প্রসঙ্গ : ইন্টারনেটের ব্যাবহার-অপব্যাবহার
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ইন্টারনেট একটি গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া বা মাধ্যম। মিডিয়াকে বলা হয় সমাজের আয়না। এটি দু ধরনের, প্রিন্ট মিডিয়া (খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন ইত্যাদি) ও ইলেক্ট্রনিক বা ওয়েব মিডিয়া (টেলিভিশন, ইন্টারনেট ইত্যাদি)। টেলিফোন, রেডিও, টেলিবিশন, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, মোবাইল, কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হয়েছে বর্তমান প্রযুক্তির সর্বাধিক উন্নত সংস্করণ ইন্টারনেট। এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রয়-বিক্রয়, গবেষণা, পত্র-পত্রিকা পাঠ, মুহুর্তেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা কোন স্থানে তথ্য লেনদেন ও যোগাযোগ করা যায় এবং হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে এমন কোন কাজ নেই যাতে এর ব্যবহার নেই। এটি ব্যবহার করছে ছাত্র-শিক্ষক, নারী-পুরুষ, অফিসার-কর্মচারী, ছোট-বড় সকলেই। একজন মুসলিমকে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক রাষ্ট্রীয় জীবনে পথ চলার জন্য হালাল-হারাম যাচাই বাছাই করে চলা আবশ্যক। এটি প্রত্যাশিত যে, প্রতিটি সচেতন মুসলিম ইন্টারনেট ব্যবহারকারী হারাম পথ পরিহার করে যাবতীয় কাজ পরিচালনার করবেন; পাশাপাশি এর মাধ্যমে নিজেকে একজন দা‘ঈ তথা আল্লাহর পথে আহবানকারী হিসেবে মানুষকে আহবান করবেন।
ইন্টারনেট অর্থ আন্তজাল। এটিকে নেটওয়ার্কসমূহের নেটওয়ার্ক বলা হয়। ইন্টারনেট সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এমন একটি বৈশ্বিক যোগাযাগ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তরে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর সাথে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় নানা তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময় করা যায়। ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ Advanced Research Projects Agency (ARPA) নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি কম্পিউটার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যাতে যুদ্ধের সময়েও এক সামরিক ঘাঁটি থেকে অপর ঘাটিঁর সাথে যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন থাকে। এই নেটওয়ার্ককে বলা হয় আরাপানেট (ARPANET)। এখান থেকেই এর যাত্রা শুররু হয়। ইন্টারনেটের মূলে রয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (WWW), আর এর জনক টিম বার্নাস লী। ভিনসেন্ট জিগনা ও মাইক পেপার ইন্টারনেটের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুরে ধরেছেন।
ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হয় কম্পিউটার, মডেম, ইন্টার সংযোগ, সফটওয়্যার ইত্যাদি। এটি অনলাইন ও অফলাইনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইন্টারনেট বিশ্বব্যাপী মানুষকে ফলপ্রসুভাবে এবং সূলভে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম করেছে। সনাতনী প্রচার মাধ্যমসমূহ যেমন রেডিও, টেলিভিশনের মতই ইন্টারনেটের কোন কেন্দ্রীভূত সরবরাহ পদ্ধতি নেই। তার পরিবর্তে যে কোন ব্যক্তি যার ইন্টারনেট সংযুক্তি আছে সে সরাসরি অন্র যে কোন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ রক্ষ করতে, অন্যের জন্য তথ্য সরবরাহ করতে, অন্যের দেয়া তথ্য সংগ্রহ করতে অথবা উৎপাদিত পণ্যসমূহ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারে। তথ্য খোঁজার পাতার মাধ্যমে ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে হয়। আর এটি হচ্ছে একটি প্রোগ্রাম যেমন মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, ফায়ারফক্স, অপেরা, গুগল যা কম্পিউটারের তথ্যাদির পৃষ্ঠা, চিত্র, রেখাচিত্র, শব্দ, চলমান ছবি ও মডেলসমূহ উপস্থাপন