নির্বাচনের খরচ বাড়ল এক হাজার কোটি টাকা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: দেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ায় নির্বাচনী খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন খরচ ধরে নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচনী খরচের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা। তবে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যুক্ত হওয়ায় প্রচার, ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক কার্যক্রমের পরিধি প্রসারিত হচ্ছে। এ কারণে সংশোধিত বাজেটে আরও এক হাজার ৭০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট বরাদ্দ তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত টাকা চেয়ে সম্প্রতি ইসি একটি চিঠি দেয়। অর্থ বিভাগ গতকাল বুধবার সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। মূলত নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার-প্রচারণা, জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের কারণেই এ বাড়তি ব্যয় প্রয়োজন হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী ব্যয় বড় আকারে বাড়ছে। কয়েকশ কোটি টাকা থেকে এখন সেটি তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ যৌক্তিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ হলে এই খরচ অনেক কমানো সম্ভব। সরকারকে দেওয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও খরচ বাড়ানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নিয়োগ পাওয়াদেরও বেতনের বাইরে প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া হয়। একইভাবে নানা খাতে খরচ বাড়ানো হয়। এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে মূল বাজেটে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৩ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১৩০ শতাংশ। একইভাবে অন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার ব্যয় ছয় গুণ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৭০ কোটি টাকায়। পরিবহন খাতে ব্যয় ৬৩ শতাংশ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ কোটি ১২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া মুদ্রণ ও বাঁধাই খাতে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮ কোটি টাকা এবং অন্য মনিহারি খাতে বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে ৫৮১ কোটি টাকা। এই দুই খাতে যথাক্রমে ২০৮ শতাংশ ও ৩১৫ শতাংশ ব্যয় বেড়েছে। ব্যালট বাক্স খাতেও খরচ বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে– এক কোটি টাকা থেকে বেড়ে তা পাঁচ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্মানী ভাতায় ব্যয় ৪৯৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫১৫ কোটি টাকা, আপ্যায়নে ২২০ থেকে ২৯০ কোটি এবং খোরাকি ভাতা ৫১২ টাকা থেকে ৭৩০ কোটি টাকা করা হয়েছে। সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনী খরচের প্রায় ২০ খাতের মধ্যে ১৭টিতেই খরচ বেড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুকূলে মোট বরাদ্দ ছিল এক হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্বাচন আয়োজনের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। তবে ২০২৬ সালে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে– এই বিবেচনায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ইসির জন্য মোট বরাদ্দ ধরা হয় দুই হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন খরচ ছিল দুই হাজার ৭২৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খরচ ছিল ২২৯ কোটি টাকা। এই মোট বরাদ্দের মধ্যেই সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রাথমিকভাবে দুই হাজার ৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছিল, যার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত এক হাজার ৭০ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ ছিল দুই হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এ বরাদ্দ বাড়িয়ে চার হাজার ১৯০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে সংসদ নির্বাচনী খরচ ছিল দুই হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচন না থাকায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মোট ব্যয় ছিল মাত্র ৮৭৮ কোটি টাকা। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।
দেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোট হয়েছে– ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। তবে এই তিনটির কোনোটিই সংসদ নির্বাচনের দিনে হয়নি। অতীতের গণভোটে সম্পৃক্ত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট যোগ হলে প্রস্তুতির মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ভোটকক্ষ ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়াতে হয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও বেশি দিতে হয়। একই সঙ্গে ভোটার সংখ্যার অনুপাতে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ অন্য সরঞ্জামও বাড়াতে হয়।
এবার গণভোটের ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণও একটি বড় বিষয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালান। কিন্তু গণভোটে কোনো প্রার্থী বা প্রতীক না থাকায় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ভোটারের মধ্যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝাতে আলাদা সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হয়, যা নির্বাচন কমিশনকেই করতে হবে। এ কারণেই নির্বাচনী কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারিত হচ্ছে, খরচও বাড়ছে।
ইসি সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে দেশে ও বিদেশে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে অ্যাপের মাধ্যমে এই নিবন্ধনের সময়সীমা শেষ হয়েছে।
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত ‘ওসিভি-এসডিআই’ প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মোট পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধনের মধ্যে বিশ্বের ১২৩ দেশ থেকে সাত লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ প্রবাসী বাংলাদেশি নিবন্ধন করেছেন। এবার প্রবাসীদের প্রতিটি ভোটের জন্য সরকারকে গড়ে ৭০০ টাকা খরচ করতে হবে। এসব হিসাব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের ব্যয় যে বড় আকার নিচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, বাড়তি টাকার পুরোটা গণভোটের জন্য ব্যয় হবে, এমনটা নয়। গণভোটে এত টাকা খরচও হবে না। মূল বাজেটে যে বরাদ্দ রয়েছে, নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় আরও অর্থ প্রয়োজন। তাই সার্বিকভাবে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের জন্য বাড়তি অর্থ চাওয়া হয়েছে।
Related News
তৈরি হচ্ছে বজ্রমেঘ, তিন বিভাগে অতি ভারী বৃষ্টির আভাস
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বজ্রমেঘের কারণে সিলেটসহ দেশের তিন বিভাগে ভারী থেকে অতিRead More
মিয়ানমারের ভূমিকম্পে কাঁপলো বাংলাদেশ
Manual5 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মধ্যরাতে হঠাৎ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল মিয়ানমার। সেই কম্পন অনুভূতRead More



Comments are Closed