Main Menu

বাংলাদেশে হামের বিস্তার: কেন হচ্ছে, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রতিরোধের উপায়

মো: ছালিম আহমদ খান: বাংলাদেশে চলতি বছর হামের সংক্রমণ নতুন করে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়।

সর্বশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আবারও বিশেষ হাম-রুবেলা (MR) টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে বা আগে টিকা নিতে পারেনি, তাদের টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে।

হাম কেন হয়?

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেওয়া, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ালে আশপাশের অন্য মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা এমনকি বাতাসে থাকা ভাইরাসের মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাহীন ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই সংক্রমিত হতে পারেন।

সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের প্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন পর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথম দিকে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল বা পানি পড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। পরে শরীরে বিশেষ করে মুখ ও মাথার দিক থেকে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

বাংলাদেশে কেন আবার বাড়ছে হাম?

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। কিন্তু কয়েক বছর ধরে টিকাদানে তৈরি হওয়া ঘাটতির কারণে অনেক শিশু পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায়নি।

UNICEF Bangladesh জানিয়েছে, Coverage Evaluation Survey 2023 অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রথম MR টিকার আওতা ২০১৯ সালের ৮৮.৬ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮০.৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই থেকে যায়।

WHO-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ২০২৪-২০২৫ সময়ে MR টিকার সরবরাহে ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে কিছুটা বিঘ্ন এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অনুপস্থিতি—এসব কারণে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়। সেই ঘাটতি ২০২৬ সালের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

অর্থাৎ, হামের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু একটি হঠাৎ তৈরি হওয়া সংক্রমণ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। দীর্ঘ সময় ধরে টিকা না নেওয়া বা নির্ধারিত ডোজ বাদ পড়া শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সমাজে এমন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যাদের মধ্যে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হাম কতটা বিপজ্জনক?

অনেকে হামকে সাধারণ শৈশবের রোগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। WHO বলছে, হামের কারণে নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, কানের সংক্রমণ, চোখের ক্ষতি এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে জটিলতার ঝুঁকি বেশি।

এ ছাড়া হাম আক্রান্ত হওয়ার পর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যেতে পারে, ফলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।

হাম হলে কী করতে হবে?

হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই সন্দেহ হলে নিজের মতো করে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আক্রান্ত শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে এবং জ্বর, পানিশূন্যতা বা শ্বাসকষ্টসহ জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসকের পরামর্শে দুই ডোজ ভিটামিন এ দেওয়া হয়, সাধারণত ২৪ ঘণ্টা ব্যবধানে। এটি চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্বের ঝুঁকি কমাতে এবং গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে ভিটামিন এ হামের টিকার বিকল্প নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও থাকে। তাই সন্দেহজনক রোগীকে অপ্রয়োজনে ভিড় বা জনসমাগমে না নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী আলাদা রাখার ব্যবস্থা করা গুরুত্বপূর্ণ।

হামের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কী?

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। WHO দুই ডোজ হাম-সম্বলিত টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের MR টিকার দুই ডোজ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে চলমান বিশেষ ক্যাচ-আপ কর্মসূচির উদ্দেশ্যও হলো যেসব শিশু নিয়মিত বা পূর্ববর্তী কর্মসূচিতে টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা।

অভিভাবকদের তাই সন্তানের টিকা কার্ড পরীক্ষা করে দেখতে হবে নির্ধারিত MR টিকার ডোজ নেওয়া হয়েছে কি না। কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে হবে।

শুধু টিকা নয়, সচেতনতাও জরুরি

হাম নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সম্পৃক্ত হতে হবে।

শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে একই এলাকায় একাধিক শিশুর এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জানানো প্রয়োজন।

অভিভাবকদের টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, WHO ও UNICEF-এর মতো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য নেওয়া উচিত।

সামনে করণীয়

বাংলাদেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে তাদের দ্রুত শনাক্ত করা, দুই ডোজ টিকার কাভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে নেওয়া, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং আক্রান্ত রোগী দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

WHO বলেছে, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ উভয় ক্ষেত্রেই অন্তত ৯৫ শতাংশের সমান ও টেকসই কভারেজ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির যথাযথ ব্যবস্থাপনাও জোরদার করতে হবে।

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া, টিকা নিশ্চিত করা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এই চারটি বিষয়েই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: তরুণ সমাজকর্মী

Share





Related News

Comments are Closed