করে। শুরুতে এর ব্যবহার খুব সীমিত থাকলেও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব সার্ভিস, ই-মেইল সার্ভিস, এফটিপি বা ফাইল ট্রান্সফার প্রটোকল, টেলনেট, রিমোট বা ইন্টারনেট প্রিন্টিং, রিমোট স্টোরেজ, নিইজ গ্রুপ, ভিওটি বা ভয়েস ওভার টেলিফোন, ইনস্ট্যান্ট মেসেজ, ভিডিও কনফারেন্সিং, ইন্টারনেট চ্যাটিং প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রযুক্তি মানুষকে জ্ঞানের আলো দেখায়; আবার মানুষের পশুবৃত্তির কারণে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করে সমাজ ও রাষ্ট্রের। ইন্টারনেট যেমন কাউকে বিশাল জ্ঞানের রাজ্যের সন্ধান দিতে পারে, তেমনি দিতে পারে বিশাল খারাপ একটি রাজ্যের সন্ধানও। পৃথিবীর সকল আবিষ্কারের লক্ষ্যই মানবকল্যান, কিন্তু মানুষ ব্যাক্তিস্বার্থে এসব আবিষ্কারকে খারাপ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করে। জানা যায়, ‘নিউক্লিয়ার’ “নিউক্লিয়ার হচ্ছে, পারমানবিক বিভাজনের দ্বারা প্রাপ্ত শক্তি। [দ্র: বাংলা একাডেমী ইংলিশ-বাংলা অভিধান, ২৫তম সংস্করণ, মে ২০০৪, পৃ:৫১৬।”] আবিস্কৃত হয়েছিল মানবকল্যাণে; ব্যবহৃত হয়েছে মানব ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে। বর্তমান তথ্যের রাজ্যে বাধাহীন, অবাধ বিচরণের প্রধান মাধ্যম ইন্টারনেট হওয়ায় এটি এখন সর্বধিক আলোচিত ও ব্যাপক সমালোচিত। এর প্রধান কারণ হল ইন্টারনেটের বাধাহীন ও শাসনহীন অবাধ ব্যবহার। ফলে সমাজ জীবনে বয়ে নিয়ে আসছে বিপজ্জনক সব ভাইরাস, বয়ে নিয়ে আসছে অপসংস্কৃতি, অশ্লীল, উলঙ্গ ও বিকৃত ছবি, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর কিছু।
প্রবাদে আছে, কোন বস্তুর ভালবাসা তাকে অন্ধ ও বধির করে দেয়। মানুষ যখন কোন বস্তুকে ভালবাসে এবং তার ভালবাসা সীমা ছড়িয়ে যায়, তখন সে তার দোষ-ত্রুটি ও ক্ষতির দিক ভূলে যায়, তাতে কোন বিপদ বা অকল্যাণ খুঁজে পায় না, যদিও সেখানে অনেক দোষ-ত্রুটি, বিপদ ও অকল্যাণ থাকে। অনেকেই আছেন যারা ইন্টারনেটকে বৈধ প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। কিন্তু আধুনিক যুগে যুবক ও যুবতীদের মাঝে ইন্টারনেট প্রীতি, গভীর মনোনিবেশ সহকারে এর যথেচ্ছ ব্যবহার, কোন প্রকার ক্লান্তি অথবা বিরক্তবোধ ছাড়াই দীঘৃ সময় ধরে ইন্টারনেটের সামনে বসে থাকা এমনি একটি বিষয় যা সামাজিক ও চারিত্রিক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। অসংখ্য যুবক-যুবতী রয়েছে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে উলঙ্গ ছবি দেখার জন্য, অশ্লীল দৃশ্যসমূহ উপভোগ করার জন্য এবং অবৈধ ওয়েবসাইটসমূহ খোঁজার জন্য, যা একজন যুবক পাশবিক শক্তিতে বন্ধি করে ও দুর্বল করে ফেলে। ফলে তাকে ফলদায়ক উপকারী যে কোন কাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাকে সংকীর্ণ গন্ডীতে আটকে রেখে তাকে পূর্ণভাাবে গ্রাস করে ফেলে।
ড. সুলাইমান আল-কুদরী বলেন, ‘এ অশ্লীল ছবিসমূহ যুবক-যুবতীদের মানসিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষতিকর, কেননা এ ছবিসমূহ তার মনে ও ব্রেইনে সারাক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকে, ফলে তা দেখা তার বদ অভ্যাসে পরিণত হয়।
এক পরিসংখ্যানে ও বিশে¬ষণে দেখা যায়: ইন্টারনেটে আড্ডায় নিমজ্জিত ৮০% যুবক পরবর্তীতে বিয়ে করেন না। এদের ৭০% নিষিদ্ধ পলি¬তে যাতায়াত করে এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। এদের ৫৫% তাদের পরিবারের কোন খোঁজ খবর নেয় না। এরা সারাদিন ফেসবুক, টুইটারে রুচিহীন মন্তব্য আদান-প্রদান করে, এদের অধিকাংশই খারাপ ওয়েবসাইটসমূহের ঠিকানা বিনিয়ম করে, এমনকি তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহেও। ফলে এটি শিক্ষা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ করে তাদের কেউ কেউ লেখা-পড়ায় অগ্রগামী থেকেও আস্তে আস্তে পশ্চাদগামী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ইভটিজিং, ধর্ষণ, অপহরণ, খুন, গুম, হত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সঠিকভাবে দেখাশুনা না করার ফলে সন্তানরা মা-বাবার সাথে মিশতে ভয় পায়। এর ফলে পারিবারিক বন্ধন থেকে তারা শিথিল হয়ে পড়ে।
