ভূমি কর্মকর্তা মহিউদ্দিন কারাগারে, ভুয়া সিল ও কাগজ জব্দ
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিসের আর্থিক কেলেংকারীর ঘটনায় প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। জালিয়াত চক্রের হোতা মহিউদ্দীনের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তার ১০টি সিল ও বিলের কাগজপত্র।
এদিকে ঝিনাইদহের অতিক্তি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) খলিল আহম্মদকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক সোহরাব হোসেন ঘটনা তদন্তে মহেশপুরে এসেছেন। জালিয়াত চক্রকে সহযোগিতা করার অভিযোগে বদলি করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের সংস্থাপন শাখার বড়বাবু ইসমাইল হোসেনকে। গত সোমবার স্বাক্ষর জাল করে ২২ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের সময় জেলার মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিসারের চাকরি থেকে অপসারিত নাজির মহিউদ্দিনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
এ ঘটনার পর থেকে জেলার সব হিসাব রক্ষন (এজি) অফিসে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। ভুয়া বিল ভাউচার তৈরী করে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর সিল জাল করে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে জালিয়াত চক্র লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে আসে।
ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মো: খলিল আহম্মেদ খবরের সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তিনি দাবী করেছেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন গত ব্যবস্থা গ্রহন করা সহ অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। এদিকে অনুসন্ধানে জালিয়াত চক্রের প্রধান মহিউদ্দিনের কর্মকান্ডের আরো তথ্য বেরিয়ে আসছে।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের সংস্থাপন শাখার একটি সুত্র জানিয়েছে, জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার ইকড়া গ্রামের মৃত আবু বক্করের ছেলে মো: মহিউদ্দিন এইচএসসি পাশ করে ১৯৮০ সালের ১৪ ফেব্রয়ারী যশোর জেলা প্রশাসকের দপ্তরে অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে প্রথম সে ফেঁসে যায়। প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে ধরা পড়ে যান তিনি ।
এ ঘটনায় দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় (মামলা নং- জেআর ২১/৯২) ঝিনাইদহ জেলা জজ আদালতের বিচারক তাকে দোষী সাব্যস্থ করে ২০ বছরের কারাদন্ড প্রদান করেন। উচ্চ আদালতে আপিল করে ওই মামলা থেকে খালাস লাভ করে মহিউদ্দীন ফের চাকরিতে যোগদান করেন। এরপর তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা ভুমি অফিসে কর্মরত অবস্থায় ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বরাদ্দ থেকে দরিদ্র বিমোচন তহবিলের ( আশ্রয়ন প্রকল্পের) ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
কালীগঞ্জ ভুমি অফিসের এসি ল্যান্ড শাহানাজ পারভীন ২০১৫ সালের মার্চ মাসে বিষয়টি জানতে পেরে অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে জমা দেন। ওই বছরের ২০ আগষ্ট জেলা প্রশাসকের দপ্তরে কর্মরত সহকারী কমিশনার উত্তম কুমার রায় ঘটনা তদন্ত করে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি পূর্নাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে মহিউদ্দিনকে দোষী সাব্যস্থ করা হয় এবং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে দুর্নীতির দায়ে মহিউদ্দিনকে নাজির পদে মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিসে বদলী করা হয় এবং ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়।
ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। মহিউদ্দিনও নাছড় বান্দা। তিনি ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে চাকরি থেকে অপসারারিত হওয়ার পরেও নাজির মহিউদ্দিন নিয়মিত মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিসে কর্মকান্ড চালিয়ে গেছেন। র্দীঘ দিন তিনি স্থানীয় হিসাব রক্ষন অফিসের জুনিয়ার অডিটর মোহাম্মদ আলী ও এমএলএসএস জাহাঙ্গীরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতি মাসে কর্মকর্তার স্বাক্ষর সিল জাল করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
