Main Menu

এসএসসির ফল প্রকাশের ছয়দিনে ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

Manual5 Ad Code

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের মাত্র ছয় দিনের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা বা আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গত ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর, গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর, কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে এসব মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন।

সংগঠনটির সমন্বয় করা তথ্য অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ১০টি ঘটনার মধ্যে সাতজনই মেয়ে এবং তিনজন ছেলে শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রকাশিত ঘটনাগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৩০ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই তীব্র মানসিক চাপে পড়েছিল।

ফল প্রকাশের পর একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দেশের পরীক্ষা ও ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পরীক্ষার ফল কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবন, সামর্থ্য কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার চূড়ান্ত মানদ- হতে পারে না। কিন্তু পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ যখন ফলাফলের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সাফল্য-ব্যর্থতাকে এক করে ফেলে, তখন কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা, ভয়, লজ্জা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

আঁচল ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাসে এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীনও ভোলায় এক নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছিল। পরীক্ষার ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ার আশঙ্কা ও পরীক্ষাজনিত চাপের সঙ্গে ওই ঘটনার যোগসূত্রের কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে।

চার বছরে শত শত শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা যে শুধু এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়েই সীমাবদ্ধ, তা নয়। আঁচল ফাউন্ডেশনের সমন্বয় করা তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে দেশে শত শত শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে অন্তত ৫৩২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫১৩ জন। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী আত্মহত্যার সংখ্যা কমে ৩১০ জনে দাঁড়ালেও ২০২৫ সালে তা আবার বেড়ে অন্তত ৪০৩ জনে পৌঁছায়।

অর্থাৎ চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ফলাফল, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কজনিত জটিলতা, মানসিক চাপসহ নানা বিষয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার পেছনে ভূমিকা রাখে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সংগঠনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার, সামাজিক প্রত্যাশা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগÑসবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

ফলাফল প্রকাশের সময় বাড়তি ঝুঁকি: ফলাফল প্রকাশের দিনটি একজন শিক্ষার্থীর জন্য আনন্দের যেমন হতে পারে, তেমনি কারও কারও জন্য তা হয়ে উঠতে পারে চরম উদ্বেগের সময়। বিশেষ করে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীরা যখন সহপাঠীদের ফলাফল, পরিবারের প্রত্যাশা এবং সামাজিক মূল্যায়নের সঙ্গে নিজের ফলাফল তুলনা করতে শুরু করে, তখন মানসিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণাতেও পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময়কে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই ফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

সংগঠনটির মতে, শুধু ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ালেই হবে না; ফল প্রকাশের পর অন্তত কয়েক সপ্তাহ তাদের আচরণ, মানসিক অবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়েও পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সতর্ক থাকতে হবে।

‘কম জিপিএ জীবনের শেষ নয়’: আঁচল ফাউন্ডেশন মনে করে, একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নির্ধারণ করে না। কিন্তু যখন ফলাফলকে জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মানদ- হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন একটি খারাপ ফলাফলই শিক্ষার্থীর কাছে জীবনের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কম জিপিএ, অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া একটি সাময়িক একাডেমিক ফলাফলÑএটি জীবনের শেষ নয়। বরং প্রয়োজন হলে বিষয় পরিবর্তন, পুনরায় পরীক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপথ বেছে নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সফল হতে পারে।

ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে বের হওয়ার আহ্বান: আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা দেশের মুখস্থ ও ফলাফলনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে আসছে। সংগঠনটি বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ফলাফলনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।

আঁচল ফাউন্ডেশনের বক্তব্য, ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউএনডিপির বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১০তম। উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকগুলো অনুসরণ করে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক করে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে সংগঠনটি।

Manual3 Ad Code

আট দফা দাবি: ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কাছে আট দফা পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

প্রথমত, পরীক্ষার সময় এবং ফল প্রকাশের পর অন্তত দুই সপ্তাহ পরিবারকে শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য হটলাইন, বিশেষ মানসিক পরামর্শ ও সহায়তা কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

চতুর্থত, শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট, আচরণগত পরিবর্তন এবং আত্মহানির সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

Manual1 Ad Code

পঞ্চমত, ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীকে অপমান, শাস্তি, ভয় দেখানো কিংবা অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা না করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

Manual2 Ad Code

ষষ্ঠত, শিক্ষার্থী আত্মহত্যা প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

সপ্তমত, ফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সহায়তা ও সংযোগব্যবস্থা চালু করতে বলা হয়েছে।

অষ্টমত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশনের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। চাঞ্চল্যকর, অতিরঞ্জিত কিংবা অনুকরণে উৎসাহিত করতে পারেÑএমন উপস্থাপন এড়িয়ে চলার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

Manual3 Ad Code

‘শিক্ষার্থীর জীবনই সবচেয়ে মূল্যবান’ বলে মন্তব্য করেছেন আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ। তিনি দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, ‘ একটি পরীক্ষার ফলাফলকে কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। ফলাফল খারাপ হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো, তাকে বোঝানো এবং ভবিষ্যতের বিকল্প পথ সম্পর্কে আশ্বস্ত করা।

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের প্রতি সংগঠনটির আহ্বান-ফলাফল নিয়ে সন্তানকে বকাঝকা, অপমান বা অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে তার কথা শুনতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও একইভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে।’

সংগঠনটির মতে, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ একটি পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে একজন শিক্ষার্থীর জীবন অসীমভাবে মূল্যবান।

ফল প্রকাশের মাত্র ছয় দিনে ১০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর তাই শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার ও সমাজের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সরকার দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও মানসিকভাবে সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করবেÑএমন প্রত্যাশা করছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code