অবৈধ পন্থায় অবাধ জীবন যাপনে এরা অভ্যস্থ হয়ে উঠে। এরা মনে করে যৌনতাই বিবাহের মূল উদ্দেশ্য, আর সে উদ্দেশ্য যদি বিবাহ ছাড়াই পূরণ করা সম্ভব হয়, তাহলে বিবাহের আর প্রয়োজন কি? এভাবে অল্প বয়সেই তাদের নৈতিক স্খলন ঘটে। বেছে নেয় তারা মদক ও অপরাধর পথ।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক, স্নায়ুবিজ্ঞানী ও রয়াল ইনস্টিটিউশন অব গ্রেট বিট্রেন এর পরিচালক সুসান গ্রিনফিল্ড বলেন, আমার ভয় হচ্ছে, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইটগুলো আমাদের মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায় ছোট শিশুদের সমপর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। ছোট শিশুরা যেমন কোন শব্দ বা উজ্জল বাতি দেখে আকৃষ্ট হয়, এখানকার মানুষজনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নোটিফিকেশন দেখে আকৃষ্ট হয়, তাদের দিনের একটা বড় অংশ এই সাইটগুলোতে ব্যয় করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন নেটওয়ার্কি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে আর অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়িয়ে দেয় ক্যান্সারের ঝুঁকি। মানুষ যতই ইন্টারনেট আসক্ত হয়ে পড়ছে ততই তারা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে মানুষের মাঝে বিষন্নতা ও এককিত্ব বাড়ছে। তাই বলা যায় বর্তমান প্রযুক্তি মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।
ইন্টারনেট নামক মিডিয়া যদি শুধু ন্যায় ও সুন্দরের পথ দেখাতো, অন্যায় ও অশ¬ীলতা পরিহার করতো, তাহলে এখন থেকে মানবজাতি আরো বেশি উপকৃত হতো। আসলে এটিই কিন্তু হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুবক-যুবতীরা অনেক সময় অশ্লীলতার মধ্যে ডুবে থাকে। প্রতিটি মিডিয়া ফুলের মত, যার মধ্যে মধু ও বিষ উভয়টিই রয়েছে। মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে; মাকড়সা বা এ জাতীয় কীটপতঙ্গ এখান থেকে বিষ সংগ্রহ করে। এটি আবার ধারালো ছুরির ন্যায়। এটিকে যেভাবে কাজে লাগানো যায় সেভাবেই কাজ করে। এ জন্য বলা যায়, মিডিয়া একটি নিরপেক্ষ ও নিরীহ বস্তু। এমতাবস্থায় শুধু ইন্টারনেট নামক মিডিয়াকে গালাগালি, দোষারোপ করা ঠিক হবে না। এ জন্য সুস্থ ধারার ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এর ব্যবহারকারীকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সরকারকে এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট আন্তরিক হয়ে অন্যায় ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, ইন্টারনেট অনলাইনের যেমন দশটি ভালো দিক রয়েছে, ঠিক তেমনি খারাপ দিকও রয়েছে যা একটি দশটির সমতুল্য। তবে কেবল বিনোদন হিসেবে না নিয়ে এবং অপব্যবহার করে আহেতুক সময় নষ্ট না করে বরং ক্যারিয়ার গঠন, তথ্য সংগ্রহ কিংবা অধিক জানার আগ্রহ নিয়ে এটিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলে এর দ্বারা মুসলমানরা অনেক সুফল পাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক।
Related News
নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দা রাশিদা বারী
আবু রাইহান জাকারিয়া: নারীর আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দা রাশিদা বারী তারRead More
দুর্ঘটনায় শুধু জীবন রক্ষা নয়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরাও জরুরি: ট্রমা চিকিৎসায় প্লাস্টিক ও রিকন্সট্রাকটিভ সার্জারির ভূমিকা
প্রফেসর ডা. মৃণাল কান্তি দাস: সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে আঘাত, অগ্নিদগ্ধ হওয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায়Read More



Comments are Closed