সব শেষ গত সোমবার (২ মে) মহেশপুরের এসি ল্যান্ড অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিদের মাসিক বেতন ভাতার ৬ লাখ ৮৩ হাজার ও জাল করে নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ডের নামে ১৫ লাখ টাকা সোনালী ব্যাংক মহেশপুর শাখা থেকে তুলে নেয়ার সময় ধরা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে মহেশপুর উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) চৌধুরী রওশন ইসলাম ও সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার মো: নজরুল ইসলাম বলেছেন, সিল স্বাক্ষর জাল করে সে বিপুল অংকের এ টাকা তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ তার কাছ থেকে ১০টি জাল সিল ও বিপুল অংকের ভুয়া বিল জব্দ করেছে।
সুত্র মতে মহিউদ্দিন জেলা প্রশাসকের সংস্থাপন বিভাগের সহকারী কমিশনার (বর্তমানে প্রশিক্ষনে) মেজবাউল করিমের জাল স্বাক্ষর দিয়ে ভুয়া অর্থ মুঞ্জুরীর আদেশ তৈরী করেছে এবং সেই আদেশের সুত্র ধরে নিজের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৩ লাখ টাকার স্থলে ১৫ লাখ টাকা তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে মহেশপুর উপজেলা হিসাব রক্ষন অফিসার সুজিত কুমার বলেন মহিউদ্দিনকে দিয়ে উপজেলা ভুমি অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিদের মাসিক বেতন বিল ভাউচার পাঠানো হতো এবং ব্যাংক থেকে উত্তোলন করানো হতো। এই কর্মকর্তা ট্রেজারি বিল জালিয়াতির ঘটনার জন্য মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিসের অব্যবস্থাপনাকে দায়ি করেছেন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মহেশপুর উপজেলা ভুমি অফিস থেকে মাসের পর মাস সরকারী বরাদ্দের অর্থ রি-কনসাইজ করা হয় না। একই কাজ করছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দপ্তর। এতে করে জালিয়াত চক্রের জন্য ট্রেজারি বিল তৈরী করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়া সহজ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ইতোমধ্যে মহিউদ্দিনের নামে অন্তত ২৫টি ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। যে কারনে ধারনা করা হচ্ছে শক্তিশালী একটি জালিয়াত চক্র ঘটনার সাথে জড়িত রয়েছে।
এ নিয়ে কথা বলেন ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব মো : খলিল আহম্মেদ বলেন বিগত বছর গুলোতে জালিয়াত চক্র প্রকৃতপক্ষে কি পরিমাণ অর্থ তুলে নিয়েছে তা নিয়ে তিনি শংকিত। মহেশপুর এসি ল্যান্ড অফিসের লেনদেনের হিসাব পরীক্ষা করে কয়েক লাখ টাকার গড় মিল পাওয়া গেছে বলে স্বীকার করেছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসন। মহেশপুর এসিল্যান্ড অফিসের ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার হিসেব এই মুহুর্তে মিলছেনা মর্মে জানা গেছে। মহেশপুর থানার এস,আই সোহরাব হোসেন জানিয়েছেন আটক মহিউদ্দিনকে মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে । তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক মহেশপুর শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার আছাদুল ইসলাম বাদি হয়ে মামলা করেছেন। থানা পুলিশের পক্ষ থেকে মামলাটি দুদক যশোর জোনের উপ-পরিচালকের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে মর্মে নিশ্চিত করেছেন এসআই সোহরাব হোসেন ।
Related News
সাতক্ষীরায় পুকুরের পানিতে ডুবে ২ স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সাতক্ষীরায় পুকুরে ডুবে দুই স্কুলশিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টারRead More
অনলাইনে পণ্য বিক্রির নামে প্রতারণা, ঝিনাইদহে গ্রেপ্তার ৩
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ঝিনাইদহের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের অভিযানে ইলিশ মাছ, জুতা, বাচ্চাদের খেলনা, ফার্নিচারসহRead More



Comments are Closed