ছাতক সিমেন্টের আধুনিকায়ন প্রকেল্পর কাজ ১০ বছরেও শেষ হয়নি, ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ
সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা: ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র স্বয়ংস¤পূর্ণ সিমেন্ট কারখানা ছাতক সিমেন্ট কো¤পানি লিমিটেড (সিসিসিএল)-এর আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। লক্ষ্য ছিল ওয়েট প্রসেস বাদ দিয়ে ড্রাই প্রসেস প্রযুক্তিতে রূপান্তর, দৈনিক দেড় হাজার টন ক্লিংকার ও ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৯ সালেই নতুন কারখানা চালুর কথা থাকলেও ১০ বছর পরও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। সময়ের প্রসারে ব্যয় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের আগেই তা বেড়ে হয় ৮৯০ কোটি টাকা। পরে আরও তিন দফা সংশোধন এনে সময় বাড়ানো হয় প্রথমে ২০২১, পরে ২০২৪ সালের মার্চ, এরপর ২০২৫ সালের জুন, সর্বশেষ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। নতুন সংশোধনীতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১,৪১৮ কোটি টাকা, যা প্রায় দ্বিগুণ। তবুও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৮০%, আর্থিক অগ্রগতি ৬৮.৫৫%। ব্যয় হয়েছে ৯৭১ কোটি টাকা, বাকি অংশ ঝুলে আছে।
রোপওয়ে ও ভারতীয় অনুমতি সবচেয়ে বড় বাধা। প্রকল্পের মূল শক্তি ছিল ১৭ কিলোমিটার রোপওয়ে, যা ভারতের মেঘালয় থেকে সরাসরি চুনাপাথর এনে কারখানায় ফেলবে। বাংলাদেশ অংশের বেশির ভাগ কাজ শেষ হলেও ভারতের ৫ কিলোমিটার অংশে এখনো অনুমতি মেলেনি। ২০২০ সালে ভারত কেএলএমসি–কে চুনাপাথর সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে ছাতক
সিমেন্টে উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়ে যায়। রোপওয়ে ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুনাপাথর সরবরাহ অসম্ভব এ ধারণা থেকেই প্রকল্প কার্যত অচল।
গ্যাসলাইন অন্তর্ভুক্ত না থাকা আরেক বড় ভুল। ড্রাই প্রসেস কারখানায় আগের তুলনায় তিনগুণ বেশি গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু প্রকল্প নেওয়ার সময় নতুন গ্যাসলাইন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি রহস্যজনক কারনে। পরে সংশোধনী এনে সিলেট-ছাতক পর্যন্ত ৪৩ কিলোমিটার গ্যাসলাইন যোগ করা হলে ব্যয়ও বাড়ে। এখনো গ্যাসলাইন নির্মাণে টেন্ডার পর্যন্ত হয়নি। জেজিটিডিএসএল বলছে, গ্যাসের প্রাপ্তি নিশ্চিত না হলে লাইন দেওয়া যাবে না।
প্রকল্প পরিচালক আব্দুল রহমান বাদশা জানান পুরোনো গ্যাসলাইনে সীমিত সিমেন্ট উৎপাদন সম্ভব হলেও ক্লিংকার উৎপাদন অসম্ভব। দেশে চুনাপাথর আছে তবুও আমদানি নির্ভরতা। সিলেটের জৈন্তা–গোয়াইনঘাটে বিপুল চুনাপাথর মজুদ থাকা সত্ত্বেও ছাতক সিমেন্ট ভারতীয় খনির ওপর নির্ভরশীল।
গোয়াইনঘাটের চৈলাখাল মৌজায় ৬৭৫ একর খনি জমি দীর্ঘদিন অকার্যকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশীয় খনি চালু হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে, রাজস্ব বাড়বে এবং ছাতক সিমেন্ট দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ উৎপাদনে ফিরবে। কিন্তু বিসিআইসি এ বিষয়ে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেননি আজও।
গত ৯ জানুয়ারি শিল্প ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রকল্পটি পরিদর্শন করেন। তার সঙ্গে ছিলেন শিল্প সচিব ওবায়দুর রহমান ও বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড.মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া, ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডিপ্লোমেসি চাকমা, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ছাতক সার্কেল শেখ মো. মুরসালিন, ওসি মিজানুর রহমান, কারখানার প্রকেল্পর পিরচালক ও এমডি মো. আব্দুর রহমান বাদশা, কারখানার শ্রমিক ইউনিয়ন বি ৮০-এর সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ স¤পাদক শফি উদ্দিন প্রমুখ। তবে তারা কেউই প্রকল্প শেষের নির্দিষ্ট সময় বলতে পারেননি। তবে তারা বলেন দ্রুত চালু করা হবে।
বিসিআইসি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফজলুর রহমান শুধু বলেন, “চুনাপাথর ও গ্যাসলাইন সংকট দ্রুত সমাধান করা হবে। আইএমইডির নির্দেশ আর সময় বাড়বে না। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ জানায় ২০২৬ সালের জুনের পর সময় বাড়ানো যাবে না, ওই সময়ের মধ্যেই পিসিআর জমা দিতে হবে, গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, তবু মাঠে দ্রুততার ছাপ নেই। বাইরে থেকে ক্লিংকার কিনে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে ৫০০ টন সিমেন্ট উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছেন কর্তৃপক্ষ। এতে ব্যয় বাড়বে, আধুনিকায়নের মূল লক্ষ্যও ব্যর্থ হবে। স্থানীয়দের ক্ষোভ ব্যবসায়ী শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ বলছেন দশ বছর ধরে প্রকল্প ঝুলে থাকার ফলে ছাতকের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় বেড়েছে। কারখানা বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। শেষ হবে কবে গভীর অনিশ্চয়তা। রোপওয়ের ভারত অংশে অনুমতি নেই, গ্যাসলাইন শুরু হয়নি, চুনাপাথর সরবরাহ অনিশ্চিত এসব কারণে ২০২৬ সালের মধ্যেও প্রকল্প শেষ হবে কি না তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।
Related News
তাহিরপুরে বালুবাহী নৌকাডুবি, যুবকের মৃত্যু
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে নৌকাডুবিতে মানিক মিয়া (২১) নামে এক যুবকRead More
সুনামগঞ্জে দম্পতির অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও পোস্ট, যুবক গ্রেফতার
Manual8 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জে সদর থানায় র্যাবের অভিযানে নারী ও শিশু নির্যাতনRead More



Comments are Closed