বাঁশের চুঙ্গা পিঠা, সিলেট বিভাগের শীতকালীন মুখরোচক খাবার
সালেহ আহমদ (স’লিপক): বাঁশকে আমরা সাধারণত জ্বালানি, খুটি, বেত বা বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে দেখি। তবে বাঁশের ব্যবহার কেবল এতেই সীমিত নয়; এর মধ্যে রয়েছে খাবারের জগতে এক অনন্য বৈচিত্র্য। বিশেষ করে সিলেট ও মৌলভীবাজারসহ সিলেট বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে শীতকালে ডলু প্রজাতি বাঁশের চুঙ্গা পিঠা তৈরি ও খাওয়ার প্রথা বহুদিনের। স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল একটি খাবার নয়, বরং শীতকালীন উৎসব, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং এক ধরনের প্রাকৃতিক শিল্পের প্রকাশ।
বাঁশের চুঙ্গা পিঠা মূলত বাঁশের মধ্যভাগ বা ছোট ডাল দিয়ে তৈরি হয়। পিঠার মূল উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয় ভাপা চাল, নারকেল, গুড় বা চিনি। বাঁশের পিঠায় যখন এই উপকরণগুলো ভরে ভাপ দেওয়া হয়, তখন সেই পিঠার গন্ধ, স্বাদ ও আকৃতি অন্য যে কোনো পিঠার থেকে ভিন্ন এবং অনন্য হয়। স্থানীয়ভাবে এটি “চুঙ্গা পিঠা” নামেই পরিচিত। এর নাম এসেছে বাঁশের চুঙ্গা বা মধ্যখণ্ড থেকে। চুঙ্গার ভেতর ভাপা করার ফলে পিঠার স্বাদ থাকে প্রাকৃতিক এবং তা চিবিয়ে খাওয়ার সময় মিষ্টি ও নারকেলের সুবাস মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
শীতকালেই বাঁশের চুঙ্গা পিঠা সবচেয়ে বেশি তৈরি ও বিক্রি হয়। মৌলভীবাজারের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে সিলেটের শহরাঞ্চল পর্যন্ত এই পিঠার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ে। শীতের সকালে বা সন্ধ্যায় চা-নাস্তার সঙ্গে এটি যেন একটি পূর্ণাঙ্গ খাবার। স্থানীয় মানুষদের মতে, এই পিঠা শুধু মুখরোচক নয়, বরং পুষ্টিকরও। এতে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট থাকে যথেষ্ট, যা শীতকালে শরীরকে উষ্ণ ও শক্তিশালী রাখে।
চুঙ্গা পিঠার প্রস্তুত প্রক্রিয়াও বিশেষ। প্রথমে বাঁশের চুঙ্গা পরিষ্কার করা হয়, তারপর ভাপা চালের সাথে নারকেল ও গুড় মিশিয়ে বাঁশের মধ্যে ভরা হয়। এরপর ধীরে ধীরে ভাপে সিদ্ধ করা হয়। কিছু অঞ্চলে নারকেলের বদলে বাদাম বা কুসুম দানা ব্যবহার করা হয়। সিদ্ধ হয়ে গেলে বাঁশের চুঙ্গা খুলে বের করা হয় এবং খাওয়ার আগে উপরে সামান্য ঘি বা নারকেল কুঁচি ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়। এই পদ্ধতি পিঠার স্বাদ ও গন্ধকে আরও উন্নত করে।
শুধু খাবার হিসেবে নয়, বাঁশের চুঙ্গা পিঠা স্থানীয় সাংস্কৃতিক উৎসব ও সমাবেশেও একটি বিশেষ স্থান দখল করে। পিঠা উৎসব, শীতকালীন মেলা এবং গ্রামীণ সামাজিক সমাবেশে এই পিঠার উপস্থিতি শীতকালীন খাবারের প্রথাকে জীবন্ত রাখে। বহু পরিবারে শীতকাল মানেই পিঠা বানানোর প্রথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মে চলে এসেছে।
বাঁশের চুঙ্গা পিঠা শুধুই মুখরোচক নয়, এটি বাঁশের বহুমুখী ব্যবহারকেও প্রমাণ করে। বাঁশের ভেতর খাদ্য ভরা, ভাপে সিদ্ধ করা এবং তারপর খাওয়ার প্রথা মানুষের সৃজনশীলতার উদাহরণ। এছাড়া, এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখে। গ্রামীণ অঞ্চলের মহিলারা পিঠা তৈরি করে বিক্রি করেন, যা তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সুতরাং বাঁশ কেবল একটি গাছ বা নির্মাণ সামগ্রী নয়; এটি খাদ্য, শিল্প ও সংস্কৃতির অংশ। শীতকালে মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের বাঁশের চুঙ্গা পিঠা সেই বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখে। মুখরোচক এই পিঠা আমাদের প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে তৈরি সুস্বাদু খাদ্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শীতের সকালে এক কাপ চায়ের সঙ্গে গরম গরম চুঙ্গা পিঠা উপভোগ করলে, তা শুধু স্বাদ নয়, বরং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও উপভোগের সুযোগ দেয়।
Related News
জুড়ীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গ্রেফতার
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কিশোর রায় চৌধুরীRead More
কমলগঞ্জে মিরতিংগা চা বাগানে চা শ্রমিকদের অবস্থান ধর্মঘট
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: শারদীয় দুর্গাপূজার বোনাস ও বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগাRead More



Comments are Closed