সিলেটের সড়ক ব্যবহার করছে ভারতের ট্যাংক লরি
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: নিজেদের যাতায়াত ঝুঁকির কারণে তেল ও গ্যাসবাহি ট্যাংক লরি চলাচলে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার শুরু করেছে ভারত। ট্রানজিট চুক্তির আওতায় শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) থেকে সিলেটের সড়ক ব্যবহার করে এই সুবিধা নিতে শুরু করেছে তারা। এর বিপরীতে গাড়ির টন প্রতি ১.০২ টাকা বাংলাদেশকে শুল্ক দেবে তারা।
জানা গেছে, শনিবার বিকেল ২টার দিকে তামাবিল স্থল বন্দর দিয়ে ভারতের জ্বালানী তেলের ট্যাংকলরীর প্রথম চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। জ্বালানী তেলবাহী ৯টি ও গ্যাসবাহি ১টিসহ মোট ১০টি ট্যাংকলরি তামাবিল চেকপোস্ট দিয়ে প্রবেশ করে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে সিলেট-তামাবিল সড়ক হয়ে মৌলভীবাজার-শমশেরনগর-চাতলাপুর চেকপোস্ট হয়ে ভারতের ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রানজিট এই সড়ক সংযোগের যাত্রাকালে সিলেট সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম, তামাবিল স্থল বন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুর রহমান, ভারতের পক্ষে মেঘালয়ের সড়ক বিভাগের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক অসিম পাল চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, ভারতীয় পাহাড়ী পথে পেট্রোল ও ডিজেল পরিবহণে সমস্যার কারণে বাংলাদেশেকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি তেল পরিবহন হবে এই সড়ক দিয়ে।
সিলেটের সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম জানান, জ্বালানী তেলবাহী ট্যাংকলরী পরিবহনে বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে প্রত্যক কিলোমিটারে প্রতি টনে ১.০২ পয়সা করে শুল্ক প্রদান করবে পরিবহনগুলো।
বন্যায় ভারতের আভ্যন্তরীন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় সাময়িকভাবে বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। শনিবার মেঘালয়ের ডাউকি সীমতান্ত দিয়ে ঢুকে ১০টি লরি ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঈদের পর আরো জ্বালানী পরিবহন করা হবে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করে ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে জ্বালানী পরিবহনের জন্য গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটিডের (আইওসিএল) মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত (এমওইউ) হয়।
এদিকে আমাদের কমলগঞ্জ প্রতিনিধি প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ জানান, সিলেট-মৌলভীবাজার-শমশেরনগর ট্রানজিট সড়ক ব্যবহার করে চাতলাপুর চেকপোষ্ট হয়ে কঠোর পুলিশী নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করেছে ভারতীয় জ্বালানি তেলের ট্যাংকার। বাংলাদেশে আসা ভারতীয় জ্বালানী তেলের ১০টি লরি শনিবার রাত সোয়া ১১টায় মৌলভীবাজারের চাতলাপুর ও ত্রিপুরার মনু চেকপোষ্টে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের শিল্প, বাণিজ্য ও শিক্ষামন্ত্রী তপন চক্রবর্তী। এ সময় ত্রিপুরার উনকোটি জেলার সরকারী উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। রাত ১১টায় জ্বালানী তেলের লরি চাতলাপুর চেকপোষ্টে গিয়ে পৌছার পর ইমিগ্রেশন ও শুলক বিভাগের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চেক পয়েন্টে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় জ্বালানী তেলের ১০জন চালক, সহকারী চালক ও সফরসঙ্গী ভারতের ওয়েল কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের। রাত সাড়ে ১০টায় কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বাজার অতিক্রম করার সময় শত শত উৎসুক জনতা ভারতীয় তেলবাহী গাড়িকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। গভীর রাত অবধি ভারতের কৈলাশহরে ট্রানজিটের মাধ্যমে আগত জ্বালানী তেলের লরি দেখতে উৎসুক জনতার ঢল নেমেছিল।
এর আগে শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় ভারতের মেঘালয় থেকে সিলেটের গোয়ানইঘাট উপজেলার তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ৯টি তেলবাহী ও একটি গ্যাসবাহী লরি বাংলাদেশে প্রবেশ করে ভারতের জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী লরির প্রথম চালান। এরপর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল সোয়া ৪টায় জ্বালানী পরিবহনের এই গাড়িগুলো সিলেটের সড়কপথ দিয়ে মৌলভীবাজারের চাতলাপুর শুল্ক স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।
