খাদিজার জন্য কাঁদছে দেশ- কাঁদছে মানবতা
এ এইচ এম ফিরোজ আলী: বাংলাদেশের মানুষের নজর এখন রাজধানী ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালের দিকে। সেখানে নির্মম- নিষ্টুর বর্বরতার শিকার খাদিজা আক্তার নার্গিস চিকিৎসাধীন। বখাটের চাপাতির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে সে। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নার্গিসের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ-এ ইঙ্গিত চিকিৎসকদের। মাথার খুলি কেটে মগজ বের হয়েছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এখন নার্গিস। পিতা মাসুক মিয়া ও ভাই শাহীন আহমেদ বিদেশ থেকে এসে সরাসরি স্কয়ার হাসপাতালে যান। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ। তারা খাদিজার জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। দেশের সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশার মানুষ খাদিজার জন্য কাঁদছেন। দোয়া-প্রার্থনা করছেন সৃষ্টিকর্তার নিকট। খাদিজার পরিবার, গ্রাম এবং গোটা দেশ মর্মান্তিক এ ঘটনায় স্তব্দ। গণমাধ্যমে খাদিজার উপর হামলার মধ্যযুগীয় দৃশ্য দেখে পুরো দেশ হতাশ ও উদ্বিগ্ন। অভিবাবক, শিক্ষার্থীরা আতংকগ্রস্থ। সর্বত্র বিবেকের কান্না, নীরবে চোখের জল পড়ছে মানবতার। প্রতিটি পরিবারের মানুষ টেলিভিশনের সামনে থেকে সরে যাচ্ছেন না, নার্গিসের সুস্থতার খবর জানার জন্য। দেশের প্রতিটি গণমাধ্যমের শিরোনাম এখন নার্গিস। নার্গিসের উপর অমানবিক হামলার ঘটনা এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’। সবাই বখাটে বদরুলকে ধিক্কার জানাচ্ছেন, থুথু দিচ্ছেন। বিক্ষুদ্ধজনেরা বলছেন, এমন ইতর সমাজে জন্ম না নেওয়াই ভাল। সমাজে হউক সু-শিক্ষিতের বাস, কুশিক্ষিতরা সমাজ থেকে দূরে থাক। সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জোরদারের দাবি উঠেছে। বখাটেদের উৎপাত বন্ধ করতে প্রতিটি পরিবার সচেতন হওয়ার আলোচনা হচ্ছে। স্থানীয়, জাতীয় দৈনিকে বখাটে বদরুলের নৃশংস ঘটনার নিন্দা ও শাস্তি দাবি করে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। বদরুলের নিজ গ্রাম মনিগাত্তি গ্রামে নার্গিসের সুস্থতা কামনা করে দোয়া হয়েছে। পুরো গ্রামবাসী ও বদরুলের মা এ ঘটনার শাস্তি দাবি করেছেন। খাদিজার চিকিৎসার ব্যয়ভার প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন। বিএনপির চেয়ারর্পাসন বেগম খালেদা জিয়া ও আর্থিক সহযোগিতার ঘোষনা দিয়েছেন।
গত ৩ অক্টোবর সোমবার সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে তার গৃহ শিক্ষক বদরুল। নার্গিসের বাড়ী সিলেট সদর উপজেলার হাউসা গ্রামে। পিতার নাম মাসুক মিয়া এবং মাতার নাম মনোয়ারা বেগম। খাদিজা সহ বাড়ীর ১১ জন চাচাতো ভাই-বোনের মধ্যে ভাই শাহীন ব্যতীত সবাই খাদিজার ছোট। খাদিজা ছোটদের সকলের কাছে বড় আপা হিসেবে পরিচিত। বাড়ীর ছোটদের পড়ালেখার দায়িত্ব ছিল খাদিজার ওপর। ঘটনার দিন খাদিজা বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে এমসি কলেজ পুকুর পাড়ে আসা মাত্র পূর্ব থেকে ওৎপেতে থাকা বদরুল খাদিজা ও তার সহপাঠী মেয়ের গতিরোধ করে। সে নার্গিসকে খুন করার জন্য ২৫০ টাকায় একখানা চাপাতিও কিনেছিল। ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে নার্গিসকে হত্যার জন্য কুপাতে শুরু করে। চাপাতির আঘাতে নার্গিস “ও মাই গো, ও মাই গো” বলে চিৎকার করছিল। মাথার আঘাত ফেরাতে দুহাত মাথায় দিলে হাত দুটি ক্ষত-বিক্ষত হয়। মাথার আঘাতে সে মাটিতে লুটে পড়ে। পড়ন্ত অবস্থায় লম্পট, বখাটে উন্মাদ ইতর বদরুল কুড়াল দিয়ে গাছ কাটার মত মেয়েটিকে কুপাতে থাকে। ফেসবুকে যে ভিডিও প্রদর্শিত হয়েছে তাতে দেখা যায় বদরুলের আগে পিছে ৩/৪টি ছেলে ঘুরা-ফেরা করছিল। এরা হয়তো বদরুলের সহযোগী। তদন্তকারী সংস্থা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।
