আধুনিকতার আড়ালে এক নীরব জাহেলিয়াত
আতিকুর রহমান নগরী: ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জন হলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিশ্বমঞ্চে নিজেকে উপস্থাপনের একটি মাধ্যম মাত্র।
আধুনিক শিক্ষা মানুষকে ক্যারিয়ার, বস্তুগত সাফল্য এবং পেশাগত দক্ষতা এনে দেয়; কিন্তু কুরআনিক জ্ঞান ও আত্মিক অনুশাসন দেয় জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা ও আত্মিক প্রশান্তি।
আজকের সমাজে এমন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য চোখে পড়ে। আমরা সন্তানকে ইংরেজি শেখানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি, বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকে ভবিষ্যতের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সোপান মনে করি। অথচ পবিত্র কুরআন শুদ্ধভাবে পড়তে শেখার বিষয়টি অনেকের কাছেই যেন জীবনের অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই। এখানেই আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা।
ইংরেজি জানা দোষের নয়, বরং বর্তমান বিশ্বে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা। বিদেশি ভাষা শেখাও প্রয়োজনীয়। কিন্তু কোনো ভাষার জ্ঞান যদি অহংকারের কারণ হয়ে ওঠে এবং সেই অহংকার যদি মানুষকে নিজের ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তখন বিষয়টি নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
একজন শিক্ষিত মানুষ যদি ইংরেজি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করেন, তা অবশ্যই তাঁর পার্থিব জীবনের সম্পদ। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি যদি নিজের ধর্মের মৌলিক জ্ঞান, কুরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াত এবং নামাজের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন, তবে তাঁর শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অপূর্ণ থেকে যায়। কারণ শিক্ষা কেবল পেশাগত দক্ষতার নাম নয়; শিক্ষা মানুষের বোধ, দায়িত্ববোধ ও আত্মপরিচয়কেও সমৃদ্ধ করে।
আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন। ভালো স্কুল, কোচিং, ভাষা শিক্ষা, প্রযুক্তি শিক্ষা—সবকিছুর জন্য আমরা সময় ও অর্থ ব্যয় করি। এটি প্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু তাদের কুরআন শেখানোর ক্ষেত্রে অনেক পরিবার সেই একই গুরুত্ব দেখায় না। একজন কারি, হাফেজ বা যোগ্য শিক্ষকের কাছে কুরআন ও তাজবিদ শেখানোর জন্য যে সময় ও অর্থ প্রয়োজন, সেটিকে অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখা হয়।
এখানেই আমাদের অগ্রাধিকারের প্রশ্নটি সামনে আসে।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল রমজানে খতম দেওয়া, ঘরে সুন্দর মলাটে কুরআন রাখা কিংবা বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে তিলাওয়াত শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন পড়া, তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং তার নৈতিক ও মানবিক শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করাই হওয়া উচিত কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
পবিত্র কুরআনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি ফরিয়াদ উল্লেখ করা হয়েছে—
“হে আমার রব! আমার জাতি এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য করে রেখেছিল।”-সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৩০
এই আয়াত আমাদের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। ‘কুরআন পরিত্যাগ’ বলতে শুধু কুরআন না পড়াকেই বোঝানো হয় কি না—এ নিয়ে তাফসিরে বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা রয়েছে। তবে একজন মুসলমানের জন্য কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়া যে উদ্বেগের বিষয়, এতে সন্দেহ নেই।
আমরা যদি দিনের পর দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দিতে পারি, বিনোদনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে পারি, নতুন ভাষা শেখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতে পারি, তাহলে কুরআন শেখার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় বের করা অসম্ভব হওয়ার কথা নয়।
সমস্যাটি শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সময় আমরা তাকে যে মূল্যবোধ দিই, সেটিই পরবর্তী জীবনে তার চিন্তা ও আচরণে প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়াও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—কুরআন শেখা এবং আধুনিক শিক্ষা অর্জন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে ইংরেজিতে দক্ষ হতে পারেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জ্ঞান অর্জন করতে পারেন এবং কুরআনও শুদ্ধভাবে পড়তে ও বুঝতে পারেন। বরং জ্ঞানকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে জীবনকে সমৃদ্ধ করার বিভিন্ন মাধ্যম হিসেবে দেখাই অধিক যুক্তিসংগত।
আমাদের সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দুনিয়াবি সাফল্য আমাদের আত্মপরিচয় ও ধর্মীয় দায়িত্বকে আড়াল করে ফেলে। একটি বিদেশি ভাষায় দক্ষতা তখন আর জ্ঞান থাকে না; তা হয়ে ওঠে অহংকারের বিষয়। একটি ডিগ্রি তখন আর শিক্ষার পরিচয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। আর কুরআনের জ্ঞান তখন অপ্রয়োজনীয় কিংবা গৌণ বলে মনে হতে শুরু করে।
এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন আছে।
মৃত্যুর পর আমাদের সঙ্গে যাবে না কোনো ভাষার সার্টিফিকেট, বিদেশি ডিগ্রি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পার্থিব পরিচয়ের বাহ্যিক চাকচিক্য। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী মানুষের প্রকৃত সাফল্যের সঙ্গে ঈমান ও আমলের সম্পর্ক রয়েছে। তাই দুনিয়ার জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আখেরাতের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনও অবহেলার বিষয় হতে পারে না।
আধুনিক হওয়া মানে নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া নয়। ইংরেজি জানা মানে কুরআন না জানা নয়। বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া মানে ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে থাকা নয়। বরং একজন সচেতন মুসলমানের জন্য প্রয়োজন—দুনিয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নিজের ধর্ম, কুরআন ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকা।
তাই প্রশ্নটি অন্যের দিকে ছুড়ে দেওয়ার আগে নিজেদের দিকে তাকানো দরকার। আমরা কি কুরআনকে জীবনের অংশ করেছি, নাকি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের একটি প্রতীক হিসেবে রেখেছি? আমরা কি সন্তানকে কেবল জীবিকার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি একজন দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছি?
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য হয়তো বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন অল্প কিছু সময়, একজন যোগ্য শিক্ষকের কাছে শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখা, অর্থ বোঝার চেষ্টা এবং আয়াতের শিক্ষা জীবনে প্রয়োগের আন্তরিকতাই হতে পারে সেই পথের শুরু।
আধুনিকতার সঙ্গে কুরআনের কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ তৈরি হয় তখনই, যখন আধুনিকতার নামে আমরা জ্ঞানকে অহংকারে পরিণত করি এবং নিজের মূল্যবোধ ও আত্মপরিচয়কে বিস্মৃত হই। সেই নীরব বিস্মৃতিই হয়তো আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসার বিষয়।
বর্তমান প্রযুক্তিবান্ধব বিশ্বেও আধুনিক পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা করা পুরোপুরি সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, পারিবারিক চর্চা এবং নিজস্ব সদিচ্ছা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়েই নিজের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা সম্ভব।
লেখক: আলেম, সাংবাদিক
Related News
আধুনিকতার আড়ালে এক নীরব জাহেলিয়াত
আতিকুর রহমান নগরী: ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জন হলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ওRead More
জনস্বাস্থ্যে ডেঙ্গু্র প্রভাব: সংকট নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা
মো. আকিকুর রেজা: প্রতি বছর বর্ষাকাল আসলেই জনমনে ভর করে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। তবে ডেঙ্গু এখনRead More



Comments are Closed