প্রতিবেশী ভারত সাময়িক ট্রানজিট সুবিধায় বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাস আরেক রাজ্য ত্রিপুরায় প্রবেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পণ্য পারাপার শুরু হয়েছে। প্রতিদিন (দিনের বেলা) সর্বোচ্চ ৮০টি লরিতে জ্বালানি পরিবহন করতে পারবে ভারত।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা যায়, ভারতীয় ট্যাংকারগুলো উত্তর আসামের বঙ্গাইগাঁও থেকে যাত্রা করে মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত দিয়ে সিলেটের তামাবিল-মৌলভীবাজারের-শমশেরনগর-চাতলাপুর হয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টায় ১৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর ত্রিপুরার কৈলাসহরে প্রবেশ করে। ত্রিপুরায় জ্বালানি তেল সরবরাহের পর খালি যানবাহনগুলো বাংলাদেশের চাতলাপুর চেকপোস্ট হয়ে একই পথে ভারতে ফিরে যাবে। এসব পণ্য ৪০০ কিলোমিটারের বেশি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরায় নিতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। তাছাড়া মেঘালয় ও দক্ষিণ আসাম হয়ে জাতীয় মহাসড়কের অবস্থাও খারাপ। স¤প্রতি ভারি বর্ষণ এবং পাহাড়ি ভূমিধসের কারণে আসাম থেকে ত্রিপুরাগামী সড়কপথ (এনএইচ-৪৪) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্রিপুরার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ত্রিপুরা রাজ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
তামাবিল শুল্ক স্টেশনের ইমিগ্রেশন অফিসের ইনচার্জ এসআই রুনু মিয়া জানান, তেলবাহী লরির প্রতিটিতে ৯ টন তেল, গ্যাসবাহী লরিতে ৭ টন গ্যাস রয়েছে। তিনি বলেন, বন্যায় ভারতের আভ্যন্তরীন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় সাময়িকভাবে বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করা হচ্ছে। শনিবার মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে ১০টি লরি ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঈদের পর আরো জ্বালানী পরিবহন করা হবে বলে জানা গেছে।
চাতলাপুর চেকপাষ্টের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা সুমন মিয়া জানান, এই চেকপোষ্ট দিয়ে শনিবার রাত সোয়া ১১টায় ভারতীয় জ্বালানি তেলের বহর ত্রিপুরায় প্রবেশ করে। মৌলভীবাজার থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত ৩৪ কি:মি; সড়ক জনপথের সড়কটির বেশীর ভাগ অংশই সরু ও দুর্বল। ভারতীয় জ্বালানি তেলের বহরের কারণে প্রাথমিকভাবে এ অংশে ট্রাফিক জ্যামসহ সড়কের কিছু ক্ষতি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন। সড়ক জনপথ বিভাগ, মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত এ প্রতিনিধিকে বলেন, আপাতত চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ভারত এ সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ অংশে সিলেট থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত সড়কের অবস্থা সম্পর্কেও উৎপল সামন্ত বলেন, আপাতত তেমন ভারী ভারতীয় যানবাহন চলাচল করবে না। সুতরাং সড়কের তেমন কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ত্রিপুরার জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধন এবং সর্বোপরি মানবিক অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে। এর আগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ত্রিপুরায় খাদ্য শস্য ও ভারি যন্ত্রপাতি বহনে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয় সরকার।
আসাম ও মেঘালয়ের গতানুগতিক বন্ধুর পথ এড়িয়ে গত মাসে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে দুই হাজার ৩৫০ টন চালের নতুন একটি চালান ত্রিপুরায় পাঠিয়েছে ভারতের খাদ্য করপোরেশন (এফসিআই)। এর আগে ত্রিপুরায় ৭২৬ মেগাওয়াট ‘পালটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ নির্মাণের জন্য ভারী যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম পরিবহনে ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন লিমিটেডকে (ওএনজিসি) বাংলাদেশের পথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সরু একটি পাহাড়ি ভূমি রয়েছে চড়াই-উৎরাইয়ের ওই পথে যানবাহন বিশেষ মালবোঝাই ট্রাক চলাচল খুবই কঠিন। সড়ক পথে গুয়াহাটি হয়ে আসাম থেকে কলকাতার দূরত্ব এক হাজার ৬৫০ মাইল, দিল্লির দূরত্ব দুই হাজার ৬৩৭ মাইল। কিন্তু বাংলাদেশ হয়ে আগরতলা ও কলকাতার মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৬২০ কিলোমিটার।
শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটানা এ পেট্রোপণ্য যাবে আসাম থেকে বাংলাদেশ হয়ে ত্রিপুরায়। বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করে এটি হবে পেট্রোপণ্যের প্রথম চালান। ভারতের আইওসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ট্যাংকার দিয়ে এ পেট্রোপণ্য পারাপার করবে। সিলেট ডাউকী স্থলবন্দর দিয়ে এ পণ্য প্রবেশের পর মৌলভীবাজার বাইপাস হয়ে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর-চাতলাপুর স্থলবন্দর অতিক্রম করে ত্রিপুরার কৈলাশহর মনু স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করে।
Related News
বিশ্বনাথে স্ত্রীর মামলায় স্বামী গ্রেফতার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় কছির আলী (৩৮) নামে এক ব্যক্তিকেRead More
বিশ্বনাথে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শুরু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের বিশ্বনাথে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়েছে। সারাদেশের সঙ্গে সমন্বয়Read More



Comments are Closed