বদরুল যখন মেয়েটিকে চাপাতি দিয়ে কুপাচ্ছিল, তখন দূরে থাকা শিক্ষার্থীরা দাড়িয়ে দেখছিলেন। কেউ কেউ মোবাইলে ছবি ও তুলেছেন। কিন্তু নার্গিসকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে কেউ গেলেন না। প্রথমেই বখাটে বদরুলকে ধাওয়া করলে কিংবা চাপাতিতে ধরে ফেললে খাদিজার এমন অবস্থা হতো না। লেখাপড়া যদি মানবতায় এগিয়ে না আসে, তা হলে সে লেখাপড়া করে লাভ কি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে মেয়েটিকে কেউ সাহায্যে এগিয়ে না আসায় মূল্যবোধের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন ‘মাঝে মাঝে কিছু ঘটনা ঘটে যা আমাদের অবাক করে দেয়। একটি মেয়েকে জনসম্মুখে কোপানো হয়েছে, মানুষ দাড়িয়ে দেখছে, কেউ কেউ ভিডিও করছে, মোবাইল ফোনে ছবি তুলছে। কিন্তু কেউ মেয়েটিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। কেউ কি মেয়েটিকে রক্ষা করতে পারত না?’ তিনি অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হবে বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী এসব কথা যথার্থই বলেছেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে সমাজে স্বার্থপরের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা মানবিক দায়-দায়িত্ব একেবারে ভুলে যাচ্ছি। এক সময়ের সাহসী তারুণ্য এখন ভীতু। সমাজে সমাজ হিতৈষীদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে ব্যাগে চাপাতি নিয়ে একজন সন্ত্রাসী কেমন করে কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকলো, পুলিশ ও কলেজ কর্তৃপক্ষ কি এ দায় এড়াতে পারবেন? সোমবার রাতে টিভি চ্যানেলগুলো নার্গিসের ঘটনার সচিত্র সংবাদ যারা দেখেছেন তাদের মনে এমন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। নার্গিসের উপর হামলা ও অসহায়ত্বের ঘটনাটি বিবেকবান মানুষকে কাঁদাচ্ছে। মানুষের একটি মাত্র জিজ্ঞাসা মেয়েটি কি বাঁচবে? এই বদমায়েসের বিচার কি হবে? আলাহ তুমি মেয়েটিকে বাঁচাও- এই আর্তনাদের করুন সুর এখন সর্বত্র।
বদরুলের বাড়ী সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মনিগাত্তি গ্রামে। তার পিতার নাম সাইদুর রহমান। মাতার নাম দিলারা বেগম। বদরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। সে ছাতকের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খন্ডকালীন শিক্ষক ও ছিল। বদরুলের স্বভাব চরিত্র আগে থেকেই খারাপ। পাঁচ বছর পূর্বে ২০১২ সালের ২০ জানুয়ারি জাঙ্গাইল এলাকায় নার্গিসকে উত্ত্যক্ত করার দায়ে আরেকবার গণধোলাই খেয়েছে সে। তখন ছাত্র শিবির তাকে আক্রমন করে পায়ের রগ কেটেছিল বলে প্রচার করে এবং এই সহানুভূতিতে বিশ্ব বিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদকের পদটি পায়। বদরুলের গ্রামের মানুষ বাকরুদ্ধ। তাকে গর্ব করার পরিবর্তে এখন ধিক্কার জানাচ্ছেন তারা। বদরুলের মা ছেলের অপকর্ম শোনে শয্যাশায়ী। তাদের মুখে কোন ভাষা নেই। বদরুলের একটি বোন কলেজে লেখাপড়া করছে। বদরুল মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্থ নয়। তবুও যৌন তৃপ্তির স্বভাবগত উন্মাদনায় প্রতিশোধ নেয় চাপাতি দিয়ে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায় এশিয়া মহাদেশের এই শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠের সুনাম দেশে বিদেশে ক্ষুন্ন হয়েছে। কোন চরিত্রহীন এ প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না।
প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় রাজধানীতে কাপড় কাটার মাস্টার বখাটে ওবায়দুল হত্যা করে রিশা নামক এক স্কুল ছাত্রীকে। মাদারীপুরের কলেজ ছাত্র বখাটে মিলন ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে তারই ছাত্রী নিতুকে। রিশা ও নিতুর মত প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় নার্গিসকে প্রাণে হত্যার চেষ্টা করে বর্বর বদরুল। কোন মেয়েকে পছন্দ হলেই মেয়েরা বখাটদের আবদারে সাড়া দেবে- এমনটাই ইচ্ছা বখাটদের। তারা জানেনা প্রেম-পূত-পবিত্র এবং স্বর্গীয়। প্রেমের সাথে বখাটেপনার কোন সম্পক নেই। মায়ের গর্ভ থেকে শুরু করে ১৮-২০ বছর পর্যন্ত একটি