতিবার বলেন, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরী করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করি। এটা তাহিরপুর থানায় মামলা দায়ের করবেন বলে নিহতের স্বজনরা লাশ সমঝে নিয়ে গেছেন।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ময়নাতদন্তকারী মেডিক্যাল অফিসার ডা.মনিরুজ্জামান বৃহস্পতিবার বলেন, মূলত হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই মানিক মারা গেছেন, বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১টার দিকে মানিকের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে, ভিসেরা রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে আপাতত কোন কিছু বলতে তিনি অনিহা প্রকাশ করেন।
চাল পড়া দিয়ে চোর চিহ্নিত করার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাহিরপুর থানার ওসি শ্রী নন্দন কান্তি ধর। তিনি বলেন চাল পড়া দিয়ে এমনভাবে চোর শনাক্ত করা আইনের পরিপন্থি কাজ। এ ঘটনায় নিহতের পিতা থানায় হত্যা মামলা করবেন এ ধরণের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে এসে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে।
Related News
ছাতকে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ‘মুল্লা’ ছালেক কারাগারে
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের ছাতকে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৮০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ছালেক আহমদ (৪৮)Read More
তাহিরপুরে মাদক সেবনের অভিযোগে কৃষকদলের দুই নেতা আটক
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে মাদক সেবন ও মাতলামি করে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে উপজেলাRead More



Comments are Closed