মেয়ে মা-বাবা, দাদা-দাদী, নানা-নানী স্বজনদের হাতে লালিত পালিত হওয়ার পর এক দুবার চোখ ইশারা বা ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ বলে আবদার করলেই কি মেয়েটি প্রেমে পড়ে যাবে? এটা একমাত্র বিকৃত মানসিক ভারসাম্যহীন বোকারাই আশা করতে পারে। তাদের আবদার দেখলে মনে হয় প্রেম যেন পণ্যের মত হাট-বাজারে বিক্রি হচ্ছে। হযরত আদম (আঃ) ও বিবি হাওয়া থেকে মানব সন্তানের সৃষ্টি। পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন মানুষে মানুষে প্রেম-ভালবাসাও থাকবে। মানুষের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ এটা প্রকৃতির নিয়ম। এ নিয়মেই নর-নারী একে অপরকে পছন্দ করেন, ভালবাসেন। সামাজিক মান-সম্মান, ইজ্জত, মর্যাদা বজায় রেখে দুজনের ইচ্ছা একত্রিত হওয়ায় ই ভালবাসার একটি রূপ। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গেলে প্রেম হয় না। এটা হয় বলপ্রয়োগ। মাটি, মানুষ, দেশ, মানবতা, পর-আপন ও সকল জীবকে ভালবাসতে পারলেই প্রেম তার আপন মহীমায় মিলিত হয়। একটি মেয়ে যে কারণেই হোক প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখান করতেই পারে। তাই বলে তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেয়ার কল্পনা করা অসভ্য, নোংরা, কুশিক্ষিত, মনুষ্যত্বহীন, বখাটের পক্ষেই সম্ভব। মিলনের ছাত্রী ছিল নিতু, বদরুলের ছাত্রী নার্গিস। ছাত্রীদের সাথে প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে গলায় কলস বেঁধে নদীতে ডুব দেওয়া ছিল উত্তম প্রতিশোধ। তা না করে মা-বাবা, ভাই-বোন, দেশ, জাতি ও মানবতাকে কলঙ্কিত করা সাজে একমাত্র বখাটদেরই। এখন তাদের বখাটেপনার শেষ রক্ষা করবে কে? বদরুলতো নার্গিসকে হত্যার জন্য কোপানোর কথা আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দীতে স্বীকার করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন। বদরুলকে দল ও বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
নার্গিসকে হত্যার প্রচেষ্টার ঘটনায় সারাদেশের মত সিলেট এখন উত্তাল। সভা-সমাবেশ, মিছিল, মিটিং, মানববন্ধন, রাস্তা অবরোধ সহ নানা কর্মসূচী চলছে। নার্গিসের গ্রাম এখন প্রতিবাদমুখর। কোন মানুষ তাদের মেয়ের ওপর এমন বর্বর ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। সচেতন মহলের মতে, দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ পূর্ণভূমি সিলেটের মান-সম্মান ক্ষতিপয় বখাটদের আচরণে ধূলোয় মিশিয়ে গেছে। পূর্ণভূমি আর পূর্ণ থাকছে না। শাহজালাল ও শাহপরাণ (রঃ) ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত সিলেটকে কলঙ্কিত করছে বখাটেরা। শিশু রাজন হত্যার বিচারের পর একটি স্বস্তি ফিরে এসেছিল। হয়তো সিলেটে এমন ঘটনা আর হবে না। কিন্তু কানাইঘাট উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের এরালীগুল গ্রামের তেরা মিয়ার কন্যা সুলতানাকে ধর্ষণ করে হত্যার পর লাশ গুম করে পাষন্ডরা। গোয়াইনঘাটের তুয়াকুল ইউনিয়নের লক্ষীনগর গ্রামের নুরুল ইসলাম তার ছোট ভাই শিশু মতিউর ও আজিজুর রহমানকে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করে। এমন লোমহর্ষক ঘটনায় সিলেটবাসী ব্যতীত ও মর্মাহত। বদরুলের পাষন্ডতা যেমন মানুষ মেনে নিতে পারেননি তেমনি তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে লোকচুরি খেলা গ্রহণযোগ্য হয়নি। অপরাধীদের একটি পরিচয় সে অপরাধী। অপরাধীদের এমন দায় তার ব্যক্তিগত। সুতরাং দলীয়ভাবে সাফাই না গেয়ে লাগাম টেনে ধরলে দলীয় অপরাধীদের সংখ্যা বাড়বে না বরং কমবে।
লেখক : কলামিস্ট।
Related News
জাপানের দরজা খোলা, চৌকাঠ উঁচু
হক মোঃ ইমদাদুল: বদলে যাওয়া জাপানে বিদেশিদের ভবিষ্যৎ কোথায়? জাপানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সম্পর্ক যাঁদের,Read More
স্ত্রীর আয় নয়, সংকট পুরুষের পুরোনো পরিচয়ে
হক মোঃ ইমদাদুল: একটি সংসারে স্ত্রী যখন স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখনRead More



Comments are Closed